logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

মানকাড: ক্রিকেটের বিতর্কিত আউটের আদ্যোপান্ত

স্পোর্টস ডেস্ক, আরটিভি অনলাইন
|  ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:০১ | আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:৩৪
বিভিন্ন সময়ে মানকাড আউটের দৃশ্য

বর্তমান সময় ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় মানকাড। চলমান আইপিএলে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব এবং রাজস্থান রয়্যালসের মধ্যকার ম্যাচে জশ বাটলারকে ‘মানকাডিং’য়ের ফাঁদে ফেলে আউট করে শিরোনামে চলে আসেন ভারতীয় অফ স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন। তবে অশ্বিনের কাছে ‘মানকাডিং’ মোটেই নতুন কোন ইস্যু না। এরকম কাণ্ড তিনি এর আগেও ঘটিয়েছেন। 

তবে মানকাড যে শুধু ক্রিকেট ফ্যানদের হৃদয় ভেঙেছে তা কিন্তু না। ভেঙেছে সিনেমা ফ্যানদের হৃদয়ও। লগন সিনেমায় মনকাডং আউটটি দেখে মন খারাপ হয়নি এমন ভক্ত খুব কমই পাওয়া যাবে। 

অনেকেই জানেন না মানকাড আউটটি কী? কিংবা এর উদ্ভাবক কে? আসুন জেনে নেই তার আদ্যোপান্ত।

মানকাড আউট হলো একজন বোলারের বল ডেলিভারি দেয়ার আগ মুহূর্তে নন স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা ব্যাটসম্যান কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলে বোলার যদি স্ট্যাম্প ভেঙে দেন তাহলে তিনি আউট হিসেবে ঘোষিত হবেন। আর একেই বলে মানকাড আউট। ব্যাটসম্যানরা সাধারণত দ্রুত সিঙ্গেল নেয়ার সুবিধার্থে ক্রিজ ছেড়ে বাহিরে চলে আসেন।

ক্রিকেটের বিতর্কিত ও অদ্ভুত ধরনের ডিসমিসাল হচ্ছে ‘মানকাডিং’। বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীর কাছে যেটির গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও খুব কমই দেখা মেলে ‘অখেলোয়াড়সুলভ’ কিংবা ‘ক্রিকেটীয় চেতনাবিরোধী’ এই আউটের। ভারতীয় বাঁহাতি স্পিনার ভিনু মানকড় সর্বপ্রথম  আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই আউটের প্রচলন করেন। তার নামের শেষাংশ ‘মানকড়’ (ইংরেজী উচ্চারণে আসলে যেটা Mankad) থেকেই এই ‘মানকাডিং’ নামকরণের উৎপত্তি।

১৯৪৭ সালে সিডনি টেস্টে বল ছোঁড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ভিনু মানকড় খেয়াল করলেন যে নন স্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যান বিল ব্রাউন ক্রিজ থেকে কিছুটা বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি বল ডেলিভারি না করে সোজা স্ট্যাম্প ভেঙে দেন এবং আপিল করেন রান আউটের। যেহেতু ক্রিকেটের আইন অনুযায়ী এভাবে আউট করার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বৈধ তাই মানকড়ের আপিলে সাড়া না দিয়ে কোন উপায় ছিল না আম্পায়ারের। আর এই আউটের মধ্য দিয়েই ‘মানকাডেড’ হওয়া ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে রেকর্ডবুকে ঢুকে যান বিল ব্রাউন।

সে সময় অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়ায় ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছিল এই মানকাডিং। ক্রিকেট মহলে এই বিষয়টি তুমুল সমালোচিতও হয়েছিল। কারণ অনেকেই এটিকে ক্রিকেটীয় চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করেন। আবার অনেকে উপস্থিত বুদ্ধির বেশ তারিফও করেন। তাদের যুক্তি ছিল, একজন ব্যাটসম্যান যদি কয়েক ধাপ সামনে এগিয়ে থেকে ‘অনৈতিক’ সুবিধা ভোগ করতে পারেন তো একজন বোলার কেন তাকে আউট করার সুযোগ নিতে পারবেন না।তবে টেকনিক্যালি এই মানকাডিং আসলে রান আউট ছাড়া কিছুই নয়।

আন্তর্জাতিক ও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট মিলিয়ে অনেকগুলো মানকাডিংয়ের ঘটনা রয়েছে রেকর্ডবুকে। আসুন দেখে নেই মানকাডিংয়ের সেই তালিকাগুলো। 

টেস্ট ক্রিকেট:
১. বিল ব্রাউন বাই ভিনু মানকড়, অস্ট্রেলিয়া বনাম ভারত, সিডনি, ১৯৪৭-৪৮
২. ইয়ান রেডপ্যাথ বাই চার্লি গ্রিফিন, অস্ট্রেলিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৬৮-৬৯
৩. ডেরেক রেন্ডাল বাই এউইন চ্যাটফিল্ড, ইংল্যান্ড বনাম নিউজিল্যান্ড, ক্রাইস্টচার্চ, ১৯৭৭-৭৮
৪. সিকান্দার বখত বাই অ্যালান হার্স্ট, পাকিস্তান বনাম অস্ট্রেলিয়া, পার্থ, ১৯৭৮-৭৯

