logo
  • ঢাকা সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

কারাবন্দীকে নারীসঙ্গ দিতে কে কতো টাকা পেলেন

Women's association in jail: 1 lakh to the district magistrate, 25 thousand to the deputy district magistrate
কারাগারে নারীর সঙ্গে হলমার্কের জিএম তুষার।। ছবি: ভিডিও ফুটেজ থেকে নেয়া

সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দী হলমার্ক গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমদের সঙ্গে বেগুনী রঙের পোষাক পড়া এক নারীর একান্তে সময় কাটানোর বিষয়টি। যার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ গণমাধ্যমে প্রকাশ হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। এরপরেই একের পর এক বের হয়ে আসতে থাকে কারাগারে ঘটে যাওয়া বহু অপকর্মের ঘটনা। যেখানে হয়ে থাকে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য। যদিও শোনা যাচ্ছে ওই নারী তুষারের দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে সেটিও তদন্ত করে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিধি অনুযায়ী, বন্দীর সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিতদের এমন পদ্ধতিতে দেখা করে সময় কাটানোর সুযোগ নেই।

কাশিমপুর কারাগার সূত্রে জানা যায়, তুষার আহমদ তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, কারাগারে তার সঙ্গে দেখা করা নারী সম্পর্কে তার দ্বিতীয় স্ত্রী।

জানা যায়, ওই নারীর নাম আসমা শেখ ওরফে সুইটি। তার সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেতে কাশিমপুর কারাগার-১-এর ২ জন কর্মকর্তা ও কয়েকজন কর্মচারীকে ঘুষ দিয়েছিলেন আলোচিত হলমার্কের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমদ। তিনি কারাগারের জেলারকে ১ লাখ, ডেপুটি জেলারকে ২৫ হাজার এবং সার্জেন্ট ইনস্ট্রাক্টর, গেট সহকারী প্রধান কারারক্ষীকে ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ দিয়েছিলেন। গত ১৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) কারা মহাপরিদর্শকের কাছে দেওয়া সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায়ের প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঘটনার দিনের ভিডিও ফুটেজে রত্না রায়ের সম্পৃক্ততা দেখা গেলেও প্রতিবেদনে এই কর্মকর্তা নিজের কোনো দায় বা অবহেলার কথা উল্লেখ করেননি।

প্রতিবেদনে রত্না রায় ওই দিনের ঘটনার জন্য জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধাকে প্রধানত দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধার অনুমতি নিয়ে পুরো ঘটনার সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. সাকলায়েন ছিলেন। তিনি বলেন, ওই দিন দায়িত্ব পালনরত ডেপুটি জেলার ও কারারক্ষীদের জবানবন্দি নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। তবে জেলারের জবানবন্দি নেননি। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে রত্না রায় বলেন, যেহেতু পুরো ঘটনা জেলারের তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়েছে, তাই জেলারকে না জানিয়ে ওই দিন যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে রত্না রায়ের মুঠোফোনে ও কারাগারের টেলিফোনে একাধিকবার কল করেও যোগাযোগ করা যায়নি। তবে জেল সুপার রত্না প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে তার অগোচরে ও গোপনে হয়েছে। কারাগারের গেটে জেলারই তাদের কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেন এবং ডেপুটি জেলার তাদের রিসিভ করেন, যা সিসিটিভি ফুটেজে রয়েছে। সামগ্রিক বিষয়টি ওয়াকিটকির মাধ্যমে না বলে গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে মুঠোফোনের মাধ্যমে হওয়ায় কেউ জানতে পারেনি। তার দাবি, তাকে না জানাতেই এসব করা হয়েছে।

অবশ্য জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধা তার বিষয়ে জেল সুপারের অভিযোগ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেছেন, তিনি মাত্র ৪ মাস আগে এ কারাগারের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জেল সুপারের নির্দেশেই তাদের দেখা করার অনুমতি দিয়েছেন। তাদের কারাগারে ঢোকার সময় জেল সুপার কারাগারের অফিসেই ছিলেন। তিনি ২০ মিনিট পর বের হয়ে যান। ওই প্রতিষ্ঠানের পরিবারের সবার সঙ্গেই জেল সুপারের সখ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ৬ জানুয়ারি তুষার আহমদ কারাগারে এক নারীর সঙ্গে সময় কাটান। ওই দিনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে দুই যুবকের সঙ্গে ওই নারী কারাগারের কর্মকর্তাদের কক্ষের দিকে যান। সেখানে ওই নারীকে ডেপুটি জেলার সাকলায়েন স্বাগত জানান।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, ওই নারী কক্ষে ঢোকার পর সাকলায়েন বেরিয়ে যান। এরপর জেল সুপার রত্নার কক্ষের দিকে যান তুষার। পরে তুষার ও ওই নারী সাকলায়েনের কক্ষে ফেরেন। সেখানে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ছিলেন তারা।

রত্না রায় প্রতিবেদনে বলেন, হাজতি বন্দী তুষার একজন সাধারণ বন্দী শ্রেণিপ্রাপ্ত নন। ডেপুটি জেলার গোলাম সাকলায়েন ও গেট ওয়ার্ডের সহকারী প্রধান কারারক্ষী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, তারা জেলারকে জানিয়ে তুষারকে কারাগারের কার্যালয়ে নিয়েছিলেন। রত্না প্রতিবেদনে জানান, জেলারের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া একজন বিচারাধীন আসামির সঙ্গে কারও সাক্ষাতের জন্য কারাগারের অফিসে আসা সম্ভব নয়। জেলারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপারকে অবহিত করার কথা। কিন্তু জেলার তা করেননি।

এদিকে এ ঘটনায় সিনিয়র জেলা সুপার রত্না ও জেলার নূর মোহাম্মদ মৃধাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এনিয়ে এই ঘটনায় মোট ৫ জনকে প্রত্যাহার করা হলো। আজ রোববার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এ তথ্য জানান আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোমিনুর রহমান মামুন।

এর আগে গতকাল শনিবার দুপুরে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলের ভেতর নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাটি জঘন্য অপরাধমূলক কাজ। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সোমবার এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। তবে এতটুকু বলতে পারি যে, এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে যারা জড়িত তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কারাগারে হলমার্কের জিএম’র নারীর সঙ্গে সাক্ষাতের এ ঘটনায় ইতোমধ্যে অতিরিক্ত আইজি প্রিজনস আবরার হোসেনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সঙ্গে একজন ডেপুটি জেলারসহ ৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাদের রোববার রাতেই প্রত্যাহার করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে।

ওই ৩ জন হলেন- ডেপুটি জেল সুপার মোহাম্মদ সাকলাইন, সার্জেন্ট আব্দুল বারী ও সহকারী প্রধান কারারক্ষী খলিলুর রহমান।

প্রকাশ হওয়া কারাগারের সিসি ফুটেজে দেখা গেছে, গত ৬ জানুয়ারি কালো রঙের জামা পরে কারাগারে প্রবেশ পথে কর্মকর্তাদের কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করছেন ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত হলমার্কের জিএম তুষার আহমদ। তিনি আসার কিছু সময় পরই বাইরে থেকে বেগুনি রঙের সালোয়ার কামিজ পরা এক নারী আসেন। এ সময় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার রত্না রায় ও ডেপুটি জেলার সাকলাইন উপস্থিত ছিলেন ওই স্থানে। এ দু’জনের সহযোগিতার বিষয়টিও ফুটে উঠে ক্যামেরায়। দুপুর ১২টা বেজে ৫৫ মিনিটে কারাগারের দুই যুবকের সঙ্গে ওই নারী কর্মকর্তাদের কক্ষে যায়। ডেপুটি জেলার সাকলাইন তাকে অভ্যর্থনা জানান সেখানে।

ওই নারী কক্ষে প্রবেশের পর ডেপুটি জেলার সাকলাইন বেরিয়ে যান অফিস থেকে। প্রায় ১০ মিনিট পর বন্দি তুষারকে আনা হয় সেখানে। এরপর একটি কক্ষে ৪৫ মিনিট অবস্থান করেন তারা। ওই কক্ষের ভেতরে দু’জনের মধ্যে কি হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত চলছে এখন।

কেএফ

RTV Drama
RTVPLUS