• ঢাকা সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
logo
অস্ত্র কিনতে বাইডেন পুত্রের মিথ্যাচার ও যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার চর্চা 
আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: গৌরবময় সাফল্যের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে। শাসকদল মুসলিম লীগ ছিল সাম্প্রদায়িক। ফলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশও অনেকটা সাম্প্রদায়িক চেহারা পায়। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনেও পড়ে সাম্প্রদায়িকতার ছায়া। পূর্ব পাকিস্তানের সচেতন তারুণ্য ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কৃত্রিম খোলসে মুখ ঢাকা রাখতে বেশিদিন রাজি থাকেনি। তাদের উদ্যোগে পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানেও আওয়ামী লীগের শাখা গঠিত হয়। ফলে গোটা পাকিস্তানেই আওয়ামী লীগ একমাত্র বড় জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের একই ভূ-খন্ড নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্র দুটির একটি ‘পূর্ব পাকিস্তান’ অন্যটি ‘বাংলাদেশ’। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, পাকিস্তান নামক ঔপনিবেশিক ধরনের কৃত্রিম রাষ্ট্রের নিগড়ে বাঁধা বাঙালি জাতি তার নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে থেকে ভাষা-সংগ্রাম, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের জন্য ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে একদিকে এই ভূ-খন্ডে পাকিস্তানের কবর রচনা করে, অন্যদিকে বাঙালির নিজস্ব প্রথম জাতি-রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। এই সংগ্রাম ও যুদ্ধে বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব প্রদান করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।  ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে ঢাকার রোজ গার্ডেনে যে দলটির আত্মপ্রকাশ, দুই যুগেরও কম সময়ের ব্যবধানে, ১৯৭১ সালে সেই দলটির নেতৃত্বেই স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে জন্মকালে যে দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ, সেই দলটিই আজকের আওয়ামী লীগ। প্রথম কমিটিতে সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন সে সময়ের তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সে সময়ের কথা উল্লেখ আছে। যখন ঢাকার রোজ গার্ডেনে দলের গোড়াপত্তন হচ্ছে, তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে। তরুণ শেখ মুজিব যে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কথা ভেবেছিলেন, তা কার্যকর হতে খুব বেশিদিন লাগেনি। ১৯৪৯ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ পরবর্তীকালে নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নেতৃত্ব দলকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে রূপান্তর করে। তখন এটি ছিল একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে “বাংলাদেশ” নামে নামকরণের ঘোষণা দেন। ১৯৫২ সালে ভাষা সংগ্রামের পথ বেয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়-আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গৌরবগাঁথা, বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক আত্ম প্রকাশ তৎকালীন পূর্ব বাংলা তথা পাকিস্তানের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলের ও সূচনালগ্ন হিসেবে চিহ্নিত। আওয়ামী লীগের জন্ম ছিল পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন শোষণ এবং মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক-স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতির অবসানের অনিবার্যতার ফল।  স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় কেবল নয়, একটি আত্মমর্যাদাশীল অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এইচএম কামরুজ্জামান তাদের জীবন দিয়ে এসই অঙ্গীকারের মূল্য পরিশোধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের সেই ষড়যন্ত্র ৭৫’ এর ট্রাজিডি সৃষ্টি করে। তা  সত্বেও  বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতির পিতার অঙ্গীকার ও স্বপ্ন জয়ের পথে অকুতোভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশ।  দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আসতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। আদর্শবাদী, উদারনৈতিক এই রাজনৈতিক দলটির অস্তিত্ব বিনাশের চেষ্টাও হয়েছে। দলের ভেতরের কোন্দলও অনেক সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চেয়েছে; কিন্তু আলোর পথযাত্রী আওয়ামী লীগ সব বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে এগিয়ে গেছে। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের এক বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে প্রবাসে নির্বাসিত জীবনযাপনকারী শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে দলের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সেই বছরের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশের এক ক্রান্তিকালে দেশে ফেরেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ১৯৮১ সালে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে একটানা ৪৩ বছর দলটির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৯৯৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পায়। খুব কম দেশেই একটি দল ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ক্ষমতায় ফিরতে সক্ষম হয়েছে। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮, ২০২৩ টানা চারবার জনগণের ম্যান্ডেট পায় আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগে মুজিব যুগই হচ্ছে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল যুগ। তিনি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রচার করেন। ঘোষণা করেন পূর্ব পাকিস্তান নয়, এই ভূখন্ডের নাম বাংলাদেশ। আমরা হাজার বছর ধরে বাঙালি। আমাদের পরিচয় হবে বাঙালি। বড় ঢেউ তোলে বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালির যে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তার মিল দেখা যায় অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সভ্যতার সঙ্গে। বাংলাদেশে সেই ঐতিহ্য ধারণ করেন শেখ মুজিব এবং সেই জাতীয়তার বাহক হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ। মুজিব যুগের আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আওয়ামী লীগে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন শোষিতের গণতন্ত্র। সেই অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতির পিতার  স্নেহধন্য,  ত্যাগী ও নিবেদিত প্রাণ, ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কৃষক লীগের প্রাক্তন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল জব্বার কে গভীর শ্রদ্ধায় স্বরণ করছি।   উপমহাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বলা চলে, এই দলটির ইতিহাসই হচ্ছে বাংলাদেশের গত ৭৫ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাস যাঁরা পাঠ করবেন, তাঁদের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ করা তেমন দরকার হবে না। জনগণের জন্য, জনগণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এই দলটির প্রতি এখনো জনগণের অবিচল আস্থা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দলটির অসাম্প্রদায়িক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাক। ৭৫ বছর পূর্ণ করেও আওয়ামী লীগ তার তারুণ্য হারায়নি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, যুগান্তরের লক্ষ্য ও কর্মসূচি এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বএই তিনটি রক্ষাকবচের জোরেই আওয়ামী লীগ নতুন প্রাণ পাবে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস অপরাজেয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, শোষণমুক্ত সাম্যের সমাজ গঠনের আদর্শ এবং একটি উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক, প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনের ভিত্তি রচনা করে আওয়ামী লীগ। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে অসাম্প্রদায়িক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।                                 আওয়ামী লীগ শুধু এ দেশের প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারাও। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভাষা সংগ্রামের পথ ধরে ৬৬ সালে ৬ দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাঙালি জাতি। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ বাঙালি জাতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ অর্জন, তার মূলে রয়েছে জনগণের এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব। জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস জনগণ এবং সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ৭৫ বছরের পথপরিক্রমায় দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীন রাজনৈতিক দলটিকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অনেকটা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে দলটি। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র করা হয়। দলের ভেতরেও শুরু হয় ভাঙন।  ১৯৮১ সালে জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শক্ত হাতে এবং তাঁর সাহসী নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় এবং বারবার  ঘুরে দাঁড়ায়।  গণতন্ত্র, ভাষা সংগ্রাম, স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়, মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর জাতীয় পূর্নগঠন, বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নের মহাসড়কে উত্তরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ তথা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করা, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা, নারীর ক্ষমতায়ন, সমুদ্র বিজয়, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২১ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জন, নিজস্ব অর্থে পদ্মসেতু নির্মাণ, ঢাকা মেট্রোরেল, চট্টগ্রামে কর্ণফুলি নদীতে সুড়ঙ্গ পথ নির্মাণ, পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, ঈশ্বরদীতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সফলভাবে কোভিড মহামারি মোকাবেলা ও দ্রত সময়ে টিকাদান সম্পন্ন এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অর্জন প্রভৃতি উল্লেখ করলেও আওয়ামী লীগের অর্জনের কথা শেষ হবে না এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।  বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক। আমরা শুধু একটি কথাই বলব, তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুখে-দুঃখে, বিপদে আপদে সর্বদা দেশবাশীর পাশে আছে এবং থাকবে। অপ্রতিরোধ্য আওয়ামীলীগ কেবল অতীত বর্তমান নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের নির্মাতা। আওয়ামীলীগ চিরজীবী হোক।    লেখক : প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-২
দুর্নীতি-লুটপাটের খবর উদ্ঘাটনে সাংবাদিকদের সক্ষমতা প্রমাণিত
আব্বু তোমাকে অনেক ভালোবাসি
সোশ্যাল মিডিয়ায় যুগলের ‘সুখি ছবি’, যা বলছে ‘পরকীয়া’ আইন
সাংবাদিকতায় ডিগ্রি-দক্ষতা দুটোই জরুরি
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের জন্য আশির্বাদস্বরূপ
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪৪ তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে নর ঘাতকরা ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে। তবে তার কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা সে সময় দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে ঘাতক গোষ্ঠী। ১৯৭৫ সালে ক্ষমতার রদবদলের পর আওয়ামী লীগের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দেয়, এর ফলশ্রুতিতে দলে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে বিদেশে থাকার সময় ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দেশ রত্ন শেখ হাসিনা দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা দিল্লিতে থাকাকালীন তাকে দলের সিনিয়র নেতারা সভাপতি নির্বাচিত করার বিষয়ে অবহিত করেন। দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করা হয় জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে। বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বকে ভয় পায় ঘাতক গোষ্ঠী। খুনি সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে না দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রিয় স্বদেশভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। দেশের গণতন্ত্র আর প্রগতিশীলতার রাজনীতি ফেরাতে রাতে দুই শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াদেজ পুতুলকে ছোটবোন শেখ রেহানার কাছে রেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।  দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। এদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং বিমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। প্রায় ছয় বছর নির্বাসনে থাকার পর বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনে লাখো মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান। তখনকার রাজনীতির মতোই প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে ছিল কালবৈশাখীর হাওয়া। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। মুষলধারার বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে তাঁরা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন নেত্রী কখন আসবেন এই প্রতীক্ষায়। অবশেষে ৪টায় কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে জনসমুদ্রের জোয়ারে এসে পৌঁছান জননেত্রী শেখ হাসিনা। এ    সময় গণতন্ত্রকামী জনতার স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা বিমানবন্দর এলাকা। সেদিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা এবং জীবনকে তুচ্ছ করে বিমানবন্দরের দেয়াল টপকে জনতার মিছিল চলে গিয়েছিল বিমানবন্দরে ভেতরে।এক পর্যায়ে সকল বাধা ডিঙ্গিয়ে প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে একনজর দেখতে বিমানবন্দরের রানওয়ে পর্যন্ত ছুটে যায় সাধারণ মানুষ। তাকে একনজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত রাস্তাগুলো রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্রে। তখন স্বাধীনতার অমর স্লোগান ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় বাংলার আকাশ বাতাস।  জনতার কণ্ঠে বজ্রনিনাদে ঘোষিত হয়েছিল ‘পিতৃহত্যার বদলা নিতে লক্ষ ভাই বেঁচে আছে, শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই।’ দেশের মাটিতে পা দিয়ে লক্ষ লক্ষ জনতার সংবর্ধনায় আপ্লুত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই । আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই।’ সেই থেকে চার দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালে। এরপর ২০০৯ সাল থেকে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা, মেধা, দক্ষতা ও গুণাবলিতে সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আপন কর্ম মহিমায় হয়ে উঠেছেন-নব পর্যায়ের বাংলাদেশের নতুন ইতিহাসের নির্মাতা। এভাবেই প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর নেত্রীত্বের গুনাবলীর মাধ্যমে দেশ নেত্রী হতে হয়ে ওঠেন বিশ্ব নেতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সকল অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও, তিনি তার অধ্যবসায় এবং সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তার দুঃসাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই আওয়ামী লীগ আজ দল হিসেবে অনেক বেশি শক্তিশালী। প্রত্যাবর্তনের ৪৪ তম বার্ষিকী আজ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় বঙ্গবন্ধু কন্যা ও জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সুন্দর জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। লেখক: অধ্যাপক, জেনেটিক্স এন্ড এনিম্যাল ব্রিডিং বিভাগ, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়
কিভাবে বাংলাদেশে কোয়ান্টাম নিরাপদ করা যায়?
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বা কিউ সি, কম্পিউটিংয়ের একটি উদীয়মান প্রযুক্তি যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতি ব্যবহার করা হয়। তত্ত্বগত ভাবে, সমস্যা সমাধানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অবিশাস্য দ্রুতগতিতে তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করে, যা দ্রুততম সুপার কম্পিউটারের বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।  কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর যে ৩টি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যের সাহায্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটার দ্রুত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে, সেগুলি হলো: ১।  সুপারপজিশন:  বর্তমান প্রযুক্তির কম্পিউটারে "বিট" নামক তথ্য একক ব্যবহার করা হয় যা 0 অথবা ১ এই দুইটি অবস্থায় থাকতে পারে, এর বিপরীতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে "কিউবিট" নামক কোয়ান্টাম তথ্য একক ব্যবহার করা হয়।  কিউবিটগুলি একই সাথে "0" এবং "1" অবস্থায় থাকতে পারে, যা "সুপারপজিশন" নামে পরিচিত, 2N (2 টু দ্যা পাওয়ার N = কিউবিটস বা কোয়ান্টাম বিটস এর সংখ্যা)।   ২। এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট: এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি বিস্ময়কর ধারণা, যা বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনকে বিভ্রান্ত করেছিল। তিনি এটিকে "Spooky Action at Distance" (ভৌতিক দূর দৃষ্টি) বলে অভিহিত করেছিলেন। এটি দুটি বা ততোধিক কোয়ান্টাম কণার মধ্যে বিশেষ ধরণের এক বন্ধন, যেখানে এক কণার অবস্থা পরিমাপ করলে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কণার অবস্থাও নির্ধারিত হয়ে যায়। ৩। কোয়ান্টাম ইন্টারফারেন্স (তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা): এটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরেকটি তত্ত্ব যেখানে একটি কোয়ান্টাম কণা একই সাথে তরঙ্গের মতো এবং কণার মতো আচরণ করতে পারে। যদিও কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমান কম্পিউটারগুলিকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করবে না, তবে ব্যবহৃত হবে অত্যন্ত জটিল, বৃহৎ ও বিশেষ ধরণের সমস্যা সমাধানে। সেই সাথে এ ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত ইলেক্ট্রনগুলোর বিশেষ কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে তাদেরকে তরলীকরণ রেফ্রিজারেটরে মাইনাস  (-)২৭৩ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেট তাপমাত্রায় শীতলীকরণ করে রাখতে হয়। স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং স্মার্ট বাংলাদেশে বিনির্মাণের পথে পৃথিবীতে তথ্যপ্রযুক্তিতে যে নতুন নতুন উদ্ভাবন ঘটছে সে সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার হ্যাকিং ডাকাতি ঘটনা বিবেচনা করুন। শীর্ষ পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার পরেও  ঘটেছে, যা এটি ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং এরকম আরও ঘটনা ঘটতে পারে নিকট ভবিষ্যতে। এখন আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিরাপত্তা অথবা কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে, যা আমাদের, বিশেষ করে নীতি নির্ধারকদের বুঝতে হবে এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে এখন থেকেই। কীভাবে প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে তার একটি উদাহরণ দেওয়ার জন্য, আমাদের Shor's Algorithm সম্পর্কে জানতে হবে, যাকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর মুকুটমণি বলা হয়। এটি কীভাবে ক্লাসিক্যাল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে? ক্লাসিক্যাল নিরাপত্তা এনক্রিপশন (RSA) একটি নির্দিষ্ট বড় সংখ্যার মৌল গুণনীয়ক (prime factors) খুঁজে বের করার উপর নির্ভর করে, তাই না? সুতরাং যে কেউ যদি কোনও নির্দিষ্ট বড় সংখ্যার মৌল গুণনীয়ক খুঁজে পেতে পারে, সেই ব্যক্তি পৃথিবীর যেকোন  (RSA) এনক্রিপশন ভাঙতে পারবে। এখন আপনি যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্লাসিক্যাল সুপার কম্পিউটারকে যথেষ্ট বড় একটি সংখ্যা দেন, তাহলে এমনকি কয়েক বিলিয়ন বছর চেষ্টা করার পরেও এটি মৌল গুণনীয়ক খুঁজে পেতে ব্যর্থ হবে। সেইজন্যই এটিকে ক্লাসিক্যাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার এনক্রিপশন পদ্ধতি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা কঠিন নয়। Shor's Algorithm এর সাহায্যে তাত্ত্বিকভাবে যে কোনও বড় সংখ্যার মৌল গুণনীয়ক (প্রাইম ফ্যাক্টর) কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। যদিও বর্তমানে কার্যকরভাবে এটি সম্ভব নয়। কারণ এখনো পর্যন্ত কোয়ান্টাম কম্পিউটারে যথেষ্ট পরিমাণের কিউবিট (Qubit) নেই। বর্তমানে কিউবিটের সংখ্যা (১,১২১+ / ১৬০০+) এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে IBM, Google এবং অন্যান্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিগুলো দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর সামর্থ্য আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে তারা কাজ করছে। ফলে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাঙার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগবে না এমন আশঙ্কা রয়েছে। এটি একটি বড়ো নিরাপত্তা হুমকি, তাই না ? প্রতিটি সমস্যার যেমন সমাধান রয়েছে, ঠিক তেমনি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর জন্যও রয়েছে কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ থাকতে এবং প্রস্তুত থাকতে, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল বিষয়গুলি আমাদের জানা খুবই জরুরী।  প্রায় তিন বছর আগে ইউরোপ উপলব্ধি করে যে তারা কোয়ান্টাম ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের কাছে শীর্ষ স্থান হারিয়েছে। এই অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য তারা দ্রুত ২ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং এখনও তা অব্যাহত রেখেছে। জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর এবং এমনকি ভারতও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সক্ষমতার পথে এগিয়ে চলেছে। কৃষি নির্ভর দেশ হিসাবে বাংলাদেশের জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে ফলন বৃদ্ধি রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি পণ্যের গুণমান উন্নয়নে এটি বিপ্লব ঘটাতে পারে। এছাড়াও, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং অণুকণা নকশা ও নিরীক্ষণে (VQE - Variational Quantum EigenSolver) সহায়ক হতে পারে, যা বিভিন্ন শিল্পে প্রয়োগ করে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের প্রভাব কেবল কৃষি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। রসায়ন, অর্থনীতি, ক্রিপ্টোগ্রাফি, ঔষধ, জীববিজ্ঞান, মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর বিস্ময়কর প্রভাব রয়েছে। এ তালিকা আরও দীর্ঘ করা যায়।রসায়ন, অর্থনীতি, ক্রিপ্টোগ্রাফি, ঔষধ, জীববিজ্ঞান, মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান. এটা অনস্বীকার্য যে, সত্যিকারের  ডিজিটাল বাংলাদেশে বিনির্মানে, আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বৃহত্তর পর্যায়ে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে কাজ শুরু করেছি। এই প্রযুক্তির সাথে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং এবং এআই এর সম্ভাবনা অত্যন্ত বিশাল। একে সাধারণ কথায় বলতে গেলে, এটি ক্লাসিক্যাল কম্পিউটিং মেশিন লার্নিং এবং এআই এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ: •    বিশাল ও জটিল ডাটা সেট বিশ্লেষণ: কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিশাল ও জটিল ডাটা সেট বিশ্লেষণ করতে পারে। এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন, জিনোমিক্স, আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আর্থিক মডেলিংয়ে বিপ্লব ঘটাতে পারে। •    নতুন ও উন্নত অ্যালগোরিদম উদ্ভাবন: কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং নতুন ধরনের অ্যালগোরিদম উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে, যা ক্লাসিক্যাল মেশিন লার্নিং পদ্ধতির চেয়ে আরও কার্যকর হবে। •    অপ্টিমাইজেশনের সমস্যা সমাধান: কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং জটিল অপ্টিমাইজেশনের সমস্যাগুলি আরও দ্রুত ও সঠিকভাবে সমাধান করতে পারে। এটি লজিস্টিক্স, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা এবং ফিনান্সিয়াল মার্কেটে বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। এই কারণেই কোয়ান্টাম মেশিন লার্নিং এবং এআই এর দিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করা ভবিষ্যতে অত্যন্ত লাভজনক হবে। এটি আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে এবং টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সহায়ক হবে। এছাড়াও কোয়ান্টাম ইন্টারনেট  হল সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত। স্মার্ট বাংলাদেশ হিসাবে এই প্রযুক্তি বিপ্লবে এগিয়ে থাকতে আমাদের এ সম্পর্কে জানতে হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং একটি নতুন প্রযুক্তি এবং এর সুবিধা লাভ করতে হলে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি। কোয়ান্টাম-প্রস্তুত কর্মশক্তি গড়ে তোলার জন্য নীতিনির্ধারকদের আমি বিশেষ ভাবে আহবান জানাই, কারণ এটা খুবই সম্ভব। আমি পৃথিবীতে ৪৭তম ব্যক্তি যে "IBM Certified Associate Developer - Quantum Computation using Qiskit v0.2X" সার্টিফিকেট অর্জনকারী। আমার আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে, বিজ্ঞান ও গণিতে মোটামুটি দক্ষতা রয়েছে, দ্বাদশ / 12 শ্রেণীর এরকম যেকোনো শিক্ষার্থীকে আমি প্রশিক্ষণ প্রদান করে আমার মতো সার্টিফিকেট অর্জন নিশ্চিত করতে পারবো। এখানে উদাহরণ দেয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রের  12 শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য কোয়ান্টাম শিক্ষার একটি উদ্যোগ ((https://q12education.org /) নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে হোয়াইট হাউজ এর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পলিসি এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন দ্বারা গঠিত কনসোর্টিয়াম Q-12 মাধ্যমে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে K-12 শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কোয়ান্টাম শেখার সরঞ্জাম সহজলভ করে তুলবে এবং আগামী প্রজন্মের কোয়ান্টাম নেতৃত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের কেন কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি? বাংলাদেশকে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের ক্রমাগত উন্নয়নের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী চলমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে তাল মিলাতে হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং হল এমনই একটি নতুন প্রযুক্তি, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এর সুবিধা লাভ করতে এবং সম্ভাব্য সমস্যাগুলি এড়াতে নীতি নির্ধারকদের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরি। এখানে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো: •    অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নতুন আবিষ্কার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করতে পারে। এটি বুঝতে পারলে নীতি নির্ধারকরা এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি প্রতিযোগী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবেন। •    কৌশলগত গুরুত্ব: বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে নীতি নির্ধারকদের জ্ঞান থাকা জরুরি। •    সুযোগ সনাক্তকরণ: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কৃষি, ঔষধ, জ্বালানি, এবং তথ্যপ্রযুক্তি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতি ত্বরানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। নীতি নির্ধারকরা যদি এই প্রযুক্তি বুঝতে পারেন, তাহলে তারা এই সুযোগগুলি কাজে লাগানোর জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবেন। •    সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বর্তমান এনক্রিপশন পদ্ধতি ভাঙতে সক্ষম হতে পারে। নীতি নির্ধারকদের যদি এই ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান থাকে, তাহলে তারা কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী এনক্রিপশন ব্যবস্থা গ্রহণের মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবেন। •    দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর সুবিধা লাভের জন্য দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। নীতি নির্ধারকরা শিক্ষা ব্যবস্থায় কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিষয়ে কোর্স চালু করা এবং প্রশিক্ষণ কার্যक्रमের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিতে পারেন। •    গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখনও গবেষণা পর্যায়ে রয়েছে। নীতি নির্ধারকরা গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারেন। তথ্যের নিরাপত্তা  ও গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত বর্তমান এনক্রিপশন পদ্ধতি, যেমন RSA/DH/ECC অ্যালগরিদমগুলো খুব শীগ্রই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কারণ কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলি প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এই অ্যালগরিদমগুলো ভাঙতে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা (কিউবিট সংখ্যা) অর্জন করতে আর সর্বোচ্চ ২ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে। পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রযুক্তি বিশ্লেষকগণ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এন এস এ) এর বিশেষজ্ঞগণ ২০২৪ সালের ২রা এপ্রিল, মতামত প্রকাশ করেছেন যে, ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এর প্রায়োগিক ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হবে। আইবিএম এর কোয়ান্টাম নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান আমার সাথে এক বৈঠকের সময় উল্লেখ করেন- গ্রাহক পর্যায়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা CISO এর সাথে এক বৈঠকের সময় আইবিএম গ্লোবাল এর চেয়ারম্যান এবং সিইও ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, আগামী ৩ বছরের মধ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলো ব্যবহার করে সাইবার আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে, যা তথ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক হুমকি তৈরি করবে। তাই Apple ইতিমধ্যেই iMessage-এর জন্য কোয়ান্টাম-প্রতিরোধী ক্রিপ্টোগ্রাফি তৈরি করেছে, এছাড়াও NIST (https://www.nist.gov/ ) এই নিরাপত্তা হুমকি প্রতিরোধে ইতিমধ্যেই 4টি কোয়ান্টাম নিরাপদ ক্রিপ্টো অ্যালগরিদম নিয়ে কাজ শুরু করেছে। কোয়ান্টাম নিরাপদ করার প্রক্রিয়া সংযুক্ত করা হয়েছে: আবিষ্কার: সমস্ত ক্লাসিক্যাল ক্রিপ্টোগ্রাফিক ফাংশন আবিষ্কার করতে যা তাদের নিজস্ব লিখিত সমাধানের সোর্স কোডে ব্যবহার করা হয়েছে, সেইসাথে দুর্বলতা সনাক্তকরণ এবং একটি CBOM (সামগ্রীর ক্রিপ্টোগ্রাফিক বিল) প্রস্তুত করা। লক্ষ্য : বিক্রেতার প্রদত্ত সলিউশনের জন্য, যেখানে আমাদের ক্লায়েন্টদের সোর্স কোডগুলিতে অ্যাক্সেস নেই, সেখানে আমরা হ্যান্ডশেকিংগুলি সম্পন্ন করা হয়েছে তা বোঝার জন্য শেষ পয়েন্টগুলি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হতে পারি এবং এর ফলে ডায়নামিক ক্রিপ্টোগ্রাফি বিশ্লেষণ, নীতি সমৃদ্ধকরণ এবং দুর্বলতা অগ্রাধিকার। রূপান্তর: কোয়ান্টাম নিরাপদ প্রতিকারের চটপটে রূপান্তর, সেইসাথে কোয়ান্টাম নিরাপদ প্রতিকার প্যাটার্ন (প্রক্সি, টিএলএস, ভিপিএন ইত্যাদি), এনক্রিপশন, কী এবং Certificate management ইত্যাদি।   লেখক : আইবিএম সার্টিফাইট ডেভলোপার
আমাদের তরুণরাও অনেক কিছু পারে
৬ষ্ঠ জনশুমারি ২০২২ অনুসারে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশই তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯-এর মধ্যে। শৈশব এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝামাঝি সময়কে তারুণ্য বলা হয়। আরেকভাবেও বলা যায় যে, 'যার মধ্যে সৌন্দর্য, সজীবতা, জীবনীশক্তি, উদ্দীপনা ইত্যাদি থাকে সেই তো তরুণ।' বিশ্বের বড় বড় বিজয় ও সাফল্য এসেছে এই তরুণদের হাত ধরেই। আর প্রবীণদের প্রজ্ঞা ও পরামর্শ, নবীনের বল-বীর্য, সাহস ও উদ্দীপনায় বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথই ঘুরিয়ে দিয়েছে। অসম্ভবকে সম্ভব করতে ঝুঁকি নিতে পারে শুধু তরুণরাই।   বিশ্ব জুড়ে যখন তারুণ্যের এত উৎসব তখন আমাদের তরুণেরা কী করছে। গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় এখন তরুণদের বিপথে যাওয়া, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া, মাদক সম্পৃক্ততা, অপরাধী গ্যাং এ সক্রিয় থাকাসহ হাজারো অপরাধ অপকর্মে ধ্বংসের মিছিলে সামিল হওয়ার বিষয়াদি। এদেশেই হলি আর্টিজানের ভয়াবহ হামলার পর পাঁচ তরুণের অস্ত্রসহ হাস্যোজ্জ্বল ছবি আমাদের চিন্তা ভাবনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মাদকে জড়িয়ে আরেক ঐষী তার বাবা মায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে গোটা দেশকে ফেলেছিল ভাবনার সাগরে। এসব হতাশার মধ্যেই কী শুধু ডুবে আছি আমরা?  না, আমাদের তারুণ্য নানা ক্ষেত্রে ঈর্ষনীয় সফলতার অনেক চমকও কিন্তু দেখিয়েছে। আশা জাগিয়েছে গোটা জাতিকে। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে 'হিজরত', ঘর ছেড়েছেন সাত তরুণ, 'হিজরত করা তরুণদের পাহাড়ে ভারী অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো' -গণমাধ্যমের এসব শিরোনাম আমাদেরকে বারবারই হতাশায় ফেলেছে, তবে বারবার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে তুলে এনে আকাশসম স্বপ্নও তো দেখিয়েছে তরুণরাই। এতো এতো হতাশা নেতিবাচক পরিস্থিতিতেও প্রযুক্তি মহাসড়কে পাল্লা দেয়া তরুণরা সমৃদ্ধির গতি আনছে। এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনেক তরুণ ঘরে বসেই বিদেশী মূদ্রা আয় করছে। তাদের নিত্য নতুন উদ্ভাবন বিশ্বকেও চমকে দিচ্ছে। আমাদের তরুণদের যোগ্যতার কোন অভাব নেই। তাদের কেউ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ায় গিয়ে বাংলাদেশের পতাকা পুঁতে এসেছেন। ক্রীড়াঙ্গনের মূল শক্তিটাও তো তারুণ্যের। তাদের হাত ধরেই ক্রিকেট বিশ্বে অনন্য এক বাংলাদেশের পরিচিতি ছড়িয়ে আছে। নারী ফুটবলেও আশা জাগানিয়া নানা সাফল্য দেখতে পাচ্ছেন দেশবাসী। মেহেরপুরের এক প্রিয়াংকা হালদার একক প্রচেষ্টাতেই ঠেকিয়ে দিয়েছে ১১৫টি বাল্যবিবাহ। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রিয়াংকার যাত্রাটা এতোটাও সহজ ছিল না। ২০১৩ সালে যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন, তখন প্রথম জানতে পারেন বাল্যবিয়ে সম্পর্কে। বাবার সহায়তায় ঠেকিয়ে দেন এক সহপাঠীর বিয়ে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাননি। মেহেরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে থাকাকালীন সহপাঠী থেকে শুরু করে সিনিয়র আপুদের বাল্যবিবাহও ঠেকিয়ে দেন প্রিয়াংকা। একটা সময় ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়ায়- মেহেরপুরে যেখানে বাল্যবিবাহ, সেখানেই প্রিয়াংকা। এমনও হয়েছে, মেয়েপক্ষের বাড়িতে বাধা দিতে যাওয়ায় তাকে উল্টো বেঁধে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। তবুও থামেনি প্রিয়াংকার যুদ্ধ, সফলতা তিনি এনেই ছেড়েছেন। আমাদের তরুণরা সামাজিক কর্মকাণ্ডসহ আর্ত মানবতার কাজেও পিছিয়ে নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একজন মুহাম্মাদ আবু আবিদ মাত্র চার বছরের প্রচেষ্টায় ত্রিশ হাজার তরুণের বিশাল মানবিক প্ল্যাটফর্ম গড়তে সক্ষম হয়েছেন। দূর্বার তারুণ্য নামের এ ফাউন্ডেশনের মূল মন্ত্রই হচ্ছে- একা 'আমি' অনেক কিছু পারি না, তবে 'আমরা একত্রে' সব কিছুই পারি। একতাবদ্ধ হয়ে আমরা সমাজ পাল্টে দিতে পারি- পারি গোটা দেশকেও বদলে দিতে।  