logo
  • ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

লাইফস্টাইল ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

  ১৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:৪৫
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ১৫:২৮

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখতে করণীয়

Dr. Tauheeda Rahman Erin
ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ১৪ নভেম্বর। ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ব জুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। প্রায় প্রতি ঘরেই ডায়াবেটিসের রোগী দেখা যায়। আমাদের দেশে প্রায় দেড় কোটি লোক, পৃথিবীতে ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ে জীবন যাপন করছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০৩০ সাল নাগাদ ৪০ কোটিতে দাঁড়াবে। আরটিভি নিউজের পাঠকদের জন্য এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন।

ডায়াবেটিসের সঙ্গে ত্বকের সম্পর্ক

আমরা খাবারের মাধ্যমে যে সুগার নিই, এটি ব্লাডে চলে যায়। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামক এক ধরনের হরমোন থাকে, যা সুগারকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে, নতুবা জমে থাকে। কিন্তু যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের কোনো কারণে ইনসুলিন উৎপাদন কম হয়, রেজিসটেন্স হয়ে যায়। তখন এই কোষ এই সুগারকে কাজে লাগাতে পারে না। তখন অস্বাভাবিকভাবে জমতে থাকে। আর একটি একটি করে অঙ্গ সে ক্ষতি করতে থাকে। ত্বক আসলে এই ক্ষতির মধ্যে দুভাবে জড়িয়ে পড়ে। প্রথমত, আমাদের ত্বকে যে রক্তনালীগুলো থাকে, এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেভাবে ত্বক প্রভাবিত হয়। এরপরও আমাদের যে অঙ্গগুলো আছে, এগুলো যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তকেও প্রভাব পরে । 

কী কী ধরনের সমস্যা ত্বকে আসতে পারে

অনেক সময় রোগী নিজেই বুঝতে পারে না যে তার ডায়াবেটিস হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যদি ডায়াবেটিস থাকে, সুগার বেড়ে গেলে তো ডায়াবেটিস হয়, রোগী আসে শুষ্ক ত্বক নিয়ে, তখন আমরা পরীক্ষা করে জানতে পারি যে তার ডায়াবেটিস আছে।

ডায়াবেটিস হলে প্রথমে যে সমস্যাটি দেখা দেয়, এটি হলো শুষ্ক ত্বক। রক্তে উচ্চমাত্রায় সুগার ত্বককে পানিশূন্য করে। কারণ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, আমাদের কোলাজেনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কোলাজেন যেহেতু কম তৈরি হচ্ছে, তাই হিলিং কম হয়, এতে শুষ্কতা বেশি দেখা দেয়। ঘন ঘন প্রস্রাব ও ঘাম হওয়ার ফলে শরীর শুষ্ক হয়ে পড়ে। যার প্রভাব পড়ে ত্বকের ওপর। 

ত্বক শুষ্ক হলে তিন রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমে শুষ্ক হচ্ছে, পরে প্রচণ্ড চুলকানি। রোগী অভিযোগ করতে থাকে, আমার চুলকাচ্ছে। আর অনেক সময় এই চুলকানি থেকে ক্র্যাক হয়ে সংক্রমণ হয়। রক্তে থাকা উচ্চ মাত্রার শর্করা ছত্রককে ত্বকে বসবাস করার মতো উপযুক্ত পরিবেশ দেয়। ফলে ত্বকে ছত্রাক ও অন্য রোগ জীবাণুরা বসবাসের সুযোগ পায়। ক্যান্ডিডা অ্যালবিকেন্স ব্যথাযুক্ত ছত্রাকের সংক্রমণ যা সাধারণত হয়ে থাকে ডায়াবেটিস রোগীদের। ডায়াবেটিসের কারণে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে ত্বকে। আবার নখেও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে।আসলে শুষ্কতাকে যদি প্রতিরোধ করতে পারি, তাহলে পরবর্তীকালে যে সংক্রমণ, ক্র্যাক—এগুলো কিন্তু আর হচ্ছে না। তাই শুষ্কতা প্রতিরোধের জন্য প্রথমেই আমাকে যেটি করতে হবে, মাইল্ড সাবান দিয়ে খুব অল্প সময়ের জন্য গোসল করতে হবে। মানে অনেক লম্বা সময় ধরে যেন গোসল করতে হবে। সাবানটা অনেক মাইল্ড হতে হবে, যেন কড়া না হয়। ত্বকের যেন কোনো প্রতিক্রিয়া না করে। আর গোসলের পরপরই ভালো ময়েশ্চারাইজার দিয়ে ত্বককে ময়েশ্চার করতে হবে। আর যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের ত্বক আরও শুষ্ক হয়। তখন আমি যে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করব, এটি হতে হবে ত্বকের জন্য ভালো। ময়েশ্চারাইজারটি হাইপো-অ্যালার্জিক হতে হবে। কোনো রাসায়নিক পদার্থ বা প্রিজারভেটিভ থাকা যাবে না। ডাই মুক্ত ও গন্ধমুক্ত হতে হবে। পায়ের পাতার বিশেষ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যক্তি পায়ের পাতায় কোন অনুভূতি পান না। প্রতিদিন পায়ের যত্নে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পা পরীক্ষা করিয়ে নিন। গলার ঘাড়ে, গলায়, বগলে কালো, খসখসে আবরণ হয়, যাকে অ্যাকানথোসিস নেগ্রিকানস বলে। আবার হাতের যেকোনো অংশে, কনুই এবং হাঁটুর ত্বও গাঢ় বাদামী হয়ে যায়। মুখের ভেতরের সবরকম যত্ন নেয়ার পরও যদি দেখেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, এটিও ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার একটি লক্ষণ। 

ডায়াবেটিসে চুল পড়ে যে কারণে

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা চুলের নানারকম সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসেন। চুল পড়া, চুলের আগা ফেটে যাওয়া, প্রাণহীন চুল। শারিরীক ও মানসিক স্ট্রেস, পুওর ব্লাড সার্কুলেশন, স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত, এগুলো প্রধান কারণ।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কী খাবেন

কিছু খাবার রয়েছে যেগুলো শরীরের শর্করার ভারসাম্য  বজায় রাখে এবং ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ ওটস, কাঠবাদাম, মাছ, মটরশুঁটি, গাজর, আদা, চিরতা, রসুন ,লাউ শাক, কুমড়ো শাক, পাট শাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, ওলকপি, টমেটো, কাঁচা পেঁপে, শসা, খিরা, উচ্ছে, করলা, ঝিঙা, ধুন্দল, চাল কুমড়া, ডাঁটা, লাউ, সজনে, মেথি, আমলকী, কমলা, আপেল, গ্রিন টি। সম্পৃক্ত ফ্যাট কম খাওয়া এবং অসম্পৃক্ত ফ্যাট খাওয়ার অভ্যাস করা। স্টেভিয়ার নির্যাসে ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেড না থাকায় এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। ফলে ডায়াবেটিস রোগীরা নিশ্চিন্তে এটা দিয়ে তৈরি খাবার খেতে পারেন৷ নিয়মিত স্টেভিয়া সেবনে নিয়ন্ত্রণে থাকে ডায়াবেটিস৷চিনির বদলে যে কোন খাবারে ব্যবহার করা যেতে পারে স্টেভিয়া।

ব্যায়ামের বিকল্প নেই

ডায়াবেটিস  নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ব্যায়াম ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম বা দৈহিক পরিশ্রম মাংসপেশির জড়তা দূর করে এবং রক্ত চলাচলে সাহায্য করে। ফলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ মিনিট হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। খেলাধুলা করুন, সাঁতার কাটুন, লিফট-এর বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার উপযুক্ত ব্যায়াম নির্বাচন করুন। কারণ সব ব্যায়াম সবার জন্য উপযুক্ত নয়। হঠাৎ খুব কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে প্রথমে হালকা ব্যায়াম দিয়ে শুরু করতে হবে, ধীরে ধীরে গতি বাড়াতে হবে। 

কারো একবার ডায়াবেটিস দেখা দিলে তা আর ভাল হওয়া সম্ভব না, তবে যা সম্ভব তা হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম, ডায়াবেটিস  সম্পর্কিত শিক্ষা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখবে নীরব ঘাতক ডায়াবেটিস।

ডা. তাওহীদা রহমান ইরিন: ডার্মাটোলজিস্ট, শিওরসেল মেডিকেল (বাংলাদেশ) লিমিটেড।

জিএ 

RTVPLUS