• ঢাকা সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১
logo

শিশুর মানবাধিকার কি ডেইলি স্টারে থেমে গেছে?

খায়ের মাহমুদ

  ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৪:৩৪
খায়ের মাহমুদ
লেখক : খায়ের মাহমুদ

বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রশ্নে বিশেষ করে শিশুর মানবাধিকার নিয়ে সব থেকে সক্রিয় সংবাদপত্রের একটি, ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার।

বাংলাদেশে শিশু অধিকার নিয়ে ইংরেজিতে গুগল সার্চ করলে প্রায় অধিকাংশ সংবাদই ডেইলি স্টারের পাবেন, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ডেইলি স্টারেরই একজন সিনিয়র সাংবাদিকের আট তলার বাসার থেকে গত ৬ মাসের মধ্যে দুজন শিশু গৃহকর্মী লাফ দিয়েছে।

ছয় মাস আগেও সাত বছরের এক শিশু গৃহকর্মী বাসা থেকে লাফ দিয়েছিল। রক্তাক্ত জখম হলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় ফেরদৌসি নামের সেই শিশুটি। সে ঘটনায় মামলাও হয়েছিল। ছয় মাস পেরোতে না পেরোতেই আবারও এক শিশু গৃহকর্মী একই বাসা থেকে লাফ দেয়। এবার আর ভাগ্য সহায় হয়নি।

আট তলা থেকে লাফ দিয়ে এক তলার গ্যারেজের ছাদের ওপর পড়ে ১৫ বছর বয়সী প্রীতি উড়ান। হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।বাংলাদেশে গৃহ কর্মে শিশুর নিয়োগ সম্পূর্ণ বেআইনি, নিষিদ্ধ এবং শাস্তি যোগ্য অপরাধ, অথচ এখানে শুধু শিশুশ্রমই নয়, ঘটেছে শিশু মৃত্যুর ঘটনা।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশগুলোর একটি। ১৯৯০ সালের অগাস্ট মাসে এশিয়া অঞ্চলের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ওই সনদে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। বলার অপেক্ষা রাখে না শিশু অধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশ সব সময়ই সোচ্চার।
স্বাধীনতার অব্যাহত পরেই বঙ্গবন্ধু যে কয়টি আইন অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার মধ্যে বাংলাদেশ শিশু আইন ১৯৭৪ অন্যতম । শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় শিশুদের জন্যে আলাদা আদালত এবং কিশোর সংশোধনালয় তার হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ স্বাক্ষরের পর সকল দেশকে তার শিশু আইন আন্তর্জাতিক শিশু সনদ অনুযায়ী হাল নাগাদ করার আইনগত বাধ্যবাধকতা কথা বলা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য ১৯৯০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত কোনো সরকারি এর বাস্তবিক কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

যেই শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ তাদের জন্য আইন প্রণয়নে করা হয়েছে অবহেলা। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের সরকার গঠন করার পরে শিশু আইন ১৯৭৪ বাতিল করে আন্তর্জাতিক শিশু সনদ অনুযায়ী শিশু আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেন, ফলাফল হিসেবে ২০১৩ সালের সম্পূর্ণ নতুন এবং যুগোপযোগী বাংলাদেশ শিশু আইন প্রণীত হয়।

ভাবতে অবাক লাগে দেশে যেখানে এমন একটা অসাধারণ এবং সময়োপযোগী শিশু আইন রয়েছে সেখানে কীভাবে এখনো শিশুর সাথে এমন চরম বৈষম্য মূলক আচরণ, এমনকি ফৌজদারি অপরাধ করে হোতারা পার পেয়ে যাচ্ছে।

একবার ভাবুন যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুটি ডেইলি স্টারের সিনিয়র সাংবাদিকের বাসায় কাজে নিয়োজিত ছিল তার এমন মৃত্যু আমাদের কি বার্তা দেয়?

একজন শিক্ষিত সর্বোচ্চ সচেতন মানুষের বাসায় ৬ মাসের ব্যবধানে এমন দুটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারে দাবি আমাদের সবার করা উচিত নয় কি ? নাকি আমরা ঘটনার সাথে যুক্ত ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান দেখে থেমে যাচ্ছি। প্রতিবাদ করছি সময় ও পরিস্থিতি দেখে।
আলোচিত এই ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় যে মামলা হয়েছে, তাতে দণ্ডবিধির ৩০৪-ক ধারায় অবহেলাজনিত কাজের দ্বারা মৃত্যু ঘটানোর অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে লুকেশ ওড়ান বলেছেন, ‘আটককৃত ব্যক্তিরা (আশফাকুল হক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকার) অবহেলাজনিতভাবে বাসার জানালায় নিরাপত্তা বেষ্টনী না দিয়ে অরক্ষিত অবস্থায় রাখার কারণে ওই জানালার ফাঁক দিয়ে আমার মেয়ে প্রীতি উড়ান পড়ে গিয়ে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।’

ছয় মাসের ব্যবধানে পরপর দুই শিশু গৃহকর্মীর সঙ্গে একই ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক আশফাকুল হকের বাসার ভেতরে কী এমন ঘটনার অবতারণা হয় যে শিশু গৃহকর্মীরা আট তলা থেকে লাফ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে?

বাসায় কি তাদের শারীরিক, মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতন করা হয়? নাকি শিশুদের ফেলে দেওয়া হচ্ছে? অথচ এই ঘটনায় আদালত দোষীদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে রিমান্ড না দিয়ে জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে বলেছে।

শিশু অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদের অনুচ্ছেদ ৩-এ বলা হয় বেস্ট ইন্টারেস্ট অফ দ্যা চাইল্ড প্রিন্সিপাল অর্থাৎ শিশুর জন্যে যা ভালো রাষ্ট্রকেই তাই করতে হবে। শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, তার সুরক্ষা এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। আমাদের অসাধারণ একটি আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগের জায়গাটা কি আমরা নিশ্চিত করতে পারছি? আমরা কেন শিশুর সাথে একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দিচ্ছি?

আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত আজকের শিশুই আগামীর বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে, তাকে সমর্থন করা, স্বাভাবিক বেড়ে উঠতে দেয়া আপনার-আমার নৈতিক দায়িত্ব। তেমনি তাদের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো অপরাধের বিচার চাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

যার যার জায়গা থেকে প্রতিবাদ জানাতে হবে, রাষ্ট্রযন্ত্র কে বাধ্য করতে হবে যেন কোনো বড় নাম বা প্রতিষ্ঠান দেখে শিশুর সাথে অপরাধের যেন আপোষ না হয়। শিশুর মানবাধিকার যেন কোনো নাম আটকে না যায়।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

daraz
  • মুক্তমত এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
গৃহকর্মীর মৃত্যু : ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদককে অব্যাহতি
প্রীতি উরাংয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার দ্রুত তদন্ত দাবি
প্রীতি উরাংয়ের মৃত্যু : ডেইলি স্টার সম্পাদককে খোলা চিঠি
রাবিতে ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদকের সস্ত্রীক বিচার দাবি