Mir cement
logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

নতুন কৌশলে এটিএম বুথে প্রতারণা

নতুন কৌশলে এটিএম বুথে প্রতারণা

নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে এটিএমে (অটোমেটেড টেলার মেশিন) মাঝেমধ্যেই ঘটছে অর্থ চুরির ঘটনা। দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যাংককর্মীদের অসততার কারণে প্রায়ই চুরি হচ্ছে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা। সাইবার অপরাধী, ব্যাংককর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তির সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের বহুমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।

এর সাথে জড়িত অপরাধ চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে অনেক সময় এরা গ্রাহকের হিসাব ছাড়াই এটিএম মেশিন থেকে সরাসরি টাকা তুলছে, যা পরে ব্যাংকের দায় হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, জালিয়াতির প্রচলিত পদ্ধতির বাইরেও এখন যুক্ত হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। চক্রটি বিশেষ ধরনের কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা না নিয়ে সরাসরি এটিএম বুথে মজুত অর্থ তুলে নিচ্ছে। এ ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী।

এ ধরনের প্রবণতা বন্ধে এবং ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে কাজ চলছে। জাতীয় সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সার্ট), বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এসব নিয়ে কাজ করছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। গ্রাহকদেরও সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিজিডি ই-গভ সার্ট এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সির (ডিএসএ) পরিচালক তারেক এম বরকতউল্লাহ অনলাইন গণমাধ্যমকে জানান, অধিকাংশ ব্যাংকের এটিএম মেশিন আনা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার বাইরে।অনুমতি ছাড়া অন্য চ্যানেলে আসা মেশিনগুলোর বহুমুখী দুর্বলতা থাকে, যা এটিএম থেকে টাকা চুরির সুযোগ তৈরি করে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে ক্লিন ডিএনএস সার্ভার স্থাপনের আহবান জানান তিনি।

এটিএম বুথ ঝুঁকিমুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক উদ্যোগ নিলেও ব্যাংকগুলোর সদিচ্ছার অভাবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ‘সক’ (সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েক দফা তাগাদা সত্ত্বেও দু-একটি ব্যাংক ছাড়া বেশির ভাগই কার্যকর করেনি। ফলে এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে এটিএম সেবা।

গত পাঁচ বছরে দেশি-বিদেশি চক্রের সহযোগিতায় এটিএম বুথগুলোয় অন্তত ১৭টি চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এগুলো নিয়ে সিআইডি তদন্ত করছে।

তদন্তে সিআইডি দেখেছে, জালিয়াতির কোনো একপর্যায়ে ব্যাংককর্মীদের সংশ্লিষ্টতা বা উদাসীনতা রয়েছে। স্কিমিং (কার্ডে রক্ষিত তথ্য চুরি করা), ক্লোনিং (কার্ড নকল করা) করে কার্ডের গোপন তথ্য জেনে নিচ্ছে চক্রটি। এছাড়া বুথে গোপন ক্যামেরা স্থাপন, ম্যালওয়্যার ভাইরাস ও শপিংমলে অনলাইনে (পজ মেশিন) অর্থ পরিশোধে কার্ড রিডার বসিয়েও তথ্য চুরি করছে চক্রটি।

পাশাপাশি সিম ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের মোবাইল ফোনে অর্থ উত্তোলনের এসএমএস বন্ধ করে দিচ্ছে চক্রটি। ফলে গ্রাহক নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে খোয়া যাওয়া অর্থের বিষয়ে থাকেন অন্ধকারে। একটি ব্যাংকের গ্রাহকের হিসাব থেকে ৫ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাও ধরা পড়েছে। এতে ওই ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, চক্রটি বিশেষ ধরনের কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা না নিয়ে সরাসরি এটিএম বুথে মজুত অর্থ তুলে নিচ্ছে। এ ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পাশাপাশি উত্তর কোরিয়াসহ বিদেশি একাধিক হ্যাকার গ্রুপ দেশের বাইরে থেকেই অর্থ লোপাটের চেষ্টা করেছে। তাদের মূল টার্গেট থাকে ডলারে লেনদেন হয় এমন ক্রেডিট কার্ড। এসব ঘটনা ব্যাংকিং খাতে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে।

দেশে প্রথম অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) চালু হয় ১৯৯২ সালে । বর্তমানে সারা দেশে ১১ হাজারের মতো এটিএম বুথ ও ৬১ হাজারের মতো পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন রয়েছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ব্যাংক মানসম্মত এটিএম মেশিন আনে না। আবার অনেক ব্যাংক এখনো মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এক্সপিসহ ২০০০, ২০০৭, ২০১০ এই ধরনের পুরোনো অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছে, যা নতুন করে আপডেট নিচ্ছে না। ফলে সাইবার নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে হ্যাকাররা সহজেই নিয়ে নিচ্ছে এটিএমের নিয়ন্ত্রণ।

তারা আরও বলেন, অনেক সময় এটিএম মেশিনের ডিসপ্লের ঠিক উপরে শক্তিশালী ক্যামেরা বসানো থাকে। যার মাধ্যমে আঙুলের মুভমেন্ট বোঝা যায়। অন্যদিকে এটিএমের ভেতরে বিশেষ একটি মেশিন বসিয়ে কার্ডের সব তথ্য সংগ্রহ করে আলাদা কার্ড বানিয়ে এবং ক্যামেরার মাধ্যমে নেওয়া পাসওয়ার্ড দিয়ে ওঠানো হয় টাকা।

সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহমুদুল ইসলাম তালুকদার গণমাধ্যমকে বলেন, এটিএম বুথের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ‘ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ’ কার্ড। এই কার্ড খুব সহজেই ক্লোন করা যায়। অনেক সময় এটিএমে কার্ড ঢুকানোর জায়গাতেই বিশেষ ডিভাইস বসায় হ্যাকাররা। ফলে ঢুকানোর সময় কার্ডটি স্কিমিং হয়ে ঢোকে। আর গোপন ক্যামেরা দিয়ে গ্রাহকের টাইপ করা ‘পিন কোড’ নিয়ে নেয় তারা। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে চিপ ও পিনযুক্ত কার্ড নিরাপদ। এটা ‘এনক্রিপ্টেড’ থাকে। ফলে ক্লোন করা যায় না। তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

এমএন

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS