smc
logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭

পাঁচ বছরে পুলিশ হেফাজতে মাসে গড়ে ৫ জনের মৃত্যু, আসকের রিপোর্ট  

  কাজী ফয়সাল

|  ১৮ অক্টোবর ২০২০, ২০:০২ | আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২০, ১০:৫৭
police, crossfire,
ছবি সংগ্রহীত
পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এমনটিই প্রত্যাশা সবার। তবে পুলিশে কিছু সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়। কতিপয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মুক্তিপন আদায়, অবৈধ অর্থ লেনদেন, মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততাসহ নানান অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে পাওয়া যায়। মানুষকে আটক করে মুক্তিপন আদায়ের ঘটনাও নেহাত কম নয়। অবৈধভাবে এই অর্থ আদায় করতে গিয়ে সিলেটে ‘ছিনতাইকারী’ ট্যাগ লাগিয়ে রায়হান আহমেদ (৩৪) হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে গোটা দেশেই। এটি এমনই একটি ঘটনা, যে ঘটনায় পুলিশ হেফাজতে আটককৃতের মৃত্যুতে এই প্রথম খোদ থানাতেই অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলো। এর আগে এমন ঘটনায় থানায় মামলা নিতে পুলিশের অনিহা ছিল, যে কারণে কেবল আদালতেই মামলা করার সুযোগ পেতো ভুক্তভোগী পরিবার।

পরিসংখ্যান বলছে, কেবলমাত্র পুলিশ হেফাজতে গত ৫ বছরের মৃত্যু হয়েছে ৩৩০ জনের। সে হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে ৫ জন বা তার বেশি সংখ্যক লোক মারা গেছে। যা বছর হিসেব করলে গড়ে ৬৬ জনে দাঁড়ায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তৈরি করা পরিসংখ্যান ঘেটেই এমন হিসেব পাওয়া যায়।

আসকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আজ (১৫ অক্টোবর) পর্যন্ত গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ৩২ জন, গ্রেপ্তারের পর শারিরীক নির্যাতনে মারা গেছেন ৯ জন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘আত্মহত্যায়’ ১ জন এবং গ্রেপ্তারের পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই বছর মোট মারা যান ৪৬ জন।

২০১৯ সালের পরিসংখ্যান বলছে, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ৬৯ জন, গ্রেপ্তারের পর শারিরীক নির্যাতনে মারা গেছেন ৬ জন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘আত্মহত্যায়’ ২ জন মারা গেছেন। ওই বছর মোট মারা যান ৭৭ জন।

২০১৮ সালের পরিসংখ্যান বলছে, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ৫৯ জন, গ্রেপ্তারের পর শারিরীক নির্যাতনে মারা গেছেন ৪ জন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘আত্মহত্যায়’ ৫ জন এবং গ্রেপ্তারের পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই বছর মোট মারা যান ৮৮ জন।

২০১৭ সালের পরিসংখ্যান বলছে, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ২৫ জন, গ্রেপ্তারের পর শারিরীক নির্যাতনে মারা গেছেন ৫ জন, গ্রেপ্তারের পর গুলি চালানোয় ২ জন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘আত্মহত্যায়’ ৩ জন এবং গ্রেপ্তারের পর ১ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ওই বছর মোট মারা যান ৩৬ জন।

২০১৬ সালের পরিসংখ্যান বলছে, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ২৯ জন, গ্রেপ্তারের পর শারিরীক নির্যাতনে মারা গেছেন ২ জন, গ্রেপ্তারের পর গুলি চালানোয় ৬ জন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘আত্মহত্যায়’ ২ জন এবং গ্রেপ্তারের পর ১ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ওই বছর মোট মারা যান ৪০ জন।

২০১৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে ক্রসফায়ারে মারা গেছেন ২৮ জন, গ্রেপ্তারের পর শারিরীক নির্যাতনে মারা গেছেন ৩ জন, হেফাজতে থাকা অবস্থায় ‘আত্মহত্যায়’ ৩ জন এবং হেফাজতে থাকা অবস্থায় গুলি করে ৯ জনকে মারা হয়েছে। ওই বছর মোট মারা যান ৪৩ জন।হেফাজতে ‘আত্মত্যায়’ মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশ ও মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারের মধ্যে বিতর্ক থাকায় রহস্যের দেয়াল টপকে মৃত্যুর প্রকৃত কারন হয়নি কোনটিরই।

এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন আরটিভি নিউজকে বলেন, কোনও অবস্থাতেই পুলিশ হেফাজতে মানুষের মৃত্যু হওয়া উচিৎ নয়। পুলিশ হেফাজতে মানুষ নিরাপদে থাকার কথা, কিন্তু যখন পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয় তখন বিষয়টি অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ কোনো ঘটনার তদন্তে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে নির্যাতন চালিয়ে থাকে। কোনো কোনো পুলিশ তার ক্ষমতাকে জাহির করার জন্য নির্যাতনকেই বেছে নেয়। ৩ টি কারনে পুলিশ নির্যাতন চালিয়ে থাকতে পারে, যেমন- প্রথমত ক্ষমতা জাহির করার জন্য, দ্বিতীয়ত নির্যাতনকে তথ্য বের করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, তৃতীয়ত অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের জন্য।

তিনি আরও বলেন, পুলিশকে যেনো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা না হয়। যতোদিন পুলিশ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হবে, ততোদিন তারা আইন বর্হিঃভূতভাবে বল প্রয়োগ করে নির্যাতন চালিয়ে যাবে। ২০১৩ সালে পাস হওয়া নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। এই আইন পাসের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৬/১৭ টি মামলা দায়ের হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে করা মামলা পুলিশ তদন্ত করেছে বলে প্রায় সব মামলাতেই নির্দোষ উল্লেখ করে ফাইনাল রিপোর্ট জমা হয়। তবে রাজধানীর পল্লবীতে জনি হত্যার মামাটিতে সম্প্রতি আসামি হিসেবে পুলিশ সদস্যদের নিন্ম আদালতে সাজা হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। সবশেষে আমরা চাই পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাটি যেনো ‘শূণ্যের’ কোঠায় চলে আসে। আর তথ্য বের করার জন্য নির্যাতন নয়, চাই অধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার।

পুলিশ হেফাজতে নিয়ে চাঁদা আদায় করা এবং তারপর হেফাজতেই মৃত্যু নিয়ে সাবেক আইজিপি নুরুল আনোয়ার আরটিভি নিউজকে বলেন, ২০০২ সালের আগে এটি (হেফাজতে মৃত্যু) হাতে গোনা দু’একটি ছাড়া খুব একটা ছিলো না। যেহেতু আমি পুলিশে ৩৪ বছর কর্মরত ছিলাম। এখন আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করছি যে, একজন আসামির কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য পুলিশ বল প্রয়োগ করছে। এছাড়াও অর্থ আদায়ের জন্য পুলিশ নির্যাতন চালিয়ে থাকে।

কি কারণে হেফাজতে নিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা পুলিশের প্রয়োজন হয়ে পড়লো, এই প্রসঙ্গে সাবেক এই আইজিপি আরও বলেন, আগের পুলিশ এমনভাবে অর্থ আদায় করতো না। এখন অর্থ আদায়ের মূল কারন হলো, যখন কেউ পুলিশে ঢুকতে হয়, তখন তাকে বিপুল পরিমান টাকা লগ্নি করেই ঢুকতে হয়। কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব ইন্সপেক্টর এবং সার্জেন্ট এই লেভেলের বিভিন্ন ধাপের চাকরির জন্য অধিকাংশকে নগদ টাকা দিয়ে চাকরিতে আসতে হয়। এই টাকা যারা নেয় তাদের মধ্যে রয়েছে কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং পুলিশের কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্থ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। এই অবৈধ লেনদেন  সিন্ডিকেট করেই করা হয়। এই সিন্ডিকেট বিপুল অর্থের বিনিময়ে বদলি বাণিজ্যও করে থাকে। একটি কনস্টেবল যদি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা, সাব ইন্সপেক্টর যদি ২৫ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি নিতে হয় সেই টাকা ফিলআপ করবে কিভাবে? সেজন্যই টাকা দিয়ে চাকরি নেওয়া পুলিশ সদস্যরা বল প্রয়োগ করে নির্যাতন চালিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করে থাকে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘হেফাজতে মৃত্যু বিভিন্ন কারণে হতে পারে। নির্যাতনের অভিযোগ যেমন উঠে আসে, তেমনি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে। হেফাজতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে কখনও কখনও। পুলিশি হেফাজতে যে কারণেই মৃত্যু ঘটুক না কেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্যদের কোনও গাফিলতি, বিচ্যুতি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

কেএফ/ এমকে

RTVPLUS
bangal
corona
দেশ আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৩৯০২০৬ ৩০৫৫৯৯ ৫৬৮১
বিশ্ব ৪,০৩,৮২,৮৬২ ৩,০১,৬৯,০৫২ ১১,১৯,৭৪৮
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • বিশেষ প্রতিবেদন এর সর্বশেষ
  • বিশেষ প্রতিবেদন এর পাঠক প্রিয়