logo
  • ঢাকা শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ৯ মাঘ ১৪২৭

দিনেদুপুরে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি: চোর পালানোয় বুদ্ধি বেড়েছে তাদের!

দিনেদুপুরে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি: চোর পালানোয় বুদ্ধি বেড়েছে তাদের!
ফাইল ছবি
ব্যাংকে লেনদেন হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। আছে নিরস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী। তবে কোনও ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ব্যবস্থা ছিল না। আর এই সুযোগটিই নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। দিন দুপুরে ফিল্মি কায়দায় ব্যাংকে ঢুকে জিম্মি করেছে গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। বলা হচ্ছিল চুয়াডাঙ্গার সোনালী ব্যাংক উথলী শাখার কথা। গেল ১৫ নভেম্বর বেলা ১টায় এই ব্যাংকে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ঘটনার রাতে বাদী হয়ে অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে জীবননগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিকী। মামলার পর ব্যাংকের গ্রাহকসহ বেশ কয়েকজনকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তবে তেমন কোনও তথ্য না পাওয়ায় তাদের মুক্তি দেয় পুলিশ। ঘটনার ১২ দিন পার হয়ে গেলেও এখনও কোনও কুল কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। অবশ্য তারা বসেও নেই। পুলিশ সুপার বলছেন, ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে দিন রাত কাজ চলছে। আর নিরাপত্তার স্বার্থে ইতোমধ্যে জেলার পাঁচটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যাংক ও অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ওই দিন যা ঘটেছিল উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায় 

দুপুর ১টা। স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছিল চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের উথলী সোনালী ব্যাংক শাখায়। ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিরাপত্তাকর্মী ও গ্রাহকসহ ১০ জন ছিলেন ব্যাংকের ভেতর। ঠিক ৫ মিনিট পর গ্রাহক পরিচয়ে হেলমেট ও পিপিই পরিহিত তিন ব্যক্তি প্রবেশ করে ব্যাংকে। হঠাৎ আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র বের করে সকলকে জিম্মি করেন তারা। এসময় সবার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া হয়। পরে ক্যাশ কাউন্টারে থাকা ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ টাকা লুট করে পালিয়ে যান দুর্বৃত্তরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জীবননগর উপজেলায় ৮টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখাসহ ১২টি ব্যাংকের শাখা, ১৩টি এজেন্ট ব্যাংক ও দুই শতাধিক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রয়েছে। এরমধ্যে আন্দুলবাড়িয়া বাজারে ১টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখাসহ ৪টি এজেন্ট ব্যাংক, উথলী গ্রামে দুটি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখাসহ তিনটি এজেন্ট ব্যাংক, রায়পুর বাজারে ১টি এজেন্ট ব্যাংক, হাসাদাহ বাজারে ১টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখাসহ দুটি এজেন্ট ব্যাংক ও জীবননগর পৌর শহরে ৪টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখাসহ ৩টি এজেন্ট ব্যাংক রয়েছে। এছাড়া উপজেলার গ্রামগুলোতে চালু রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা লেনদেন হলেও কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। 

উপজেলার ৮টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখাসহ মোট ১২টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র দুইটি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখায় এবং ৪টি বেসরকারি ব্যাংক শাখায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বাকী ৬টি রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের শাখায় কোনও ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা নেই। এসব ব্যাংকের শাখাগুলোতে নিরাপত্তা প্রহরী থাকলেও অধিকাংশ নিরাপত্তা প্রহরীর হাতে কোনও আগ্নেয়াস্ত্র নেই। উথলী সোনালী ব্যাংক শাখাটি নিরিবিলি এলাকায় অবস্থিত ও নিরাপত্তাকর্মীরা নিরস্ত্র হওয়ায় সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে দুর্বৃত্তরা। 

ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, দুর্বৃত্তরা অস্ত্রের মুখে ব্যাংকের ভল্ট খুলে দিতে বাধ্য করে। ওই সময় টাকা তুলতে ব্যাংকে এসে ডাকাতদের দেখে ব্যাংক থেকে দ্রুত বের হয়ে যান একজন গ্রাহক। পরে বাইরে তার চিৎকারে ছুটে আসেন স্থানীয়রা। বন্দুক উঁচিয়ে খুনের হুমকি দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় ডাকাতরা। 

তিনি আরও জানান, ভল্টের কোনও টাকা লুট হয়নি। শুধু ক্যাশ কাউন্টারে থাকা ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯০০ টাকা নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। 

রাষ্ট্রয়াত্ত সোনালী ব্যাংকের শাখাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে কেন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি? এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) খন্দকার আবদুস সালাম জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের নিরাপত্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিৎ। আর সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে বলেও জানান তিনি। 

ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার, পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন ও ক্রাইম) এ কে এম নাহিদুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামসহ গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা। পরে ঘটনাস্থলে আসনে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন। 
ব্যাংকে ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ডিআইজি বলেন, ব্যাংকে যে আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তাদের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতের সূত্র ধরে অনেক দূর এগিয়েছে পুলিশ। খুব শীঘ্রই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে সামনে নিয়ে আসা হবে। 

চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুষ্কৃতিকারীদের ফেলে যাওয়া পিস্তলের অংশ বিশেষ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় পর থেকে দিনরাত কাজ করেছে পুলিশের বেশ কয়েকটি দল। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পুলিশের হাতে এসেছে। দুই একদিনের মধ্যেই এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও জানান, ব্যাংকটিতে সিসিটিভি ছিল না। নিরাপত্তার স্বার্থে ইতোমধ্যে জেলার পাঁচটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার ব্যাংক ও অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট দোকানগুলোতেও ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো আছে। কিন্তু যেসব অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয় সেখানে কোনও ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো হয়নি? বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আর সোনালী ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকে নিরাপত্তায় নিয়োজিতরা নিরস্ত্র বিষয়টি হাস্যকর। 
এখন সেই হেলমেট ও পিপিই পরিহিত ডাকাতদের গ্রেপ্তারের অপেক্ষায় জেলাবাসী।

এসএস

RTV Drama
RTVPLUS