logo
  • ঢাকা রোববার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭

কেমন ছিল নির্বাচনের সময়ে মাশরাফীর দিনগুলো

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ২০২০, মাঝে কেটে গেছে দুই বছর। এই দুই বছর আগে এই দিনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় নির্বাচন। যেখানে অংশ নিয়েছিলেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সফলতম অধিনায়কের জাতীয় নির্বাচনে আসাটা অনেকে মেনে নিতে পারেননি আবার অনেকে বাহবা দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন উৎসাহ দেয়ার।

অনেকের চাওয়া ছিল, তার মতো একজন তরুণের রাজনীতিতে আসাটা দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে তৃনমূল, সবখানেই ছিল পক্ষে বিপক্ষে মতামত।

সব ছাপিয়ে মাশরাফী অংশ নেন নির্বাচনে এবং সফলতার সঙ্গে বিজয়ী হন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে পৌঁছে যান নড়াইলে। এই সময় থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত ছিলাম মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সঙ্গে। আমার কাছে ক্রিকেটের মাশরাফী নতুন কেউ না হলেও রাজনীতির মাশরাফী ছিল একদমই নতুন। নড়াইল যাবার আগে একদিন বলছিলেন, আমি নড়াইলে আওয়ামীলীগের অফিসেও যাইনি কখনও। কীভাবে পারব সামলে নিতে!

রাজনীতির মাঠে একেবারেই নতুন মাশরাফী কী ভাবে সামলেছিলেন সেসব? যতটা দেখেছি সামনে থেকে সেসবই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

অচেনা পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয় সেটার দৃষ্টান্ত উদাহরণ হতে পারেন মাশরাফী বিন মুর্তজা। ক্রিকেটের কল্যাণে বহু দেশ ঘুরেছেন, বহু দেশের ভৌগলিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে খেলতে হয়েছে দেশের জন্য।

এবারের পরিবেশটা একেবারেই ভিন্ন! ক্রিকেটের বাইশ গজ এখনও ছাড়েননি তিনি কিন্তু, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাকে নেমেছেন রাজনীতির মাঠে। এই মাঠের পরিবেশটা তো একেবারেই নতুন তার জন্য।

খেলার মাঠ আর রাজনীতির মাঠ, দুটোর সঙ্গেই মাঠ জুড়ে দেয়া হলেও মাশরাফির কাছে রাজনীতির মাঠ তো একদমই অচেনা! এই মাঠের উইকেটে কখন বাউন্স দিতে হবে কিংবা স্লোয়ার বল ছাড়তে হবে এ নিয়ে তো কখনোই অনুশীলন করেননি মাশরাফী।

তবুও দিব্যি মানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে প্রতিটা মুহূর্তে। কি আশ্চর্য! এ যেন যুগ যুগ ধরে অনুশীলন করে তবেই নেমেছেন রাজনীতিতে।

সকাল ১০ টায় বের হচ্ছেন বাসা থেকে, ফিরছেন রাত ১টায়। এরপর বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মিটিং তো আছেই। তা শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাতের ঘুম শেষ।

নড়াইল-২ আসনের বিভিন্ন ইউনিয়নের পথে পথে করছেন পথ-সভা, তাতে দুপুরের খাবারটাও খেতে পারছেন না ঠিকঠাক।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শেষ করে নিজের নির্বাচনী এলাকায় আসতে একটু দেরিই হয়ে গেছে। দেরি হবার কারণটা ইনজুরি। সিরিজ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচেই পড়েছিলেন হ্যামষ্ট্রিং ইনজুরিতে। যার জন্য দৌড়াতে হয়েছে ডাক্তারের কাছে।

২২ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে রওয়ানা করেন নড়াইলের উদ্দেশে। আসার পথে মাওয়া ফেরী ঘাট থেকেই শুরু হয় নির্বাচনী কার্যক্রম। এরপর কালনা ঘাট থেকে শুরু হয় পথ-সভা।

কালনা থেকে নড়াইল সদর। রাস্তার দু’পাশে উৎসুক জনতার ভিড়। প্রিয় নেতাকে একবার দেখার অপেক্ষা। মাশরাফীর গাড়ির বহরে সব মিলে গাড়ি ছিল সাতটা। কোন গাড়িতে আছেন মাশরাফী?

রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ প্রতিটা গাড়িতেই উঁকি দিয়ে দেখছেন মাশরাফী কোন গাড়িতে আছেন?

