Mir cement
logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮

পাল্টে গেছে মেহেদীর জীবন

মেহেদী হাসান

জুয়েলারি দোকানে কাজ করে মাসে ২৫০ টাকা মাইনা পেতেন মো. মেহেদী হাসান। এখন তার মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা।

২০১৫ সালে ১৫ বছরের ছোট্ট কিশোর মেহেদী। তার জন্মস্থান যশোরের বেনাপোলে। এক আত্মীয়ের জুয়েলারি দোকানে কাজ করতেন। মাস শেষে মিলত সামান্য বেতন।

বাবা আর মেহেদীর সামান্য আয়ে পরিবারের ৫ জনের অন্ন পোষণ চলত। ছয় বছরের ব্যবধানে সেই মেহেদীর আয় বেড়ে গেছে বহু গুণ। এখন আর শতকে হিসাব কষেন না তিনি। হাজারে পৌঁছে গেছে মেহেদীর পারিশ্রমিক।

এমন হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। তিনি এখন আর জুয়েলারি দোকানের চাকুরে নন, দেশসেরা ক্লাব বসুন্ধরা কিংসের খেলোয়াড়।

মেহেদী হাসান একজন উদীয়মান, প্রতিভাবান, চৌকস, দক্ষ গোলরক্ষক। জাতীয় বয়ঃভিত্তিক দলে নিজের মেধা-যোগ্যতা প্রমাণ করেই আজকে পেশাদার লিগের সবচেয়ে বড় আসর, ঘরোয়া ফুটবলের মর্যাদার আসর প্রিমিয়ার লিগের অংশ হয়েছেন। শুধু পেশাদার ফুটবলারই নন, খেলছেনও দেশের সেরা ক্লাবে।

যদিও কিংসের জার্সিতে সেরা একাদশে এখনো জায়গা করে নিতে পারছেন না। তবে হতাশ নন মেহেদী। সুযোগ পেলে নিজেকে উজাড় করে দিতে প্রস্তুত আছেন।

বসুন্ধরা কিংস ক্লাবে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক প্রতিযোগিতার কথা কারোর অজানা নয়। এখানে সব পজিশনেও রয়েছে দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়। গোলবারে সময়ের সেরা খেলোয়াড় আনিসুর রহমান জিকো খেলছেন। এছাড়া অভিজ্ঞ গোলরক্ষক মিতুল হাসানও রয়েছেন। পরীক্ষিত হামিদকেও দূরে রাখার সুযোগ নেই।

জিকো, মিতুল, হামিদের মতো গোলরক্ষককে বিট করা মেহেদীর জন্য তাই হিমালয় জয়ের সমান। জিকো, মিতুল, হামিদদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাওয়ার কোনও ইচ্ছাই নেই মেহেদীর। কিংসের তাঁবুতে আছেন, ভালো মানের কোচদের ট্রেনিং পাচ্ছেন এতেই খুশি মেহেদী।

যশোর বেনাপোলের এই খেলোয়াড় জানান, ‘বসুন্ধরা কিংস সময়ের সেরা ক্লাব। আমি এই ক্লাবে আছি এটা অনেক বড় ব্যাপার। ক্লাবের পরিবেশ সম্পর্কে আপনারা সবাই অবগত। আমি এখানে অনেক বড় ভাইদের পেয়েছি। তারা দেশের সেরা খেলোয়াড়। গোলরক্ষক জিকো ভাই, মিতুল ভাই, হামিদ ভাইদের মতো দেশসেরা গোলরক্ষকদের কাছ থেকে দেখছি, তাদের খেলা দেখে শিখছি এটা সবার ভাগ্যে জোটে না। ক্লাব অফিসিয়ালরা আমাকে দলে রেখেছেন আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি জানি আমার কী করার ক্ষমতা আছে। বয়ঃভিত্তিক দলে নিজেকে প্রমাণ করেছি। যদি কিংসের জার্সিতে খেলার সুযোগ পাই অবশ্যই নিজের সেরাটা উজাড় করে দেব। ক্লাবের জন্য সাফল্য বয়ে আনব।’

আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে মেহেদীকে। যদিও এখনো অনেক বড় কিছু হয়ে যাননি। তারপরও যতটুকু ফুটবলে অর্জিত মেহেদীর এর পেছনে অনেকের অবদান বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

২০১৬ সালে পাইওনিয়ার ফুটবল লিগের দল যশোরের আলহাজ নুরুল ইসলাম ফুটবল একাডেমি থেকে যাত্রা শুরু তার। সেখান থেকে ভালো খেলে ট্রায়ালে সুযোগ মেলে বয়ঃভিত্তিক দল অনূর্ধ্ব-১৫ তে। তারপর সেই দলের হয়ে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে কাতার সফর।

অনূর্ধ্ব-১৮ দলে জায়গা করে নেয়া, এরপর থাইল্যান্ডে চার জাতি টুর্নামেন্ট খেলা, ঘরের মাঠে বয়ঃভিত্তিক দলের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফি জেতা আর অনেক অনেক সাফল্যের গল্প অল্প বয়সেই নামের পাশে যোগ করেছেন।

বয়ঃভিত্তিক দলে ভালো খেলার সুবাদে বাফুফের নজরে পড়ে যান মেহেদী। তাকে নিয়ে আসা হয় বাফুফের অধীনস্থ ক্যাম্প ফর্টিস একাডেমিতে। সেখানে বেশ কিছুদিন অনুশীলন ক্যাম্প করেন।

ফর্টিসের হয়ে ২০২০ সালে লিগের দ্বিতীয় স্তর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর মেহেদী চলে আসেন বসুন্ধরা কিংসে।

যশোরে জুয়েলারি দোকানে কাজ করতে গিয়েই ভাগ্যে নতুন মোড় আসে মেহেদীর জীবনে। দোকানের পাশের রাস্তার ফুটবল নিয়ে একদল ছেলে নিয়মিত খেলতেন। তাদের ট্রেনিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাব্বির আহমেদ পলাশ।

ছেলেদের দেখাদেখি মেহেদীও খেলায় অংশ নেন। সেখানে ভালো খেলার সুবাদে বাজার কমিটির একটি ম্যাচে ডাক পড়ে তার। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রিয় পলাশ স্যারের হাত ধরে চলে আসেন মেয়র আশরাফুল ইসলাম লিটনের বাবার নামে গড়া একাডেমিতে। পলাশ স্যারই মূলত সেখানে নিয়ে আসেন। এর পরের গল্প সবারই জানা।

বাবা, মা আর দুই বোন- ছোট্ট পরিবার মেহেদীদের। এক সময় সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও এখন অবস্থা কিছুটা ভালো। মায়ের কারণেই আজকে ফুটবলার হতে পেরেছেন মেহেদী।

ফুটবল খেলার জন্য শুরুতে পরিবার থেকে তেমন সাপোর্ট পাননি। তবে মা সব সময়ই পাশে ছিলেন। ছেলেকে উৎসাহ-প্রেরণা দিতেন। মায়ের মুখরক্ষা করেছেন মেহেদী।

গলির মোড়ের ফুটবলার থেকে আজ প্রিমিয়ার লিগের দামি ক্লাব বসুন্ধরা কিংসের অংশ হয়েছেন। এখানেই থামতে চান না। লক্ষ্য সুউচ্চ তার। ক্লাব ফুটবলে ভালো খেলে একদিন জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়াতে চান ২০ বছরের তরুণ মেহেদী। যশোরের মুখ উজ্জ্বল করতে চান।

মামুন হোসেন, অতিথি লেখক

এমআর/

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS