• ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
logo

পরিবহন শ্রমিক : আমাদের ক্ষোভ বনাম বাস্তবতা

ইয়াসির সিলমী

  ১০ এপ্রিল ২০২৪, ২৩:১২
ইয়াসির সিলমী

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। এই উৎসবের আমেজ এখন সর্বজনীন। ঈদের এই আনন্দের শুরুটা হয় প্রিয়জনদের সাথে ঈদ উদযাপনে বাড়ির পথে যাত্রা করার সময় থেকে। আমাদের এই ঈদযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ গণপরিবহনের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপাররা। আর তাদের রক্তে রঞ্জিত হল কিনা আমাদেরই হাত! গণমাধ্যমে খবর, বাড়তি ভাড়া চাওয়াকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটির জেরে যাত্রীদের বেধড়ক পিটুনিতে ইতিহাস পরিবহনের বাসচালক ও সুপারভাইজর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে আশুলিয়ার ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ (ডিইপিজেড) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। যাত্রীরা এমন বর্বর হতে পারে, ভাবা যায়?

এ ঘটনায় যথারীতি দুটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: ১. পরিবহন খাত কতটা নিয়ন্ত্রণহীন হলে যাত্রী-শ্রমিকের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটতে পারে? এভাবে ভাবতে গেলে অবশ্য যাত্রী কর্তৃক পরিবহন শ্রমিক হত্যার বিষয়টি হালকা হয়ে যায়। ২. বেশি ভাড়া চাইলেই মেরে ফেলতে হবে? হামলা করতে হবে? উত্তর অবশ্যই না। এসব প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতে এবার কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। পরিবহন শ্রমিকরা বাড়তি ভাড়া চাওয়াটা আইনত বৈধ না হলেও কোন যুক্তিতে আসলে তারা এটা দাবি করছে? এটার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? সহজ করে যদি ভাবি, তাতে কিছু ব্যাপার উঠে আসে। আপনার আমার যেমন ঈদ আনন্দ আছে, তাদেরও তা আছে। আর প্রিয়জনের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য এই সময়ে আমাদের যে বাড়তি খরচ রয়েছে, পরিবহন শ্রমিকরা নিশ্চয়ই এর বাইরে নয়। এখন আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী হন, তবে এই মাসে বাড়তি বিক্রি কিংবা মুনাফা থেকে রমজান-ঈদের বাড়তি খরচ মেটাতে পারবেন। সবথেকে বড় কথা আপনি ব্যবসায়ী হিসেবে খুব সহজে এসব খরচের যোগান দিতে পারেন। আর চাকরিজীবীদের জন্য বেতনের সাথে বোনাস তো আছেই। দেশে বর্তমানে অর্ধ কোটিরও বেশি গণপরিবহন শ্রমিক রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে যাদের বাড়তি কোনো আয়ের নিয়মতান্ত্রিক কোনো সুযোগ নেই। দৈনিক যে মজুরি, সেটাও চলার জন্য যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, দেশে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত মোটরযান ৫৮ লাখ ৯৭ হাজার ২৪১টি। এ সংখ্যা থেকে ব্যক্তিগত শ্রেণির ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৪টি গাড়ি বাদ দিলে আর থাকে ৫৪ লাখ ৩০৭টি। এর মধ্যে বাস ৫৪ হাজার ১৫৮টি, কাভার্ডভ্যান ৪৭ হাজার ৬৪টি, মাইক্রোবাস ১ লাখ ২০ হাজার ৯৩টি, মিনিবাস ২৮ হাজার ৩০৯টি, হিউম্যান হলার ১৭ হাজার ৩৮৭ এবং মোটরসাইকেল আছে ৪২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৩০টি। ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশ, ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী নিয়োগপত্র, বেতন, মজুরি, বোনাস, ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ থাকলেও বেশিরভাগ বেসরকারি পরিবহন মালিক অতি মুনাফার লোভে চালক-শ্রমিকদের এসব বিষয় নিশ্চিত করেন না। অর্থাৎ আইন থাকলেও রাষ্ট্রীয় তদারকি অভাবে তার বাস্তবায়ন নাই। অন্যদিকে কল্যাণ তহবিলের নামে শ্রমিকদের কাছ থেকে শ্রমিক সংগঠন নিয়মিত যে চাঁদা নেয় তা থেকেও দুর্দিনে তেমন কোনো সাহায্য পান না তারা। তাই কোনো দিন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের কাটাতে হয় মানবেতর জীবনযাপন। অনেকটা দিনে এনে দিনে খাওয়ার মত সাদামাটা জীবন। মোদ্দাকথা মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সরকার সব পক্ষেরই উদাসীনতার বলি দেশের অন্যতম বৃহৎ এ খাতের শ্রমিকেরা।

সাপ্তাহিক কিংবা সরকারি ছুটির দিন, আমাদের জীবনে সব থাকলেও এ খাতের মানুষগুলো কখনো সেসব ছুটির স্বাদ নিতে পারেন না। আমাদের গতিময় জীবনকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য বছরের প্রতিটা দিন নিরাপদ কোনো ভবিষ্যৎ না থাকা সত্ত্বেও তারা শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। বিরামহীন ঘাম ঝরিয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোরও ইচ্ছে হয়, এই ঈদে প্রিয়মুখে হাসি ফোঁটাতে, প্রিয়জনদের সাথে ঈদ কাটাতে। আমাদের মত ঘরে থেকে পরিবার, স্বজন কিংবা বন্ধুদের সাথে ঈদ উদযাপনের সুযোগ যদিও তাদের নেই। এতে যে আমাদের ঈদযাত্রা, ছুটিতে ঘুরাঘুরি বন্ধ হয়ে যাবে! নিজেদের ঈদ আনন্দ বিসর্জন দেওয়ার বিনিময়ে এই মানুষগুলো শুধু চেয়েছে বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানদের চেহারায় ঈদ আনন্দ দেখতে। যৎসামান্য ঈদ উপহার পরিবারের সদস্যদের দিতে। আর এটা নিশ্চিত করতে বাড়তি যে অর্থের প্রয়োজন সেটার যোগান আসলে কোথায়? না পাচ্ছে বিধিসম্মত কোন বেতন-বোনাস, না আমরা দিচ্ছি কোন বকশিস? তাই হয়তো কিছু টাকা বাড়তি নেয় ভাড়া হিসেবে। তাতে যদি ঈদ আনন্দটা পাওয়া যায়। সেটা অবশ্য বছরের পর বছর ধরে আমরা দিয়ে আসছি। যদিও তাদের চাওয়ার ধরন খুব একটা সুন্দর না। এটাকে আবদারের চেয়ে অধিকার হিসেবে দেখিয়ে ফেলে। এটাও তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। প্রয়োজন আছে বলেই যে যাত্রীদের কাছ থেকে গলাকাটা ভাড়া আদায় করবে সেটা কখনো কাম্য নয়। ঠিক এ জায়গায় আমরা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠি, অপরাধ জেনেও তাদের গায়ে হাত তুলছি।

আচ্ছা, আমরা কি কখনো ভেবেছি, পরিবহন শ্রমিকদের ত্যাগ, বঞ্চনার কথা। অনেক না পাওয়ার জীবনে ঈদ উপলক্ষে বাড়তি টাকা আদায়ের পেছনের কথা। হয়তো ভাবি না। আমরা শুধু খিটখিটে মেজাজের পরিবহন শ্রমিকদের রূঢ় আচরণটাই দেখি। আমাদের চোখে এরা আজন্ম লোভী, শিষ্টতাহীন, অশিক্ষিত এক শ্রেণি, তাইতো? লোভ, শিষ্টাচারের আর শিক্ষার কথাই যেহেতু এসেছে তাহলে বলুন, দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী বড় পদের বড়কর্তারা কি লোভহীন? তবে হাজার কোটি টাকা যায় কোথায়? যখন সেবা প্রত্যাশী হিসেবে তাদের কাছে যান তখন কতটাই বা শিষ্টাচার উনারা প্রদর্শন করেন? এখানেই আমরা চুপ, নীরবে মেনে নিই সব। যত প্রতিবাদ আর ক্ষোভ এসব দুর্বল, কম শিক্ষিত মানুষগুলোর উপর। তাদের কাছ থেকে সুন্দর আচরণ প্রত্যাশার আগে কখনো ভেবে দেখি না যে, হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষগুলোর বিদ্যার দৌড়ই বা কতটুকু? যেখানে শিক্ষিত বড় কর্তাদের উচ্চতর ডিগ্রি, বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ থাকার পরও সদয় আচরণ অনিশ্চিত, সেখানে লেখাপড়া না জানা, ন্যূনতম প্রশিক্ষণ না পাওয়া এই পরিবহন শ্রমিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার আশা করা কতটা সমীচীন? আর আমরা নিজেরাই বা তাদের প্রতি কতটা সম্মান দেখাই? সর্বশেষ কবে তাদেরকে ‘আপনি’ সম্বোধন করেছি তা মনে আছে? কখনো তাদের জিজ্ঞেস করেছি, ‘শুভ সকাল! কেমন আছেন?’ এসব আমরা ভাবতেও পারি না। সবমিলিয়ে আস্থা আর সম্মানের জায়গায় বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে সহজে অনুমেয়, উভয় পক্ষের মনে এ ক্ষোভের জন্ম একদিনে হয়নি।

দিনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর রাতের বেলা বাসের করিডোর কিংবা ছাদে মশার কামড়ে ঘুমানো। ভাসমান এ জীবন যাদের তাদের জন্য এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্রকে। পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধুমাত্র দুর্ঘটনা রোধে আইন করে চালক-সহকারীর শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না। সেইসাথে প্রয়োজন তাদের জীবনমান উন্নয়নে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যার অংশ হিসেবে শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি, বোনাস, চিকিৎসাভাতা, ইনসুরেন্সের, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদি নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরদারি ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে মালিকপক্ষ ও সরকার উভয় পক্ষের ভূমিকা থাকবে। অর্থের যোগান মালিকপক্ষ দিবে, আর পৃষ্ঠপোষকতা থাকবে সরকারের। এর পাশাপাশি যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে পরিবহন পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং যাত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। এই ব্যাপারে যাত্রীদেরও সচেতন করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া যেতে পারে। সবমিলিয়ে বলা যায়, রাষ্ট্রপক্ষ সরব হলে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোও তাদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে। তাতে যাত্রী-শ্রমিক অসন্তুষ্টি দূর হয়ে পরিবহন খাতে সত্যিকারের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। সৃষ্টি হবে ন্যায্য ভাড়া আদান-প্রদানের পরিবেশ।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ

বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

daraz
  • অন্যান্য এর পাঠক প্রিয়
X
Fresh