এ তরুণরা শুধু মানুষ নয়, সকল প্রাণীকুলের জন্যই সহায়তার হাত বাড়িয়ে থাকে। অতি বন্যা, জলোচ্ছাস, ডেঙ্গু কিংবা করোনাকালীন ভয়াল দুর্যোগে দূর্বার তারুণ্য যেমন মানুষের পাশে ছুটে গেছে, তেমনই অসহনীয় খরতাপে হাজির হয়েছে গবাদিপশু থেকে শুরু করে কুকুর, বিড়াল, পাখ-পাখালীর কাছেও। বন্য পশু পাখিদের জন্যও যখন বন, পাহাড়ের বৃক্ষ লতায় পানিভর্তি পাত্র বেধে তারই প্রমাণ দিয়েছে।  দৃষ্টান্ত সৃষ্টির ব্যতিক্রম সব কর্মসূচি নিয়েই আর্ত মানবতার পাশে দাঁড়াচ্ছেন দূর্বার তারুণ্যের স্বেচ্ছাসেবীরা। গেল ঈদ-উল-ফিতরে হঠাৎই ঘোষণা হলো, ঈদে স্বজন পরিজনহীন থাকেন যারা তাদেরকে খাওয়ানো হবে ঈদের সেমাই। ৪০টি জেলায় সড়কে আইন শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্য, এতিমখানায় থাকা শিশু-কিশোর এমনকি হাসপাতালের শয্যায় থাকা রোগীদের কাছে ঈদ সেমাই, পায়েস, জর্দা, ভূনা খিচুড়ির ডালা সাজিয়ে হাজির হলেন দূর্বার তারুণ্যের স্বপ্নবাজ কর্মিরা।  এখন চলছে দেশব্যাপী একযোগে গাছ রোপন ও পরিচর্যার মাধ্যমে সবুজ ছায়া গড়ে তোলার অনন্য উদ্যোগ। ‘আমরা মালি’ নামের এ কর্মসূচির আওতায় বাড়ির আঙ্গিনা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সড়ক-গ্রামীণ রাস্তা সবুজায়নের বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এছাড়াও বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, শহরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশক নিধনসহ বহুমুখী সামাজিক কাজে চমৎকার ভূমিকা রাখছে দূর্বার তারুণ্য।  এমন নিঃস্বার্থের সামাজিক ও মানবিক কাজে তরুণরা এগিয়ে এলে মানুষ আশান্বীত হয়ে ওঠে, বেঁচে থাকার সাহস পায়। দেশের ব্যাপারেও ফিরে আসে পজেটিভ ভাবনা। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের সকল কল্যাণমূলক কাজে তরুণদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বর্তমান তরুণসমাজ স্মার্ট প্রজন্ম হিসেবে সুপরিচিত। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, পরিবেশ জ্ঞান, সামাজিক ন্যায্যতা ও সাম্য এবং নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়ে তরুণ সমাজ তাদের উদ্ভাবনী ধারণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতায় অগ্রগামী ভূমিকা পালনে নানা নজির রেখে চলছে।  বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাশ করা তিন বন্ধুসহ সাত তরুণ মিলে তৈরী করেন রিভেরী পাওয়ার এন্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে এই প্রতিষ্ঠান ৩৫০ জনেরও বেশি প্রকৌশলী নিয়ে বড় একটি টিম ও শক্ত একটি ইন্জিনিয়ারিং প্লাটফর্ম তৈরী করেছে- যারা যে কোন জটিল প্রকল্পের/সমস্যার বাস্তবায়ন/সমাধান করতে সক্ষম। বিদ্যুৎ খাতে রিভেরী টিম প্রযুক্তিগত যে উৎকর্ষ সাধন করেছে, তা বাংলাদেশের গর্ব। শুধু প্রযুক্তিগত সমাধানই নয়, রিভেরী আন্তর্জাতিক মানের ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ারসহ নানা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও তৈরী করছে। বিদ্যুত খাতে চমক দেখানো স্বপ্নবাজ তরুণরা হচ্ছেন, মোঃ জাহিদ হোসেন, মোঃ জাহাঙ্গীর আল জিলানী, মোঃ আরিফুল হক, মুস্তাজাব হোসেন, আব্দুর রহমান, এ বি সিদ্দিক ও এস এম ফয়সাল। গেল বছরে 'ফোর্বস থার্টি আন্ডার থার্টিতে' নির্বাচিত হন বাংলাদেশি তারুণ্য অপর ৭ জন। ৩টি ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি প্রাপ্তরা হলেন, কনজিউমার টেকনোলজিতে-আজিজ আরমান ও দীপ্ত সাহা, মিডিয়া, মার্কেটিং ও বিজ্ঞাপ- রুবাইয়াত ফারহান ও তাসফিয়া তাসবিন, স্যোসাল ইমপ্যাক্ট- জাহ্নবী রহমান, আনোয়ার সায়েফ ও সারাবন তহুরা। বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের একটি বিশাল অংশ তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলছে। পোশাক, খাদ্য, মৎস্য, চামড়া, আইটি আর পোলট্রিসহ সব ধরণের কাজেই অবদান রাখতে শুরু করেছে এসব তরুণেরা। তবে তাদের এই পথচলাটা মোটেও সহজ নয়। পদে পদে তাদের বাধার সম্মুখিন হতে হয়। তারপরেও এসব তরুণ উদ্যোক্তারা এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান জাতিকেও। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক/ সম্পাদক, দৈনিক দেশবাংলা  
ড. জেকিল ও মি. হাইড চরিত্রে অভিনয়, অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর ধমক 
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে দুই নিরাপরাধ বাংলাদেশি হত্যায় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার কড়া প্রতিবাদ বেশ মনপূত হয়েছে দেশের মানুষের। কারণ সচেতন মানুষের সুর মিলেছে প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রতিবাদে। শেখ হাসিনা বলেন, একের পর এক বাংলাদেশি মারা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু সেই অর্থে বিচার হচ্ছে না। একই রকম তথ্য দিচ্ছে দেশ বিদেশের পত্র পত্রিকার পরিসংখ্যান। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, এরকম কঠোর উচ্চারণ না করে তাঁর উপায় কী? কারণ সর্বোচ্চ মানবাধিকার রক্ষার সাইনবোর্ড সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে মানবাধিকার ভাঙছে, সেটা দেখাও স্নায়ুবিক অত্যাচার। আর তিনিতো একজন প্রধানমন্ত্রী। একটি দেশের অভিভাবক।  নিউ ইয়র্কের বাফেলোতে ইউসুফ এবং বাবুলের মৃত্যুর আগে ১০ এপ্রিল মারা যান খসরু নামের আরেক বাংলাদেশি। এর আগে ১২ এপ্রিল মিশিগান রাজ্যের ওয়ারেন সিটিতে নিজের বাড়িতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান রাজি নামের এক যুবক। ২৭শে মার্চ নিউ ইয়র্কে নিজের বাসায় পুলিশের গুলিতে মারা যান রোজারিও নামে ১৯ বছর বয়সী একটা ছেলে। একটা বছরের প্রথম চার মাসে যদি একটি দেশেরই ৫ জনের এরকম মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত মৃত্যু হয়, তাহলে পুরো সেই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন, তা যে কেউ অনুমান করতে পারেন।  অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের চেয়ে অনেকে এগিয়ে। কম আয়ের দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কিছুটা নির্ভর করে। তাই কখনও ইচ্ছায় আবার কখনও অনিচ্ছায় বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের নানা পরামর্শ নিতে হয়। সম্ভাবত পূর্বসূরীদের ধারাবাহিকতায়, শেখ হাসিনাকেও নিতে হয় সেই পরামর্শ। কখনও কখনও তাদের নানা কূটনৈতিক অসৌজন্যতাও সহ্য করতে হয়। সেই বিরক্তি শেখ হাসিনার কথায় পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। কিন্তু এবারই প্রথম দেখা গেলো, তিনি এমন প্রকাশ্য বিরক্তির সুরে বলেলেন, তারা আয়নায় নিজের চেহারা দেখেন না।  কী সেই আয়না? কেনই বা তাদের দেখতে হবে? আয়না আর কিছু নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সারা বছরের মানবাধিকার চর্চার চিত্র। তাদের সেটা দেখতে হবে, কারণ তারা নিজেদের সারা বিশ্বের মানবাধিকার রক্ষার এজেন্ট দাবি করেন। এর পক্ষে রয়েছে তাদের নিজস্ব ঘোষণাপত্র। সেই ঘোষণাপত্রের প্রথম ধারায় আছে, প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার রক্ষা করা হবে। দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে, সকল ব্যক্তি আইনের সামনে সমান। ঘোষণাপত্রের ১৮ টি ধারার পরতে পরতে আছে জাতি, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা।   অথচ তাদের দেশে ছোট বাচ্চারাও নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিশু অনিরাপত্তার উদাহরণ হিসাবে ২০১২ সালে কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে বন্দুকধারীর হামলায় ২০ শিশুর মৃত্যুর কথা বলা যায়। ২০২০ সালে তাদেরই গণমাধ্যমগুলো শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অপ-মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে বন্দুকধারীদের হামলাকেই চিহ্নিত করে। অথচ মানবাধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রই সারাবিশ্বে সবচেয়ে সোচ্চার। নিজেরাই যেখানে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে না, তারা কেন অন্যের মানবাধিকার রক্ষায় কথা বলে? কেউ যদি আরও প্রশ্ন করে এই মানবাধিকার রক্ষা করতে চাওয়ার পেছনের কারণ কী?  কোন যুক্তিপূর্ণ উত্তর কি পাবেন তিনি?  সেই উত্তরের বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে, আরেকটু পরিস্কার হওয়া দরকার যুক্তরাষ্ট্রের একই অঙ্গে ড. জেকিল এন্ড মি. হাইড সত্বা নিয়ে। শুরু করি বিচার বর্হিভূত হত্যা এবং আমাদের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ৭ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর এই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। অথচ তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়াল্ডের হিসাবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আর ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাবে, সেদেশে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রতিবছর এক হাজারের আশপাশে থাকে।  বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থন করা আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমি আসলে বলতে চাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমাদের মানবাধিকার শিখতে হবে কেন? তারও চেয়ে বেশি বলতে চাই, আমাদের মানবাধিকার শেখাতে চাওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য এজেন্ডা আছে। এটা অবশ্য নতুন কথা নয়। যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বছর থেকে দেখে আসি, দেখবো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সেই বর্বর হত্যাযজ্ঞ তারা কখনই আমলে আনেনি। ১৯৭৫এ সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘন মনে করেনি। