logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬

গণপরিবহনে যৌন হয়রানি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে

রাফিয়া চৌধুরী, আরটিভি অনলাইন
|  ২২ মার্চ ২০১৯, ১৬:১২ | আপডেট : ২৩ মার্চ ২০১৯, ০৮:১২
সবিতা রহমান। একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর। তার প্রতিদিনের যাওয়া আসার পথ হলো মিরপুর থেকে মতিঝিল। তিনি বলেন, সকালবেলা অফিসের পিক টাইমে পাবলিক বাসে উঠার চেষ্টা করি, হঠাৎ অনুভব করি পেছন থেকে কে যেন গায়ে হাত বুলাচ্ছে। এই রকম অনুভূতি প্রায়ই হয়। খুব কৌশল করে একদিন তার হাত ধরার চেষ্টা করলাম। হাতটা ধরেই পেছনে ঘুরতে না ঘুরতেই যৌন হয়রানিকারী আমার হাতে চিমটি কেটে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।   

নাফিয়া আক্তার রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গাজীপুরে যাচ্ছেন। হঠাৎ তার শরীরের পেছনের অংশে কোনো কিছুর খোঁচা অনুভব করেন। খেয়াল করে দেখেন, পেছনের পুরুষ সহযাত্রী পা দিয়ে তার শরীরে ধাক্কা দিচ্ছেন। কবিতা প্রতিবাদ করলে সেই সহযাত্রী বলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কী হয়েছে জানি না।

এমনটা শুধু কবিতা আর নাফিয়ার ক্ষেত্রে নয়, রাজধানীতে গণপরিবহনে চলাচল করেন এমন নারী যাত্রীদের কম বেশি এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইয়াসমিন রহমান মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। থাকেন পল্লবীতে। রোজ তাকে কমপক্ষে চার ঘণ্টা যানজট পেরিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। ইয়াসমিন রহমান বলেন, ‘এ ভোগান্তির সঙ্গে সঙ্গে সব সময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই নানাভাবে নিপীড়িত হতে হয়।’

নতুন ভোগান্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে চালক এবং সহকারীর ধূমপান। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য গণপরিবহনে বিশেষ ব্যবস্থা রাখার দাবিও অনেক নারীর।

বছর দুই আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণপরিবহনে নারীদের পরিধেয় বস্ত্র কেটে দেওয়ার কিছু ভিডিও সবার নজর কাড়ে। একজন বৃদ্ধ লোক নারীদের কাপড় কেটে দিত। এক পর্যায়ে গণপরিবহনে এক নারীর কাপড় কাটতে গিয়ে পাবলিকের হাতে ধরা পড়ে। পরে তাকে র‌্যাবের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার আরটিভি অনলাইনকে বলেন , ইভটিজিং বা যৌন হয়রানির সাথে যেসব মানুষ জড়িত থাকে তারা মূলত মানসিক বিকৃত থাকে। তাদের পরিবারের শিক্ষায় ঘাটতি থাকে। তাছাড়া তারা যৌন সুখ পাওয়ার জন্য এতো বেশি উদগ্রিব থাকে । তাই তারা ছোট ছোট যৌন হয়রানি করে যৌন তৃপ্তির সুখ পায়। তবে গণপরিবহনে যৌন হয়রানির কৌশল বদলেছে। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, গণপরিবহনে পুরুষেরা যেভাবে যৌন হয়রানি করে থাকেন, তা হলো ইচ্ছাকৃত স্পর্শ, কাছে ঘেঁষে দাঁড়ানো, আস্তে ধাক্কা দেওয়া, চুল স্পর্শ, কাঁধে হাত, শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ ইত্যাদি করে থাকে। 

-----------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পর বেড়েছে পানির দাম
------------------------------------------------------------

গণপরিবহনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসন রয়েছে। ১০টি বাস ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো বাসে ৪টি বা ৫টি আসন নারীদের জন্য রাখা হয়েছে। কোনো বাসে আবার সেই আসনে পুরুষ বসে আছেন। নারী যাত্রী উঠলে তাদের সিট ছেড়ে দিতে বললেও ঝামেলার সৃষ্টি হয়।

আবার অনেক সময় নারীদের সংরক্ষিত আসন পূর্ণ হয়ে গেলে, তারা আর বাসে মহিলাই নিতে চায় না। হেলপাররা বলে উঠে , ‘ওই মহিলা উঠাস না।’

দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। রাস্তা থেকে শুরু করে গণপরিবহনে ভ্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে।

আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা আর তদারকির অভাবকে যৌন হয়রানির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এবং অ্যাকশান এইড এর পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ নারী বাস, টেম্পো বা সিএনজিতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে টেম্পোতে যাতায়াতকারীরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও পথচারী ২৬ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের কথা বলেছেন। অশালীন বা পীড়নমূলক ভাষার মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন ৬৮ শতাংশ নারী।

‘৮১ ভাগ নারী বলছেন, যে তাকে চেনে না সে তার দিকে অশ্লীল বা কুদৃষ্টিতে তাকিয়েছে। বয়সভেদে এর কোনো পার্থক্য নেই। সব বয়সী নারীরাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।’

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ইকুয়িটি ম্যানজোর কাশফিয়া ফিরোজ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমাদের ২০১৩  সালে গোটা বিশ্বব্যাপী একটা ক্যাম্পেইন চলে। সেটা হলো ‘নিরাপদ নগরী নির্ভয়ে নারী’। সেই ক্যাম্পেইনের পর আমরা একটি গবেষণা চালাই। সেখানে দেখা যায়, আমরা নারীদেরকে বাইরে কর্মক্ষেত্রে যেতে উৎসাহিত করি। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ না হওয়ার কারণে নারীরা আরও ঘরমুখি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস কোন স্টপেজে দাঁড়ায় না। মহিলা সিট পূর্ণ হয়ে গেলে আর নারী নিতে চায় না। আমাদের গবেষণায় উঠে আসে ৮৮% নারী বাসে উঠার সময় তারা হেলপার বা অন্য কারও সাহায্য পায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা অসহযোগিতামুলক আচরণ করে। ৬৫% নারী বিভিন্ন যৌন হয়রানির শিকার হয়।    
 

আরও পড়ুন :

আরসি/ এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়