logo
  • ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বন বিভাগের উদাসীনতা

দখল হচ্ছে বনাঞ্চল, বিলুপ্তির পথে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী

Sylhet ,
ছবি আরটিভি নিউজ।
প্রতি বছর পাহাড়-প্রকৃতি আর বিভিন্ন বনের সৌন্দর্য দেখতে হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটে সিলেটে। কিন্তু প্রতিনিয়ত বন বিভাগের উদাসীনতা আর স্থানীয়দের দখলে ধ্বংসের মুখে পাহাড়ি কন্যা হিসেবে পরিচিত সিলেটের বনাঞ্চল। শুধু পাহাড় আর প্রকৃতি ধ্বংস ছাড়াও বনাঞ্চলের ভূমি দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে ঘর বাড়িসহ নানা স্থাপনা।

চার জেলা সিলেট,সুনামগঞ্জ,হবিগঞ্জ আর মৌলভীবাজার নিয়ে গঠিত সিলেট বিভাগে কাগজে কলমে বনাঞ্চলের পরিমাণ  ১ লাখ ৬০ হাজার ৮ শত ১৯ একর, এর মধ্যে বিগত বছরগুলোতে দখল হয়েছে ৫৬ হাজার ৪ শত ৭৬.৩৪ একর। আর এখন পর্যন্ত বন বিভাগ অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে মাত্র ৯৯১ একর জমি।

আরটিভির অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার বনভূমির রয়েছে ২৩ হাজার ৩ শত ২১ একর, এর মধ্যে ৮ হাজার একর জমি দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং, তামাবিল এলাকার  বিভিন্ন স্থানে বন বিভাগের জায়গা দখল করে বসানো হয়েছে ক্রাশার মেশিন। তবে করোনার কারণে ক্রাশার মেশিনের কাজ বন্ধ থাকলেও পাথর ফেলে জায়গা দখল করে রেখেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সিলেট জেলাতে বনভূমির পরিমাণ ৪৯ হাজার ৪ শত ৭১ একর, এর মধ্যে দখল হয়ে গেছে ৩০ হাজার ৫১ একর জমি, সুনামগঞ্জের ১৮ হাজার ৩৪ একর এর মধ্যে দখল হয়েছে  ১৪ হাজার ৮ শত ৪৩ একর, হবিগঞ্জে ২৯ হাজার ৪ শত ৮৬ একরের মধ্যে দখল হয়েছে ১০৩ একর এবং মৌলভীবাজার ১৮ হাজার ৩৪ একরের মধ্য দখল হয়েছে ১১ হাজার ৪ শত ৭৭ একর জমি।

অন্যদিকে এখন পর্যন্ত বন বিভাগ সিলেটে ৮৬৬ একর  এবং সুনামগঞ্জের ১২৫ একর জমি উদ্ধার করলেও মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের কোনো জমি উদ্ধার করতে পারেনি ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলার ১৮ হাজার সরকারি বনভূমির মধ্যে এক তৃতীয়াংশ ভূমি রয়েছে ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায়। ছাতকে বনভূমি রয়েছে ৬ হাজার ১০০ একর ও দোয়ারাবাজারে রয়েছে ২ হাজার ৮০৯ একর। ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় প্রায় অধিকাংশ বনভূমি নানাভাবে দখল করে রেখেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

এছাড়াও ধর্মপাশা, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় সরকারি বনভূমি রয়েছে। তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীর তীরের বড়গোপ টিলা (বারিক টিলা) আশপাশের বনভূমি দখল করে বসতবাড়ি, গাছের বাগান, দোকানপাটও নির্মাণ করে বছরের পর পর বসবাস করছে স্থানীয়রা। সরকারি বনভূমির পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থায়ী বাসিন্দারা জানান, দেশ স্বাধীনের পর থেকে সরকারি বনভূমির জায়গা নিয়মিত দখল হয়েছে। কোনো সময়ই দখলদারদের উচ্ছেদ বা আইনি কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বনভূমির জমি দখল করে এসব জমি আবার অর্থের বিনিময়ে হাত বদলও হয়েছে বার বার।

বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণকালে বনবিভাগের স্থানীয় লোকজন প্রথমে বাধা প্রদান করলেও পরে রহস্যজনক কারণে পিছু হাঁটেন। এই বিষয়ে বন বিভাগে জানতে চাওয়া হলে ক্যামেরার সামনে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এস এম সাজ্জাদ হোসেন। তবে সিলেট বিভাগে বনের জায়গা দখল হয়েছে এমন সত্যতা স্বীকার করে ই-মেইলের মাধ্যমে একটি বার্তায় তিনি জানান, সমগ্র বন বিভাগের ৫৬ হাজার ৪ শত ৭৬.৩৪ একর জায়গা দখল হয়েছে ,ইতিমধ্যে আমরা কিছু জায়গা উদ্ধার করেছি। তবে বনভূমির ব্যবহারের জন্য সুনামগঞ্জে এসপিপিএম (ছাতক পাল্প এন্ড পেপার মিল) কে প্রদান হলে তাদের সময়কালে অধিকাংশ বনভূমি দখল হয়ে যায়। এসপিপিএম ১৯৯৬ সনে শুধুমাত্র কাগজপত্রের মাধ্যমে পুনরায় বন বিভাগকে ভূমি বুঝিয়ে দিলেও সরেজমিনে দখলই থেকে যায়।

এছাড়াও মৌলভীবাজার জেলার অধিকাংশ বন ভূমি খাসিয়াদের দখলে রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও অন্যান্য দপ্তরের সমন্বয়ে দখলকৃত বনভূমি পর্যায়ক্রমে উদ্ধার করে বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।

এই ব্যাপারে সিলেটের বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম আরটিভি জানান, সিলেট বন বিভাগ একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান। বনবিভাগের উদাসীনতার কারণে তাদের চোখের সামনেই সংরক্ষিত এলাকা ও মূল্যবান গাছপালা উজাড় হয়ে যাচ্ছে। সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিতে বনবিভাগের লোকজনের গোপন যোগসাজশ রয়েছে, এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। দ্রততার সহিত বনাঞ্চলের ভূমি উদ্ধারের ব্যবস্থা না নিলে পরিবেশের প্রচণ্ড ক্ষতি হবে।

এদিকে শাহজালাল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল আরটিভি নিউজকে জানান, সিলেটে সব চেয়ে বেশি বন বিভাগের জমি দখল হয়েছে গোয়াইনঘাটে পাথর কোয়ারির জন্য, কারণ এখানে সরকার নির্ধারণ করে দেননি কোন জমি পাথর কোয়ারির আর কোন জমি বনাঞ্চলের।

ড. জহিরুল হক শাকিল আরো বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি বন বিভাগ অফিসের নাজেহাল অবস্থা, এছাড়াও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে সুশাসনের অভাব। যার প্রমাণ, সিলেট বিভাগে স্বাধীনতার পর থেকে বন বিভাগের বনাঞ্চল উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৯ শত ৯১.৫৫ একর । এর মধ্য সিলেট জেলার প্রকৃতির রাজ্য গোয়াইনঘাটে  ২৩ হাজার ৩ শত ২১ একর ভূমির মধ্য বিগত দিনে দখল হয়েছে ৮ হাজার একর জায়গা তার মধ্য বন বিভাগ উদ্ধার করেছে মাত্র ১৩ শত ৫০ একর জায়গা । যদি এর বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ধ্বংস আর দখল হয়ে যাবে এই পাহাড়ি সৌন্দর্য। 

এম

RTVPLUS