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছে, কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার বিষয়টিও।  আমরা যদি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে আসি, সেখানেও দেখবো একই চিত্র। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের মানবাধিকার নিয়েও চিন্তিত ছিল। অথচ যুদ্ধের সময় যখন ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হলেন, দুই লাখ নারী বীরাঙ্গনা হলেন, শরণার্থী হলেন আরও এক কোটি, তখন তাদের মানবাধিকারের কথা মনে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় অত্যাচারী পাকিস্তানের পক্ষেই ছিলো। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মানবাধিকার প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল।  এবার আসি গত মাসের ২৩ তারিখে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রসঙ্গে। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয় ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন হয়নি। সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, সমাজ ও মানুষের প্রতি বিষেদগারে ভরা ছিল। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ করা হয়। শ্রমনীতি, রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার গৃহবন্দিত্ব নিয়ে নিতিবাচক মন্তব্য বলে দেয় ওই প্রতিবেদন কতটা একচোখা। যে কেউই বলবে, এর প্রতিটি শব্দে শব্দে বসে আছে সেই তলা বিহীন ঝুড়ি তত্ত্বের হেনরি কিসিঞ্জার।  আজকের লেখাটি শেষ করবো, কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড এবং ফ্রাঙ্ক টাইসনকে হত্যার গল্প বলে। প্রথম  জন অর্থাৎ জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যা করা হয় ২০২০ সালে। দ্বিতীয়জনকে হত্যা করা হয় গত মাসে। দু’জনকেই ঘাড়ে হাঁটু চেপে ধরে হত্যা করে আলাদা দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা। এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, দু’জনেই মৃত্যুর আগে বার বার বলছিলেন ‘দয়া করুন, আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না, আমাকে মারবেন না’। দয়া হয়নি পুলিশের। দু’টি হত্যাকাণ্ড দুই অঙ্গরাজ্যে। দুই ঘটনার মধ্যে চার বছররের পার্থক্য। অথচ অত্যাচারীর আচরণ এবং অত্যাচারিতের হাহাকারের ভাষা এক। তাহলে একটা বিষয় পরিস্কার, যুক্তরাষ্ট্র দিনের পর দিন একই রকম অনাচার করে যাচ্ছে। এখন একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাদের আচরণের ধরণ যেখানে পরিস্কার, সেখানে আর কতকাল অত্যাচারিতরা একই রকম হাহাকার করবে?  লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।  
আমার ঘুম ভাঙাইয়া গেলো গো মরার কোকিলে
সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত হলো ২৩ তম টোকিও বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভ্যাল ১৪৩১। এ উপলক্ষে প্রতিবারের মতো দেশ থেকে কিছু শিল্পী আসার কথা ছিলো। কিন্তু ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসের কতিপয় বেরসিক কর্মকর্তা তাদের ভিসা না দিয়ে নাকি জাপানে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় শিল্পীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রবাসীদের বিনোদন দিতে সহযোগিতা করেননি। তাই তড়িঘড়ি করে আমেরিকা থেকে আমেরিকান পাসপোর্টধারী বাংলাদেশী খ্যাতিমান কন্ঠশিল্পী বেবী নাজনীনকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়। শিল্পী বেবী নাজনীন যেহেতু আমেরিকার পাসপোর্টধারী তাই তাকে আমেরিকা থেকে জাপান আসতে ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো সমস্যা হবে না মনে করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সমস্যা অবশ্য একটা ঘটেছিল অন্যত্র। নির্ধারিত সময় শিল্পী জাপানের উদ্দেশ্যে আমেরিকা থেকে রওনা হলে হঠাৎ একটি দুঃসংবাদ পান। ( মায়ের মৃত্যু ) এতে পথ ঘুরিয়ে তিনি চলে যান বাংলাদেশে। কারণ, সেই মূহুর্তে তাঁর মায়ের মৃত্যু সংবাদ তাকে কিছুটা হলেও মর্মাহত করে। ( আল্লাহ শিল্পী বেবী নাজনীনের মায়ের আত্মাকে বেহেশত নসীব করুন)। মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে মন শক্ত করে যথাসময় চলেও আসেন তিনি জাপান। জাপানে শিল্পী বেবী নাজনীনের আসার সংবাদে মেলার আগেরদিন বাঙালী কমিউনিটিতে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে। এই জোয়ার বইতে দেখা যায় শিল্পীর ভক্তদের চেয়ে বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের শিবিরে। স্থানীয় কয়েকজন আমার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে কথা বাড়াইনি। কারণ, অধিকাংশের কথা ছিলো, বেবী নাজনীনের জাপান আগমনে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তিনি একজন শিল্পী এটাহ বড় পরিচয়, তাই। আমিও তখন তাদের সেই যুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছি। কিন্তু ফেসবুকে কয়েকজনের স্ট্যাটাস দেখে পরবর্তীতে সেটা আর মনে হয়নি। মনে হয়েছে সকলের যুক্তির উল্টো কথা। জাপানে যারা রাজনীতি সচেতন বলে দাবীদার তাদের কয়েকজনের সাথে এবিষয়ে কথা বলে ঠিক এমনটাই মনে হয়েছে যে, বেবী নাজনীন শুধুই একজন কন্ঠশিল্পী। জাপানে তিনি কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আসেননি। রাজনৈতিক ইস্যু টেনে আমি যেন কোনো কথা না বলি। শুনে ভালো লেগেছে এই জন্য যে, একটা বিষয়ে অন্তত মানুষগুলোর বোধোদয় হয়েছে। এটাকে রেফারেন্স ধরে হলেও আগামীতে কথা বলা যাবে। আর এখানেই আমার মনে হয়েছে, শিল্পীর জনপ্রিয় এক গানের কথা, " আমার ঘুম ভাঙাইয়া গেলো গো মরার কোকিলে "। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রেফারেন্স যে কাজ হবে না, তা বুঝে গেলাম বৈশাখী মেলার দিন শিল্পীকে নিয়ে ঘটে যাওয়া হট্টগোল দেখে। আর তখনই মনে হলো গানের পরের লাইন, " আমায় পাগলও করিলো গো মরার কোকিলে "। জাপানে এবার ২৩তম বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মেলা জাপান প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রাণের মেলা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভান্ডারে ২৩তম মেলা করতে প্রতিবার ছোট বড় এমন ২৩টি ঘটনার জন্ম হয়েছে। আর এসবে জন্ম হয়েছে দেশের রাজনৈতিক দলের কথিত সমর্থকদের আচরণ থেকে। তারপরেও দেশের বাইরে এতো সুন্দর একটি অনুষ্ঠান করতে তাদেরই বারবার অংশগ্রহণ কেন জরুরী? তারা কি খরচ দিয়ে মেলা চালায়? নাকী এর পিছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে? আশা করি বেবী নাজনীন ইস্যুতে বিষয়টি পরিষ্কার করার পরিবেশ তৈরী হয়েছে এবার।  দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মুখে যেভাবে খই ফোটার মতো বলতে শুনেছি, বেবী নাজনীন একজন কণ্ঠশিল্পী, তাকে নিয়ে বিতর্ক চলে না। এখন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, দেশ থেকে খ্যাতিমান সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দীন অতীতে বৈশাখী মেলায় উপস্থিত হলে তাদের বেলায় কি আচরণ করা হয়েছিল? কি হয়েছিল দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফর কালের দৃশ্য? আপনারা এতো সহজে সেসব ভুলে যান কি করে? ভুললে চলবে না কোনোটাই। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর জন্য রাস্তায় ফুল ছিটান। তবেই আমাদের রাজনীতির পথ সুন্দর ও প্রশস্ত হবে। হবে আমাদের মঙ্গলও। আমরা সব মানি তবে তালগাছ আমার বললে কখনও ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যায় না।  টোকিও তথা জাপানে বাঙালী কমিউনিটি আয়োজিত সবচেয়ে বড় ইভেন্ট এই বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভ্যাল। এই একটি আয়োজনের জন্য সারাটা বছর অপেক্ষায় থাকে জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী সহ অনেকে। অনুষ্ঠানস্থলে প্রতিবছরই কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। রাতের অন্ধকারে সংশ্লিষ্টরস মাপ চেয়ে সাময়িক সমাধানও করা হয় মূচলেকা দিয়ে। যে কারণে পরবর্তীতে একই ঘটনা ঘটাতে সাহস পায় তারা। এর স্থায়ী সমাধান কাম্য। মেলাকে ধরে রাখতে এবং জাপানের মাটিতে বাঙালির সংস্কৃতিকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরতে চাইলে আবেগ আর লোভ সংবরণ করে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। যেমন, রাজনৈতিক পরিচয় বহনকারী কেউই মেলার কোনো দ্বায়িত্বে রাখা যাবে না। যারা একবার মেলা স্থলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সাথে জড়িত হয়েছে তাদের মেলায় নিষিঘোষণা বা পুলিশ অনুমোদন নিয়ে মেলা স্থলে আসার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ভালো কিছু প্রত্যাশা করা হয় তাহলে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে, সেসকল সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে অদূর ভবিষ্যতে জাপানে বসবাসরত বাঙালীরা তাদের সুনাম ধরে রাখতে পারবে না।  আমার প্রত্যাাশা করছি, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবারের বৈশাখী মেলা ও কারি ফেস্টিভেলে ঘটে যাওয়া বেবী নাজনীনকে নিয়ে ঘটানো ঘটনা থেকে। লেখক : জাপান প্রবাসী সাংবাদিক
কারও জন্য কিছুই করা হয়ে ওঠে না!