এদিন পাঁচটা পথ-সভা শেষে জনতার ঢল ঠেলে উঠলেন মামার বাড়িতে। এখানেও নিস্তার মিলল না। এসেই বের হতে হলো পরের দিনের কর্মসূচী ঠিক করার কাজে।

চার দিনের কর্মসূচীতে মোট ৯২টি পথ-সভা। গোটা ৬০টি মোটর সাইকেল নিয়ে মাশরাফী বের হলেন অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে।

গত ১৭ বছর ধরে যিনি সামলেছেন বাইশ গজ আর ক্রিকেটের প্রেস-কনফারেন্স, তাকে আজ থেকে কথা বলতে হবে হাজারো জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে!

শুরুটা নিজের জন্মস্থান মাইজপাড়া ইউনিয়ন দিয়ে। দুপুরের নিজের চাচার বাসায় খেলেন, খেয়েই মাইজপাড়া স্কুল মাঠে চলে গেলেন জনসভায়।

মাঠে অপেক্ষায় থাকা হাজারো জনতার সামনে এদিনও নিজেকে উপস্থাপন করলেন ‘ক্রিকেটার মাশরাফী’ পরিচয়ে।

‘আমি আপনাদেরই সন্তান, আপনাদেরই ভাই। এই মাঠে আমি কত খেলতে এসেছি। জাতীয় দলে খেলার জন্য অনেকদিন এখানে আর আসা হয়নি কিন্তু সেসব স্মৃতি আমি কখনোই ভুলিনি। এবার আমি আপনাদের কাছে এসেছি আপনাদের একজন হয়ে সমৃদ্ধ নড়াইল গড়তে যদি আপনারা চান। প্রধানমন্ত্রী আমাকে আপনাদের সেবা করার জন্য সুযোগ দিয়েছেন, যার জন্য নৌকা প্রতীক দিয়ে পাঠিয়েছেন আপনাদের কাছে। আপনার সবাই আমাকে ভোট দিয়ে সেই সুযোগটা করে দিবেন। জয় বাংলা’

মিষ্টি না খাইয়ে ছাড়ছেন না

মাশরাফীর নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিন থেকে শেষ দিন মিলে মোট চারদিন তার মোটর সাইকেলের বহরে থাকার সুযোগ হয়েছে। তাতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, মাশরাফি কাউকে স্বপ্ন দেখাননি। বলেছেন, আমাকে যদি আপনারা সুযোগ করে দেন তাহলে আমি আমার জান দিয়ে হলেও চেষ্টা করবো আপনাদের জন্য কিছু করার।

নড়াইলের মানুষ যেন চাঁদ হাতে পেয়েছে। পথ-সভা যেন প্রাণের সভা। রাস্তার দু’পাশে মানুষের অপেক্ষা যেন তারই প্রতিফলন। কেউ ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয় মানুষটিকে পরিয়ে দিতে। কেউবা কাগজ-কলম হাতে দাঁড়িয়ে থামিয়ে দিয়েছেন মোটর-সাইকেলের বহর অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য।

সে কি উন্মাদনা পথে-পথে। টিভির পর্দায় দেখা মাশরাফীকে একবার দেখার, ছুঁয়ে দেখার প্রত্যাশায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকেও হতাশ করেননি মাশরাফী।

এমনও দেখা গেছে, মাশরাফীকে জড়িয়ে ধরে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধাও কেঁদে ফেলেছেন। কেউ ছুটে এসেছেন পিঠা নিয়ে। মাশরাফীও সেটি না খেয়ে থাকেননি।

জনতার কাছে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ছুটে গেছেন সাধারণ একজন হয়ে। পাঞ্জাবী, ট্রাউজার, স্যান্ডেল আর একটা পাতলা চাদর তার নিত্য পোশাক।

জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি নির্ভার। মন খুলে কথা বলছেন মাইক হাতে তবে রাজনীতির কথা নয়। শুনছেন অবহেলিত নড়াইলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথাগুলো। ঘুরে দেখেছেন নদী ভাঙনে খতিগ্রস্ত এলাকা।

এতকিছুর ভিড়েও মাশরাফী ভুলে যাননি প্রতিপক্ষের কথা। নিজের সঙ্গে থাকা সবাইকে সাবধান করে দেন, আমার প্রতিপক্ষ দল যেন কোনও কারণে হেয় না হয়। প্রতিটা ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যেও একই কথা, তারাও কারো ভাই-বন্ধু। তাদের দিকে খেয়াল রাখবেন যেন, তাদের কোনও ক্ষতি না হয়।

এমআর/

RTV Drama
RTVPLUS