ওয়ানডে ক্রিকেট:
১. ব্রায়ান লুকহার্স্ট বাই গ্রেগ চ্যাপেল, ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া, মেলবোর্ন,  ১৯৭৪-৭৫
২. গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার বাই দীপক প্যাটেল, জিম্বাবুয়ে বনাম নিউজিল্যান্ড, হারারে, ১৯৯২-৯৩
৩. পিটার কার্স্টেন বাই কপিল দেব, সাউথ আফ্রিকা বনাম ভারত, পোর্ট এলিজাবেথ, ১৯৯২-৯৩
৪. জস বাটলার বাই সাচিত্রা সেনানায়েকে, ইংল্যান্ড বনাম শ্রীলংকা, এজবাস্টন, ২০১৪

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট:
১. মার্ক চ্যাপম্যান বাই আমির কালিম, হংকং বনাম ওমান, ফতুল্লা, ২০১৬
২. জশ বাটলার বাই রবিচন্দ্রন অশ্বিন, রাজস্থান রয়্যালস বনাম কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব, জয়পুর, ২০১৯

ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট :
১. অ্যালেক্স ব্যারো বাই মুরালি কার্তিক, সমারসেট বনাম সারে, টন্টন, ২০১২

অনুর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ :
১. জিমি পিয়ারসন বাই সৌম্য সরকার, অস্ট্রেলিয়া অনুর্ধ্ব-১৯ বনাম বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯, টাউন্সভিল, ২০১২
২. রিচার্ড গারাভা বাই কিমো পল, জিম্বাবুয়ে অনুর্ধ্ব-১৯ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনুর্ধ্ব-১৯, চট্টগ্রাম, ২০১৬

তবে সুযোগ পেয়েও মানকাডিং করেননি এমন ঘটনাও কম নয়। যার মধ্যে রয়েছে ১৯৮৭ বিশ্বকাপের ম্যাচও। শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচটি হারতে হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে। আর বাংলাদেশও তাদের প্রথম টেস্ট জয় পায়নি এই মানকাডিং সুবিধা না নেয়াতে। 

আসুন দেখে নেই মানকাডিং এর সুবিধা না নেয়া মুহূর্তগুলো। 

কোর্টনি ওয়ালশ–সেলিম জাফর
১৯৮৭ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পাকিস্তানের শেষ ব্যাটসম্যান সেলিম জাফরকে আউট করার সুযোগ পেয়েও তাকে শুধু ওয়ার্নিং দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন ক্যারিবীয় ফাস্ট বোলার কোর্টনি ওয়ালশ। শেষ পর্যন্ত ওয়ালশের এই মহানুভবতার দায়ে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল তার দল ওয়েস্ট ইন্ডিজকেই। ম্যাচটি হেরে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই থেকে ছিটকে পড়ে তারা।

মোহাম্মদ রফিক–উমর গুল
২০০৩ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার ঐতিহাসিক মুলতান টেস্টেও ঘটেছিল একই ঘটনা। এবারে ১০ নম্বরে নামা পাকিস্তানী ব্যাটসম্যান উমর গুলকে সুযোগ পেয়েও আউট না করার উদারতা দেখিয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক। রফিক চাইলেই স্ট্যাম্পে বল লাগিয়ে গুলকে আউট করতে পারতেন। কিন্তু বল লাগাতে গিয়েও রফিক শেষ পর্যন্ত লাগাননি শুধুমাত্র ক্রিকেটীয় সৌজন্যবোধ থেকে। পুরো দেশবাসীকে কাঁদিয়ে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত মাত্র ১ উইকেটের ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ। ওই রান আউটটি হলে হয়ত ম্যাচের ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। ওয়ালশের মত রফিকের ঘটনাটিও ‘স্পিরিট অব ক্রিকেটের’ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। 

গেইল-মরগ্যান
২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ইয়ান মরগ্যানকে মানকাড আউট করার সুযোগ পেয়েও কাজে লাগান নি ওয়েস্ট ইন্ডিজের গেইল। বরং কয়েকবার উইকেটের পাশে গিয়ে বল দিয়ে উইকেট ভাঙার অভিনয় করেছিলেন গেইল। 

কাইরন পোলার্ড-আসাদ ফুদাদিন
২০১৭ সালের সিপিএলে এমনই এক সুযোগ পেয়েছিলেন বার্বাডোজের হয়ে খেলা কাইরন পোলার্ড। গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়রস এবং বার্বাডোজ ট্রিডেনসের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 

রবিচন্দ্রন অশ্বিন–লাহিরু থিরিমান্নে
২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে কমনওয়েলথ ব্যাংক সিরিজের একটি ম্যাচে শ্রীলংকার লাহিরু থিরিমান্নেকে মানকাডিং করেছিলেন ভারতীয় অফ স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন। তবে সেদিন মাঠে উপস্থিত দুই আম্পায়ার পল রেইফেল ও বিলি বাউডেনের কেউই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেন নি তাই তারা ভারতের অধিনায়ক বীরেন্দ্র শেহওয়াগকে আউটটি ফিরিয়ে নেয়ার অনুরোধ করেন। আকস্মিক এমন ঘটনায় শেহওয়াগ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। পরে শচীনের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি রান আউটের আপিল ফিরিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। 

অবশ্য ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শেহওয়াগ অশ্বিনের পক্ষই নিয়েছিলেন। শেবাগের মতে অশ্বিন নাকি থিরিমান্নেকে আউটের আগে একবার সতর্কও করেছিল। অন্যদিকে, বিপক্ষ দলের অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে অবশ্য বলেছিলেন তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তিনি বরং এ ধরনের ক্রিকেটীয় চেতনাবিরোধী কাজের জন্য অশ্বিনের সমালোচনা করেন।

এএ/এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়