logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬

‘পানি নাই তাই ইনকাম অর্ধেক’

মোস্তফা কামাল, নড়াইল
|  ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:১৯
নড়াইল সদরের ভদ্রবিলা ইউনিয়নের ২টি গ্রাম রামসিদি ও ডহর রামসিদি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৬ মাস নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে এই দুটি গ্রামের শতাধিক পরিবার। এই দুটি গ্রামের নৌকা তৈরি ইতিহাস শত বছরের। প্রতি বছর বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের অন্তত পাঁচ শতাধিক লোকের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যায়। বছরের পর বছর বর্ষার শুরুতে এখানে নৌকা কেনাবেচার ধুম পড়লেও এবারের চিত্র ভিন্ন। 

চলতি বছরে বৃষ্টি কম হওয়ায় এখনও জমে উঠেনি নৌকার হাট। প্রতি হাটে সারি সারি নৌকা উঠলেও আশানোরুপ কেনাবেচা নেই রামসিদির হাটে। তবে প্রতি হাটে বিভিন্ন জেলা থেকে অল্প সংখ্যক ক্রেতা আসছে এখানে নৌকা কিনতে। ঢিলেঢালা ভাবে চলছে নড়াইলের সবচেয়ে বড় নৌকা কেনাবেচার এই হাট। তাই সব মিলে এ বছর ভালো সময় যাচ্ছে না এখানকার নৌকা তৈরির সঙ্গে জড়িত কয়েকশ’ পরিবারের। 

রামসিদি গ্রামের তিতাস বিশ্বাস জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে রামসিদি গ্রামে নৌকা কেনাবেচা হয়। শত বছর ধরে নড়াইল সদর উপজেলার রামসিদি গ্রামের শত পরিবার নৌকা গড়েই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। চলতি বছরে নৌকা কেনাবেচা খুবই কম হচ্ছে। এখানে প্রতি বুধবার সকাল ৬টা থেকে এ নৌকার হাট বসে। বছরের প্রায় ৬ মাস ধরে এ নৌকার হাট চলে। 
নৌকা কারিগর সুশান্ত বিশ্বাস জানান, এই নৌকা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে অন্তত ১০টি জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। এখানে বিভিন্ন রকমের নৌকা বানানো হয়। বর্ষা মৌসুমে এখানে বিক্রি হয় বিল এলাকায় চলাচলের উপযোগী কালাই-ঢালাই (কালাই- ঢালাই বিল এলাকায় চলাচলের উপযোগী নৌকার নাম)। তবে এ বছর তাদের ইনকাম খুবই কম হচ্ছে। কারণ বাজারে নৌকার চাহিদা খুবই কম।

কারিগররা আরও জানান, এ হাটে নৌকা কিনতে আসেন খুলনার ফুলতলা, তেরখাদা, রূপসা, ডুমুরিয়া, ও দিঘলিয়া, যশোরের অভয়নগর ও বাঘারপাড়া, মাগুরার শালিখা ও মুহম্মদপুর, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী, মকসেদপুরসহ অনেক এলাকার সাধারণ ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর নৌকার অনেক চাহিদা থাকে। চলতি বছরে নৌকার তেমন চাহিদা নেই। অন্যবারের তুলনার তাদের ইনকাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। 

নৌকা তৈরির কারিগর আসলাম জানান, বছরের ছয় মাস তাদের নৌকা তৈরির কাজ থাকে। প্রতি বছর নৌকা তৈরির মৌসুমে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা কাজ করেন। এ বছর কাজের চাপ কম থাকায় রাতের বেলা তাদের কাজ করতে হচ্ছে না।  প্রতি বছর নৌকা তৈরির মৌসুমে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে তার ইনকাম হতো ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা। বর্তমানে কাজ কম থাকায় দিনে তার ৫শ’ টাকার বেশি ইনকাম হচ্ছে না। অনেক কারিগরের কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছে। 

খুলনা জেলার তের খাদা এলাকার নৌকা ব্যবসায়ী আজমল হোসেন প্রতিবছরের মতো এ বছরও নৌকা কিনতে এখানে এসেছেন। তিনি জানান, ২৫-২৬ বছর ধরে নৌকার ব্যবসা করেন। এই হাট থেকে নৌকা কিনে তিনি খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিক্রি করেন। লাভও ভাল হয়। তবে এ বছর খুলনা অঞ্চলে বর্ষা কম হওয়ায় নৌকা কেনাবেচা অর্ধেকে নেমে এসেছে। 
ব্যবসায়ী ও কারিগররা জানান, এ নৌকার হাটে প্রতি বছরে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের প্রায় ৫ হাজার নৌকা কেনাবেচা হয়। প্রতিটি নৌকা গড়ে ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়। অনেকে অর্ডার দিয়ে নৌকা তৈরি করে নিয়ে যান এই গ্রামের কারিগরদের কাছ থেকে। এখনও এ বছর নৌকার হাট জমে উঠেনি। 

কারিগর সুভাষ বিশ্বাস জানান, বছরের ছয় মাস তারা এই নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাকি ছয় মাস তারা দিন মুজুরসহ বিভিন্ন প্রকার কাজ করে। হাটে নৌকার চাহিদা থাকলে বর্ষা মৌসুমে তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে। এই সময় তাদের ইনকাম ভাল হয়। কাজ বেশি হলে একজন কারিগর দিনে ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা এবং একজন হেলপার ৩শ’ থেকে ৬শ’ টাকা রোজগার করেন। 

নৌকা কিনতে আসা এক সাধারণ ক্রেতা জানান, শুনেছি এই হাটে নৌকার দাম এবছর কিছুটা কম। তাই তিনি এই হাটে নৌকা কিনতে এসেছেন। সাড়ে ৪ হাজার টাকা দিয়ে একটি  নৌকা কিনেছেন বলেও জানান তিনি। 

জানা গেছে, ক্রেতা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নৌকা প্রতি ৫০ এবং সাধারণ ক্রেতাদের কাছ থেকে নৌকা প্রতি ১০০ টাকা খাজনা আদায় করা হয়। এখানে যারা নৌকা বিক্রি করতে আসে তাদের কোন খাজনা দিতে হয় না। 

ভদ্রবিলা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শেখ মোশারেফ হোসেন জানান, এখানে প্রতি বুধবারে নৌকার হাট বসে। এখান থেকে ইউনিয়ন পরিষদ কোনও টোল নেয় না। প্রতি হাটে ইউনিয়নের চৌকিদার, ইউপি সদস্যরা সহযোগিতা করে। এখানে দীর্ঘদিন যাবত রামসিদি গ্রামের মানুষ নৌকা তৈরি করে এবং এ হাটে বিক্রি করে।

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়