logo
  • ঢাকা শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পেঁয়াজ ও মসলা চাষে ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত চাষীরা

আজিজুর রহমান পায়েল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
|  ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪১ | আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৫৭
Farmers deprived of credit facilities for cultivating onions and spices, rtv
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক কৃষক জমিতে লাঙল দিয়ে চাষ দিচ্ছেন, ছবি: আরটিভি অনলাইন

পেঁয়াজ ও মসলা চাষে সরকারের স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকরা। এই ঋণ বরাদ্দের বেশিরভাগই ব্যাংকে অলস পড়ে আছে।

জেলার কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ঋণ সুবিধা দেয়ার জন্যে যথাসময়ে কৃষকদের তালিকা দিলেও ব্যাংক উদাসীনতা দেখাচ্ছে ঋণ বিতরণে। তাদের অনাগ্রহের কারণেই ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষকরা। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় জেলা কৃষি ঋণ বিতরণ কমিটির সভায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন কৃষি কর্মকর্তারা। অন্যদিকে কৃষকরা এই ঋণের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।

এ বছর মৌসুম শুরু হয়ে গেলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যাংকগুলো এই ঋণ বিতরণ কার্যক্রম শুরুই করেনি। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে এ ঋণ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য মসলা জাতীয় ফসল আবাদের মৌসুম। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি ব্যাংকে এই ঋণ বরাদ্দ এসেছে ২১ নভেম্বর।

সরেজমিনে খোঁজ নিতে গেলে এই ঋণ বিতরণে নানা অজুহাত দেখান ব্যাংক কর্মকর্তারা। নবীনগর উপজেলার গোসাইপুরে কৃষি ব্যাংকে গিয়ে জানা যায়, গত অর্থবছরে তাদের চার শতাংশ ঋণের বরাদ্দ ছিল ২ লাখ টাকা। এ থেকে মাত্র ১ জনকে এই ঋণ সুবিধা দিয়েছেন তারা। কুতুব মিয়া নামের চর গোসাইপুর এলাকার কৃষক পান ২০ হাজার টাকা। তাও আলু চাষের বিপরীতে এই ঋণ দেয়া হয়।

এবিষয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, কৃষকরা ১০-২০ হাজার টাকা ঋণের জন্য আসে না এবং তাদের আগ্রহও কম। তাছাড়া পেঁয়াজ বা মসলায় ঋণের পরিমাণ কম হওয়াটাও একটি বিষয়। ২০১৬-’১৭ অর্থবছরে এক একর জমিতে আলু চাষের জন্য ঋণ বরাদ্দ দেয়া হয় ৬১ হাজার ২৪০ টাকা। আর একই পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজ চাষের জন্য বরাদ্দ ৪৬ হাজার ৫৭৯ টাকা। সে কারণে বেশি টাকা পেতে মসলার পরিবর্তে কৃষকরা আলু বা অন্য কিছুর চাষ দেখিয়ে ঋণ নেয়।

ব্যাংক ম্যানেজার জগদীশচন্দ্র আচার্য জানান, গত বছর ২ লাখ টাকা বাজেট পেয়েছিলেন। এ বছর এখনও পাননি। ছোট ছোট ঋণ ৫-১০ হাজার টাকা কৃষকরা নিতে আসেন না।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের আগের ঋণের কারণে অনেকে এই ছোট ঋণ নিতে আগ্রহী হয় না। কৃষি অফিস তালিকা দিলেও আমরা তদন্ত করে ঋণ দেই। তবে তারা এখন পর্যন্ত কোনও তালিকা দেয়নি।

কৃষি ব্যাংকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মোবারক হোসেন জানান, গত ২১ নভেম্বর ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছেন তারা। যা তাদের ২৮টি শাখায় বণ্টন করে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক শাখায় ১ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। তবে আউলিয়া বাজার, পাহাড়পুর, নূরপুর, সাতবর্গ ও আখাউড়া শাখায় বরাদ্দ বেশি দেয়া হয়েছে। গত বছর একই পরিমাণ বরাদ্দ ছিল জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে ৬০ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে।

সোনালী ব্যাংক ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল মতিন জানান, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মসলা ঋণ দেয়া হয়। এবার ১১ লাখ টাকা বাজেট পেয়েছেন তারা। যা ৬টি শাখার মাধ্যমে ভাগ করে দেয়া হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা এসব কথা বললেও বাস্তব চিত্র অন্যরকম। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত জেলা কৃষি ঋণ বিতরণ কমিটির এক সভায় ৪ শতাংশ হারে মসলা জাতীয় ঋণ বিতরণ শতভাগ না হওয়ায় জনতা, অগ্রণী ও উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ওই সভায় অর্থবছর শুরুর দিকের একটি ঋণ বিতরণ চিত্র পেশ করা হয়। যাতে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংক ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ পেলেও তাদের বিতরণের হার ছিল তখন শূন্য। অগ্রণী ব্যাংকের বরাদ্দপ্রাপ্ত ২ লাখ টাকার মধ্যে বিতরণ হয়নি ১ টাকাও। উত্তরা ব্যাংক তাদের প্রাপ্ত বরাদ্দের অর্ধেক বিতরণ করে। মোট ১৪ লাখ টাকার মধ্যে বিতরণ হয় মাত্র ৫০ হাজার টাকা। বিতরণের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ওই অর্থবছরে ৪ শতাংশ ঋণ দেয়ার জন্য ১৬১ জন ডাল চাষি, ৪৪৭ জন তেল চাষি, ৩৩৩ জন মসলা চাষি, ২৮ জন ভুট্টা চাষির নামের তালিকা ব্যাংকে দিয়েছিল।

এবিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবু নাছের বলেন, মসলা জাতীয় ফসল চাষে উৎসাহ প্রদান এবং আমদানি হ্রাস করার জন্যে এই প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ব্যাংকের দায়িত্ব হলো ঋণটা প্রদান করা। এটার পুরোপুরি দায়িত্ব তাদের। আমরা যেহেতু কৃষকের কাছে আছি সে কারণে আমরা কৃষকের তালিকা করে তাদের কাছে দিচ্ছি। জেলা ঋণ বিতরণ কমিটিতে আলোচনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা এই তালিকা করে দিচ্ছি। কিন্তু এমন কোনও নিয়ম নেই তালিকা আমাদের দিতে হবে। তারপরও স্বউদ্যোগে তালিকা করে তাদের কাছে দিচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে জেলার ৭টি উপজেলায় ডাল ফসলের জন্যে ৩৪ জন, তেল ফসলে ২৮৩ জন, মসলার জন্য ২০৯ জন ও ভুট্টা চাষে ঋণ প্রদানের জন্য ৩ জনের নামের তালিকা করে তারা ব্যাংকে পাঠিয়েছেন।

তবে গত দুইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বিরামপুর, সিন্দুউড়া ও নবীনগর এলাকার গোসাইপুর ঘুরে দেখা গেছে এই ঋণ সম্পর্কে কৃষকরা জানেন না। এসময় ১৫-২০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হয় আরটিভি অনলাইনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। যাদের সবাই মসলা জাতীয় ফসল আবাদ করেন।

সিন্দুউড়ার আবিদ মিয়া নামের এক কৃষক বলেন, এ ব্যাপারে কোনো কিছুই জানি না। এ গ্রামের শাহ আলম মিয়া নামের আরও একজন কৃষক বলেন, ঋণ পেলে ভালো হতো। সাচ্চু মিয়া নামের আরেকজন বলেন, সরকার সুযোগ-সুবিধা দিলে আরও বেশি বেশি ফসল লাগাইতাম। ১০ টাকার অ্যাকাউন্ট খুলে ৭-৮ বছর আগে ৩ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছিলাম। এরপর আর কোনো ঋণ পাইনি।

এজে/পি

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • বিশেষ প্রতিবেদন এর সর্বশেষ
  • বিশেষ প্রতিবেদন এর পাঠক প্রিয়