logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০ চৈত্র ১৪২৭

করোনার কারণে মদে ভেজাল, ভয়ঙ্কর বিষক্রিয়ায় বাড়ছে মৃত্যু

Deaths from adulterated, horrific poisoning are on the rise across the country
ফাইল ছবি

করোনার কঠিন ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে মদে আসক্তদের উপর। বিদেশি মদ হাতের নাগালে না পাওয়ায় পানযোগ্য ও আসল মদের শঙ্কটে পড়ে যেনতেন কিংবা ভেজাল মদ পান করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন অনেকেই, যেনো মৃত্যুর মিছিল লেগেছে। গত দুইদিনে মদ পানের পর অন্তত ১০ জনের রহস্যজনক মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। মদ পানের পর দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সংখ্যাও কম নয়।

সম্প্রতি মদ পানের পর দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার ৩ জন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একইভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন এবং বগুড়ায় ৬ জন মদ পানের পর অস্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। সংশ্লিষ্টরা ধারনা করছেন মদের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।

আরও পড়ুন: বিষাক্ত মদ পানে পাঁচজনের মৃত্যু

শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থার ৯ জন

গাজীপুরের সারাহ রিসোর্টে বেড়াতে যাওয়া ২টি বেসরকারি শীর্ষ পর্যায়ের বিজ্ঞাপনী সংস্থার একদল কর্মীর বেশ কয়েকজন একই সাথে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাদের ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই রিসোর্টে একই মালিকানাধীন ২টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ জন সদস্য গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বেড়াতে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। সেখানে মদ পানের পর অন্তত ১০ জন প্রায় একই সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাদের রাজধানীতে এনে কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে ২ জন হাসপাতালে মারা গেছেন, আর ২ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যান্যরাও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

মোহাম্মদপুরে ধর্ষণ মামলা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ শিক্ষার্থী

একইভাবে মদ পানের পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ও ছাত্রী। চিকিৎসকরা মনে করছেন মদের বিষক্রিয়ায় তারা মারা গেছেন। মৃত ওই ছাত্রীর বাবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেছেন। যেখানে ওই ছাত্রীর বন্ধু রায়হানসহ ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আ ম সেলিম রেজা আরটিভি নিউজকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েটির শরীরের কোথাও আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার যৌনাঙ্গে বা পায়ুপথেও অস্বাভাবিক চিহ্ন মেলেনি। মৃত্যুর আগে তার উপর জোর প্রয়োগ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ইতোমধ্যে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে কি না- সেটি জানতে তার মরদেহ থেকে ভিসেরা আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়াও তার যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথ থেকে আলামত সংগ্রহ করে ডিএনএ টেস্টের জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তবে ধারনা করা হচ্ছে- বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হতে পারে।

আরও পড়ুন: রাজধানীতে তরুণী ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ: যা ঘটেছিল সেদিন

বগুড়ায় মদের বিষক্রিয়ায় ৬ জন

বগুড়ায় 'বিষাক্ত মদপানে' ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি, ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বিষাক্ত মদ পানে। আর বাকীরা স্ট্রোক করে মারা গেছেন। মৃত ব্যক্তির স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পুলিশের নিশ্চিত করা তিনজন বাদে অন্যরাও বিষাক্ত মদ পান করেছিলেন। একই বিষাক্ত মদ খেয়ে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সুমন রবিদাসের বাবা প্রেমনাথ, তার চাচা রামনাথ, পলাশের ভাই আতিকুর রহমান পায়েল, পায়েলের বন্ধু আইয়ুব, শিববাটি এলাকার হোটেল শ্রমিক রঞ্জু।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার ফুলবাড়ী এলাকার পলাশ মিয়া সোমবার ১১টার দিকে মেডিকেলে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। পলাশের ভাই পায়েল ও তার বন্ধু আইয়ুব বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেলে ভর্তি। তারা ‘পারুল ল্যাব’ নামক একটি দোকান থেকে 'রেকটিফাইড অ্যালকোহল' নেন। এরপর তা গত শনিবার সন্ধ্যায় খাওয়ার পর ৩ জনেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পায়েলের স্ত্রী বলেন, গত শনিবার তাদের পরিবারের একজনের জন্মদিন ছিল। এ কারণে তার স্বামী, দেবর ও দেবরের বন্ধু শখ করে মদ পান করেন। এরপর থেকে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সোমবার হাসপাতালে নেওয়ার পর পলাশ মারা যান, আর পায়েল ও আইয়ুব চিকিৎসাধীন।

হাসপাতালেই পলাশের ভাগ্নে বাধন বলেন, জন্মদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ওই সন্ধ্যায় তার মামার সাথে আব্দুর রহিম (৪২) নামের আরেকজনও মদ পান করেন। পরে তিনি তার বাড়ি ফুলবাড়ী দক্ষিণ পাড়ায় গতকাল রোববার মারা যান।

পারুল হোমিও ল্যাব ও শাহীন হোমিও হলের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য পুলিশের কাছে আছে কিনা জানতে চাইলে বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ওই ২টি দোকান সম্পর্কে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। মামলাও প্রক্রিয়াধীন।

জেলা পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা আরটিভি নিউজকে বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য বলছে, ৩ জন বিষাক্ত মদ পান করে মারা গেছেন। তারা হলেন, সুমন রবিদাস, পলাশ ও সাজু। অন্যরা স্ট্রোক করে মারা গেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।

শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ আরটিভি নিউজকে বলেন, মৃতদের মধ্যে সুমন রবিদাস বিষাক্ত মদ পানে স্ট্রোক করে মারা গেছেন। অন্যদের বিষয়ে ময়না তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলে জানা যাবে। তবে বিষাক্ত মদ পানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন আরও কয়েকজন। অন্যরা কীভাবে মারা গেছেন তা জানা নেই।

লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় মাদকের সীমাবদ্ধতা

মাদক আমদানিতে দেশের হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স রয়েছে। এরমধ্যে ৫ তারকা মানের হোটেলগুলো অন্যতম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মদ উৎপাদন ও সরবরাহের উপর একটা বড় প্রভাব পড়েছে। যার ধাক্কা সম্প্রতি বাংলাদেশেও লাগতে শুরু করেছে। যে কারণে দেশের ভেজাল মদ ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। তারা পুরাতন বিদেশি মদের বোতলে ভেজাল মদ ভরে তা বিদেশি মদ ও পানের উপযোগী মদ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে কথা হয় দেশের ৫ তারকা মানের হোটেল লা মেরিডিয়ানের পরিচালক (কমিউনিকেশন) জনাব মিল্লাতের সঙ্গে। তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, আমরা লিগ্যাল ওয়েতেই ওয়াইন আমদানি করছি। তবে করোনার প্রভাব তো একটু পড়েছেই। কেবল আমরা নই, ফাইভ স্টার মানের হোটেল সবগুলোর অবস্থা একই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উত্তর) মাঞ্জুরুল ইসলাম আরটিভি নিউজকে বলেন, লিগ্যালভাবে যারা মদ আমদানি করেন, তারা আমাদের কাছ থেকেই লাইসেন্স নিয়ে থাকেন। মহামারি করোনার কারণে এই সেক্টরেও একটা ধাক্কা লেগেছে। যে কারণে সম্প্রতি ভেজাল মদের ছড়াছড়ি খবর পাওয়া যাচ্ছে। যে কারণে মদ পানকারী মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।

ভেজাল মদ বিক্রি বৃদ্ধির নেপথ্যে চোরাই পথে প্রতিবন্ধকতা

সীমান্তে ও দেশের পোর্টগুলোতে মাদক প্রবেশ প্রতিরোধে দায়িত্বপালনকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনার আগে বিভিন্ন সময়ে চোরাইভাবে মদ প্রবেশ করতো। গোপন তথ্য বা তল্লাসি করে সেগুলো ধরা হতো। তবে, তার একটি বড় অংশ চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢুকে পড়তো দেশের বাজারে। যা অবৈধ মদ পানকারীদের কাছে বিক্রি হতো। কিন্তু করোনার কারণে দেশে কনটেইনারসহ বিভিন্নভাবে মদ প্রবেশ করতে না পারার কারণে সারা দেশেই ভেজাল মদ ছড়িয়ে পড়ে।

তরল মাদকের (অ্যালকোহল) প্রকারভেদ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, প্রাথমিকভাবে অ্যালকোহলকে ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হলো- ইথানল (যাকে ইথাইল অ্যালকোহলও বলা হয়), মিথানল (যাকে মিথাইল অ্যালকোহল, উড অ্যালকোহল, উড ন্যাপথা, উড স্পিরিটও বলা হয়) এবং রেকটিফাইড স্পিরিট (যাকে মেথিলেটেড স্পিরিটও বলা হয়)।

যে মাদক পানে ২ ঘণ্টায় মৃত্যু অনিবার্য

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উত্তর) মাঞ্জুরুল ইসলাম আরটিভি নিউজকে বলেন, তথ্য রয়েছে, সম্প্রতি মদের সঙ্কটের মধ্যে ভেজাল মদ ব্যবসায়ীরা অ্যালকোহল হিসাবে মিথানল ব্যবহার করছে। যা মানব দেহের জন্য শতভাগ ক্ষতিকর। যা পান করলে ২ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। মিথানল মূলত কাঠ বার্নিশে কিংবা বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যা কোনোভাবেই পানের উপযোগী নয়। ভেজাল মদ ব্যবসায়ীরা ইথানলের সঙ্গে মিথানল এবং চোলাই মদ ব্যবহার করে বিদেশি মদের বোতলে ভরে বিক্রি করছে। যা পান করে মৃত্যুর দিকে দাবিত হচ্ছে মদে আসক্তরা।

মাদকের সহনীয় মাত্রা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. হাফিজ সরদার আরটিভি নিউজকে বলেন, অ্যালকোহল বা মদ মানব দেহের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। বাংলাদেশে সাধারণত অ্যালকোহল নিষিদ্ধ। তবে বিদেশের মানুষজন মদ পানে পারমিটেট এবং তারা পিউর অ্যালকোহল পান করে। কিন্তু আমাদের দেশে হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া মদ পানে কারোই লাইসেন্স নেই। তাছাড়া আমাদের দেশে যে মদ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ভেজাল রয়েছে, যে কারণে মদে আসক্তরা মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে। ভেজালমুক্ত হলে একজন পুরুষ সপ্তাহে ৩ ইউনিট পান করতে পারবেন। অন্যদিকে নারীরা সপ্তাহে ২ ইউনিট পান করতে পারবেন। তবে যারা হার্টের রোগী, ডায়াবেটিকস রয়েছে, প্রেসারের সমস্যা, হাইপারটেনশন ও বয়স্ক যারা আছেন, তাদের জন্য অবশ্যই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আমি বলবো যারা মদ পান করেন না তারা যেনো ভবিষ্যতেও কখনোই পান না করেন। অন্যদিকে যারা পান করছেন তারা তা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কেননা বাংলাদেশে সাধারণত ভেজালমুক্ত মদ পাওয়া যায় না।

কেএফ/ এমকে

RTV Drama
RTVPLUS