আমি সাংবাদিক, আমি সম্পাদক, নেতা কিংবা প্রভাবশালী কেউ। কিন্তু এ সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করতে পারি না, কিছুই করা হয় না। বক্তৃতা, বিবৃতি, টক শোতে সমাজকে উদ্ধার করতে, দেশকে এগিয়ে নিতে কতই না বাহাদুরি আমার। অথচ সমাজ বিনষ্টকারী, তরুণ-যুবদের নষ্ট পথের দিশারী, বেশ পরিচিত এক মাদক ব্যবসায়ীকে ভালো হওয়ার সুযোগটুকু দিতে পারি না আমি। ওই মাদক ব্যবসায়ী আকুতি জানিয়ে বলেছিল, আমি অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে আসতে চাই। নোংরা কর্দমাক্ত পথ চলতে চলতে ক্লান্ত আমি। গাড়ির ড্রাইভিং ভালো জানি, লাইসেন্সও আছে - তবে মেয়াদোত্তীর্ণ। একটা লাইসেন্স করে ড্রাইভিংয়ের চাকরি দিয়ে দেন প্লীজ। ৮-১০ হাজার টাকা বেতন হলেও হবে। বিশ্বাস করুন আমি সব ছেড়ে ভালো হয়ে যাবো। তার করুন আকুতিতে মন গলেছে আমার,,, কিন্তু দুই মাসেও তাকে লাইসেন্স করিয়ে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারিনি। আরেকজন তরুণীকে চিনি আমি। যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর প্রতি ভোরে কোরআন তেলওয়াতের মধ্য দিয়ে দিন শুরু হতো তার। নিজের মা, দুই সন্তান আর দুই ভাতিজির সংসার নির্বাহ করতে গিয়ে দিশেহারা ওই নারী। অনেক ঘোরাঘুরি করে একটা গার্মেন্টেও একটা চাকরি জোটাতে পারেননি। উপায়ন্তরহীন অবস্থায় বারের  ড্যান্সার হয়ে কোনমতে জীবন চালাচ্ছেন। এরমধ্যে তিন ওয়াক্তের নামাজ বন্ধ হয়ে গেছে, বন্ধ হয়েছে কোরআন তেলওয়াতও। কিন্তু সম্ভ্রম ধরে রাখা ডান্সারের আয়েও সংসারের চাকা চলছে না তার। সব কিছুতে রাজি থাকলে তিন বেলা খাওয়া পড়ার নিশ্চয়তা মিলবে। কিন্তু ওই নারী এখন হন্যে হয়ে একটা বৈধ কাজ খুঁজছেন, নিদেনপক্ষে কোনো দোকানের সেলস এর কাজ হলেও চলবে তার। মাসে ১৪ হাজার টাকা বেতন হলেও ১২ ঘণ্টা করে শ্রম দিতে তার অনিহা নাই।  ভালো থাকার নিদারুণ আকুতিতে মন গলেছে আমার, তার চোখের পানি আমাকেও ব্যথিত করেছে, কিন্তু তাতে কি? আমিতো তার জন্য একটা সেলসম্যানের চাকরিও জুটিয়ে দিতে পারিনি। আরেকজন তরুণকে চিনি আমি, যে অসহায় মাকে গ্রামের বাড়ি রেখে এক পোশাকে ঢাকায় এসেছে। বলে এসেছে, মা ঢাকায় কামলাগিরি করে হলেও তোমার খরচ পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। কলেজ পড়ুয়া ছেলেটি চার মাস যাবত ঢাকায় ঘুরে ঘুরে বড়ই ক্লান্ত। এখানে চাকরি বাকরি দূরের কথা নিজের খাওয়া থাকারও নিশ্চয়তা করতে পারেনি। বেশ কদিন ধরে কমলাপুর স্টেশনেই রাত কাটায় সে, দিনে একবার খাওয়ারও পথ নেই তার। দুদিনের অনাহারী অবস্থায় এনে তিন দিন আমার বাসায় রেখেছি, শেষ দিন দুপুরে খাইয়ে ৫শ টাকা ধরিয়ে বিদায় দিয়েছি তাকে। গত ১০/১২ দিন সে কোথায় থাকছে, কি খাচ্ছে, তার মায়ের অবস্থাই বা কি সেসবের কিছুই জানা হয়নি আমার। প্রতিবেশী অপরাধীকে মাদক ব্যবসা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছিল শরিফুল। একই টিনশেড বিল্ডিংয়ে ভাড়া থাকায় রাত দিন মাদকসেবীদের আনাগোনায় স্বপরিবারে শরিফুলের অবস্থান করা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ জন্যই অনুরোধ করেছিল যে, বাসার বাইরে মাদক ব্যবসা চালাতে। এতে ওই মাদক ব্যবসায়ী মাইন্ড করেছে। তাই সে রাতেই বিশ পিচ ইয়াবা দিয়ে উল্টো শরিফুলকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়। কোলের শিশু সন্তান নিয়ে খুব বিপাকে পড়েন শরিফুলের স্ত্রী। বলেন, মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতনে মুদি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করা শরিফুল জীবনে পান, সিগারেট, চা পর্যন্ত পানাহার করেন না।  যে রাতে শরিফুলকে গ্রেফতার হন পরদিন সকালে রান্নার মত একমুঠো চাল কিংবা বাজার বলতে কিছুই ছিল না তার ঘরে। হাতে ছিল না টাকা পয়সাও। কি করবে কোথায় যাবে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না শরিফুলের অসহায় স্ত্রী। বিলাপ কান্না ছাড়া যেন কিছুই করার ছিল না তার। যাকে পাচ্ছিলেন তারই হাত পা জড়িয়ে ধরে তিনি শুধু শরীফুলকে মুক্ত করে দেয়ার আর্তনাদ করছিলেন। বলছিলেন, স্বামীকে ছড়াতে পারলে এক মুহূর্তও আর ঢাকা থাকবেন না তিনি, চলে যাবেন ভোলার গ্রামে। তার কান্নাকাটিতে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যন্ত্রণায় ব্যথিত হয়ে নিজের মনটাও। থানার সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, শরিফুলকে গ্রেফতারের পরদিনই আদালতে চালান দেয়ায় জেলে পাঠানো হয়েছে তাকে। এবার উকিল, আদালত, জামিন আবেদনের দীর্ঘ সূত্রীতায় আটকে পড়ে শরিফুলের জীবন। অপরদিকে মাত্র ৭/৮ দিনের ব্যবধানে ঘর ভাড়া প্রাপ্তির অনিশ্চয়তায় শরিফুলের তরুণী স্ত্রীকে বিতাড়িত করে দিয়েছে বাড়ির মালিক। শহরের কিছু না চেনা মেয়েটি তার কোলের শিশু নিয়ে কোথায় ঠাঁই জুটিয়েছে, কোথাও কি মিলছে দু'মুঠো খাবার? সে খবরটুকু জানাও সম্ভব হয় না আমার। জীবনের এমন ছোট ছোট আর্তি আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে। নানা সীমাবদ্ধতায় সেগুলোর দায় এড়িয়ে চলি আমরা, গায়ে মাখাই না। মনে করি উটকো ঝামেলা। অথচ আমাদের কারো কারো উদ্যোগহীনতায় একেকটি জীবন ঝরে যায়, ধ্বংস হয় অজস্র পরিবার। আসলে বক্তৃতার মঞ্চে, ফেসবুকের টাইম লাইনে অনেক কিছু বলা যায়, অনেক কিছুই করে ফেলা যায় কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন। সেখানে কারো জন্য মঙ্গলজনক কিছু করা হয়ে উঠে না সহজে। এরজন্য প্রয়োজন সমমনাদের সমন্বিত উদ্যোগ, এগিয়ে আসার আন্তরিকতা। লেখক: সিনিয়র অনুসন্ধানী সাংবাদিক
আগে ঘরের ছেলেরা নিরাপদে ঘরে ফিরুক
আমিরাতের আল হামরিয়া বন্দরে পথে রয়েছে এমভি আবদুল্লাহ। ৩২ দিনের জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে ২৩ নাবিক এখন পাড়ি দিচ্ছে এডেন উপসাগর। বাড়তি নিরাপত্তার জন্যে জাহাজটি ঘেরা হয়েছে কাঁটাতার দিয়ে। আরও নিরাপত্তার জন্যে জাহাজের ডেকে যুক্ত করা হয়েছে ফায়ার হোস পাইপ। যাতে আবার কোনো বিপদ হলে নিরাপত্তাকর্মীরা শত্রুর দিকে গরম পানি ছিটাতে পারে। নাবিকরা যেন লুকিয়ে থাকতে পারেন সেজন্যে প্রস্তুত রয়েছে নিরাপদ গোপন ঘর সিটাডেল। আর সব শেষ নিরাপত্তার জন্যে এমভি আবদুল্লাহকে পাহারা দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ।  জাহাজটির মালিক কেএসআরএম গ্রুপের কর্মকর্তারা এসব তথ্য দিয়েছেন গণমাধ্যমে। তারা বলছেন সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পেলেও এমভি আবদুল্লাহ এখনও উচ্চঝুঁকিপ্রবণ এলাকা অতিক্রম করেনি। তাই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই নিয়মের কারণেই তারা সাংবাদিকদের বলেননি, কী পরিমাণ মুক্তিপণের বিনিময়ে জাহাজটি মুক্ত হলো। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে একজন জলদস্যুর বরাত দিয়ে, মুক্তিপণের পরিমাণ উল্লেখ করা করা হলেও তা স্বীকার করেনি কেএসআরএম।  এদিকে জাহাজটি মুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, জলদস্যুদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সমঝোতা করা হয়েছে। এখানে মুক্তিপণের কোনো বিষয় নেই। আলাপ-আলোচনা ও বিভিন্ন ধরনের চাপ দিয়ে মুক্ত করা হয়েছে আব্দুলাল্লাহকে। অনেকে ছবি দেখাচ্ছেন, এ ছবিগুলোরও কোনো সত্যতা নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিপিং ডিপার্টমেন্ট, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম উইং, ইউরোপিয়ান নেভাল ফোর্স, ভারতীয় নৌবাহিনী এবং সোমালিয়ার পুলিশ এই উদ্ধার কাজে এখনও সহায়তা করছে।  আমরা যদি একটু পেছনে যাই দেখব, ছিনতাই হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় সোমালিয়ার উপকূল থেকে জিম্মি জাহাজ ছাড়িয়ে আনার নজির প্রায় নেই। ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার দস্যুদের হাতে এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি হয় ১২ মার্চ। জাহাজটি মুক্ত হয় শনিবার রাত ১২টা ৮ মিনিটে। এ হিসাবে ৩২ দিন পর জাহাজটি মুক্তি পেলো। এর আগে ২০১০ সালে এই একই গ্রুপের আরেকটি জাহাজ এমভি জাহান মণি ছিনতাই করেছিল সোমালিয়ার দস্যুরা। সেটি উদ্ধার করতে তিন মাস নয় দিন সময় লেগেছিল। সোমালিয়ার উপকূলে দস্যুদের চূড়ান্ত অত্যাচার ছিল ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ান আর্থ ফিউচার ফাউন্ডেশনের হিসাবে ২০১১ সালে ৩১টি জাহাজ জিম্মি করেছিল সোমালীয় দস্যুরা। এর প্রত্যকেটিকেই মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেতে হয়েছিল। প্রতিটি জাহাজ ছাড়া পেতে সময় লাগে গড়ে ১৭৮ দিন। সোমালিয়ায় নাবিকদের দীর্ঘ সময় জিম্মি থাকার ঘটনা মালয়েশিয়ার জাজাজ এমভি আলবেদো জাহাজের। তাদের ২০১০ সালের ২৬ নভেম্বর জিম্মি করেছিল দস্যুরা। ২০১৩ সালের ৭ জুলাই জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে নাবিকেরা মুক্তি পেয়েছিলেন। মুক্তির সব শেষ ধাপটি ছিল ২০১৪ সালের ৭ জুন।  জাতিসংঘের মাদক এবং অপরাধবিষয়ক সংস্থা ইউএনওডিসি এর তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল ছিনতাই হওয়া মিয়ানমারের একটি মাছ ধরার জাহাজটি মুক্ত হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। জাহাজটির ২৪ জন নাবিকের মধ্যে ৬ জন অসুস্থ হয়ে মারা যান। মিয়ানমারের ১৪ জন নাবিক মুক্তি পান ২০১১ সালে। বাকি ৪ জন মুক্তি পান ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। শেষ ৪ জন মুক্তি পান ৪ বছর ৩১৩ দিন পর। সোমালিয়ান দস্যুদের মুক্তিদেয়ার এত ফিরিস্তি এখনে দিলাম, কারণ প্রথমত বলতে চাইলাম এরা ভয়ঙ্কর হতে পরে। দ্বিতিয়ত সম্প্রতি যেভাবেই আমাদের নাবিকরা মুক্তি পান না কেন, খুব কম সময়ে তারা ঘরে ফেরার পথে আছেন, কিন্ত তারা এখনও শতভাগ বিপদমুক্ত নন।  অনেকে আমার এমন কথায় আঁতকে উঠতে পারেন। ভয় পাওয়ার হয়তো কিছু নেই। কিন্তু কিছু অদ্ভুত বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। এবার এই বাংলাদেশি জাহাজ জিম্মি হওয়ার পর আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখলাম সোমালিয়া উপকূলে এই অপহরণের বিষয়টি যেন কোনো অপরাধ নয়। একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। ডাকাতরা রীতিমতো দক্ষ। তারা প্রযুক্তি জানে।  আধুনিক অস্ত্র আছে। এমনকি তাদের পক্ষে কথা বলার মত বৈধ প্রতিষ্ঠান আছে। ডাকাতির মতো একটি ভয়ঙ্কর অপরাধীদের সঙ্গে মধ্যস্ততার জন্যে প্রকাশ্য প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছে লন্ডন আমেরিকার মত দেশে। রাষ্ট্র শক্তির মতো কোনো অমোঘ শক্তি পেছনে না থাকলে কী এই দৌরাত্ম সম্ভব? তাই কারা দস্যুদের পক্ষে কারা বিপক্ষে তা বোঝার ঝুঁকি তো রয়েই যায় শেষ মুহূর্তে। পাঠক আসুন আবারও প্রেক্ষাপটে ফিরি। জিম্মি হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এমভি আবদুল্লাহর প্রধান কর্মকর্তা আতিক মুঠোফোনে তার স্ত্রীর কাছে একটি অডিও বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি বলেন, ফাইনাল কথা হচ্ছে, এখানে যদি টাকা না দেয়, আমাদের একজন একজন করে মেরে ফেলতে বলেছে। তাঁদের যত তাড়াতাড়ি টাকা দেবে, তত তাড়াতাড়ি ছাড়বে বলেছে। এই বার্তাটা সবদিকে পৌঁছে দিও। অর্থাৎ প্রথম থেকেই ২৩ নাবিকের বেঁচে থাকার আকুতি বাংলাদেশের কাছে ছিল। যে কারণে নাবিকদের যেন ন্যূতম ক্ষতি না হয় সে বিষয়টি প্রথম থেকে খুব মুখ্য ছিল। তাই এ কথা আর বলতে বাঁধা নেই যে, জিম্মি হওয়ার পর ২৩ নাবিকই শুধু  চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে পড়েননি। ঝুঁকির মুখে ছিলেন যারা তাদের উদ্ধার করতে চাইছিলেন তারাও। তাদের সামনে একদিকে ভয়ঙ্কর জটিল কূটনীতি অন্যদিকে ২৩ জনকে বাঁচিয়ে রাখার দায়। সবকিছু মিলিয়ে সবাকে কৌশলী হতে হয়েছে। শুধু কৌশলী বললে ভুল হবে, বলতে হবে সুক্ষ্ম কৌশলী। যে কারণে বার বার অভিযানের প্রস্তাব আসলেও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। জাহাজ জিম্মি হওয়ার খবর প্রথম জানিয়েছিল যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী। তাদেরকেও বাংলাদেশ শুধু অনুসরণ করার অনুরোধ করেছিল। সেখানো ভারতীয় নৌবাহিনীরও একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল। তারাও বিশেষ নজর রেখেছিলেন, নাবিকদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।  এখনও পর্যন্ত উদ্ধার কাজের পুরো প্রক্রিয়া প্রকাশ্য হয়নি। কিন্তু সার্বিক বিশ্লেষণে বোঝা যায় যে, ২৩ জন  নাবিক যে নিরাপদে ফিরতে যাচ্ছেন, এটা একজন মানুষ বা একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নয়। এটা রীতিমতো কূটনীতিক সাফল্যই বলতে হবে। যারা কাজ করেছেন, তাদের কাউকে ছাড়া কারো পক্ষে এতদূর এগোনো সম্ভব ছিল না। আর সম্ভব হলেও সেই মাসের পর মাসের ধাক্কা ছিল হয়তো। থাক আর হয়তো বলে মন খারাপ করতে চাই না। কারণ এই ‘হয়তো’ আমাদের সামনে অনেক বিপজ্জনক প্রশ্ন আনতে পার। তাই আর প্রশ্ন না বাড়িয়ে শুধু বলি, গোটা প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে ধান ভানতে এই  শিবের গীত গাইতে হলো। ছবির যে প্রসঙ্গ খোদ প্রতিমন্ত্রী তুলেছেন, সেই ছবিটি আমিও দেখেছি। আজকের এই ফেক ভিডিও ছড়ানোর যুগে আমার মনেও যে প্রশ্ন ওঠেনি তা নয়। একদল ডাকাতের সঙ্গে যোগাযোগ করে, প্লেনে বহন করে পর পর ৩টি ডলারের প্যাকেট ফেলা খানিকটা সিনেম্যাটিক। কিন্তু সত্য যে হতে পারে না, তাও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে আমার প্রশ্ন হচ্ছে টাকা যদি দিয়েই থাকে, তাহলে ফেরত আসার পথে এত নিরাপত্তা লাগছে কেন? আর যেখানে আমরা জলদস্যু দলপতির চিঠির কথা জেনেছি। যে চিঠিতে তিনি বলেছেন এই চিঠি দেখালে কেউ তাদের আটকাবে না। তারপরেও এত সতর্কতার কারণ কী শুধুই আন্তর্জাতিক নিয়ম? যে কারণে বলতেই হচ্ছে জাহাজ এবং নাবিক উদ্ধার কূটনীতি এখনও সক্রিয়। যাই হোক, বিমান থেকে টাকা ফেলার ছবি, কেএসআরএম এর বিবৃতি এবং প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে এক ধরণের অমিল খুঁজে পাচ্ছেন কেউ কেউ। এটা কোন কোন গণমাধ্যম থেকে সংক্রামিত হয়ে  মানুষের মনেও ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। সেই ধোঁয়াশা ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একটা সফল অপারেশনের শেষ সময়ে এটা আসলেই প্রত্যাশিত ছিল না। কারণ এই তিন বক্তব্যে আপাত দৃষ্টিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ মিল হয়তো নেই, কিন্তু আমাদের ভাবা দরকার গোটা বিষয়টা একটা কূটনীতি। এখানা নানা কৌশল থাকবেই। তাই ধোঁয়াশাও থাকবে। আর সবচেয়ে বড় কথা ২৩ জন নাবিকসহ জাহাজটি এখনও সমুদ্রে। নিশ্চয়ই ঘরের ছেলেরা ঘরে ফেরার পর অনেককিছু প্রকাশ্য হবে। আর যদি নাও হয়। তারাতো ফিরলো। না হয় এই সুযোগে একবার নজরুল চর্চা করে নেবো " মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহীয়ান'। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী