• ঢাকা শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ৫ মাঘ ১৪২৫

খেলার জায়গা নেই, রেস্টুরেন্টমুখী কিশোররা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

আরটিভি অনলাইন রিপোর্ট
|  ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:১৭ | আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১২:৪৪
ছবি-সংগৃহীত
কিশোর বা যুবক বয়সে বসে থাকা কি সেটা বুঝতাম না। আমাদের মতো ব্যস্ত মনে হয় তখনকার কোনও ভিআইপি লোকও ছিল না। সারাদিন থাকতাম দৌড়ের উপর। স্কুলে যখন পড়তাম সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতাম। স্কুলে যেয়ে বেঞ্চে ব্যাগটা রেখেই প্রথম ধাপের খেলাটা শেষ করে ফেলতাম। পরে টিফিন টাইমে আবার খেলা শুরু। স্কুল শেষ করে কোনমতে খেয়ে আবার মাঠে দৌড়। মাঝে মাঝে মাঠে যেতে না পারলে রাস্তায়ও খেলতাম। আর শীত আসলে আবার রাতেও ব্যস্ত থাকতাম ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়ে।

কথাগুলো বলছিলেন ইয়াসিন নামে (৪৮) একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনাদের শৈশব কেমন কেটেছিল। এই রকম প্রশ্ন আরও বেশ কয়েকজনকে করা হলে তাদের উত্তরও প্রায় একই আসে।

কিন্তু রাজধানীতে এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। বলতে গেলে অবাকই হওয়ার মতো। হঠাৎ করেই ঢাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে খাবারের দোকানগুলো বা রেস্তোরাঁয়। একসময় ঢাকায় বিদেশি খাবার মানেই ছিল চায়নিজ ও থাই ফুড। কিন্তু তখন যেখানে সেখানেও চাইনিজ খাবার পাওয়া যেত না।  

বর্তমানে ধানমণ্ডি, বেইলিরোড বা খিলগাঁওয়ের কথাই ধরা যাক। এখানে এখন বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি খাবারের রেস্তোরাঁ বেশ জমে উঠেছে। উৎসব উৎসব একটা ব্যাপার থাকে সবসময়। রাকিব (২২) একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ভার্সিটির ক্লাস শেষে প্রায় প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেয়। সেখানে চিকেন, পিজ্জা, বার্গারসহ নানা ধরণের জাঙ্ক ফুড খায়। রাকিবের সঙ্গে আসে মোহনা, সুপ্রিয়া, অর্ণব, মৃদুল ও পিয়াস। প্রতিদিন একজন অন্যদের ট্রিট দেয়। কখনও ভাগাভাগি করে ট্রিট দেয়। তারপর গল্প-আড্ডা শেষ করে বাসায় ফিরে। শুধু রাকিব, পিয়াস, মোহনা, সুপ্রিয়া নয় এখন শহরের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের কর্মসূচী এমনই।

অনেক রেস্তোরাঁয় তরুণদের আকর্ষণ করতে খাবারের পাশাপাশি চালু করেছে আকর্ষণীয় মিউজিক শোনার ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও আছে ধূমপানের জন্য আলাদা জোনও। 

যেসময় কিশোর বা তরুণদের খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা সেসময় তারা সময় কাটাচ্ছে এইসব রেস্তোরাঁয়। বিনোদন হিসেবে এটাকে বেছে নিয়েছে অনেকে। যেহেতু তারা রেস্তোরাঁয় সময় কাটাচ্ছে, তাদের কিছু না কিছু খেতেই হচ্ছে। আর এতেই বাড়ছে বিপদ। মুখরোচক ফাস্টফুড ঠিক কতটুকু ক্ষতিকর সেটা তাদের অনেকেরই অজানা।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. বেলাল হোসাইন বলেন, জাঙ্ক ফুড বা ফাস্ট ফুড গ্রহণ করার পর শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি সঞ্চয় হয়। যেহেতু তারা খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়াম ও কসরত করছে না ফলে স্থূলতা বেড়ে যাচ্ছে বা মোটা হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ডায়াবেটিক, হাইপারটেনশন ও কিডনি সমস্যা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, অতিরিক্ত ফাস্টফুড খেলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, রক্তে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল হয়। ইদানীং ছোট-বড় সবার কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিচ্ছে। 

এটা তো গেল একদিক। তবে কেন রেস্তোরাঁয় এইসব কিশোর-কিশোরী বা তরুণরা সময় কাটাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে খেতে আসার কারণ খুঁজতে গিয়ে কথা হয়, ধানমণ্ডির কেএফসিতে আসা সুলতানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আসলে মাঠে যেতে মন চায়, কিন্তু মাঠ কোথায় খেলবো কোথায়? খোলা জায়গাও নেই।

ধানমণ্ডির ১৫ নম্বরে কেবি স্কয়ারের একটি রেস্টুরেন্টে রিফাত(১৬) নামের এক কিশোরকে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা আছে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মজার সময় পার করা যায়। যে সুবিধা অন্য জায়গায় পাওয়া যায় না। আর অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই।’  

রাজধানীর স্বনামধন্য একটি রেস্টুরেন্টে পরিবার নিয়ে খেতে আসা নাসিমা বেগম (৩৮) বলেন, বাচ্চারা বাহিরে খোলা কোনও পরিবেশ পায় না। না পেতে পেতে এখন যেতেও চায় না। আর এখন খোলা মাঠ বা পার্কগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানের মাঠ ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোর অবস্থা অতি করুন। এসবের কোনওটি চলাচলের অনুপযোগী, কোনওটিতে প্রবেশের অধিকার নেই, কোনওটিতে সংস্কারের কাজ চলছে, আবার পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে কেউবা ইচ্ছে করেই ওইসব জায়গায় প্রবেশ করেন না।    

এদিকে কিশোর বা তরুণদের রেস্টুরেন্টমুখী হওয়ার বিষয়ে  জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মেখলা সরকার বলেন, ‘রেস্টুরেন্টে জাঙ্কফুড বা ফাস্টফুড খেয়ে অনেক রকমের রোগ হবার সম্ভাবনা তো বেড়ে যাচ্ছেই, পাশাপাশি বাচ্চাদের স্থূলতা বেড়ে যাচ্ছে, মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিনোদন শুধুমাত্র রেস্টুরেন্ট কেন্দ্রিক হচ্ছে। ফলে এখানে না আসতে পারলে মন খারাপ হচ্ছে। মানসিকভাবে একটা অশান্তি তৈরি হচ্ছে। যা অদূর ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের দৈনন্দিন গতিশীলতা ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য অবশ্যই স্বল্প পরিমাণে বিনোদন কেন্দ্র থাকলেও সেখানে যেতে হবে|’  

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, কাগজে কলমে দুই সিটিতে ১৬টি খেলার মাঠ ও ৪১টি পার্ক উল্লেখ আছে। কিন্তু অভিযোগ আছে, অনেকগুলো মাঠ ও পার্কের অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। কয়টি আছে তাও আবার অবৈধ দখলে। অনেকগুলো মাঠ আছে যেগুলোতে সাধারণ মানুষ খুব কম ঢুকতে পারে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ন প্রকৌশলী তারিক বিন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২টি পার্ক এবং ৪টি খেলার মাঠ রয়েছে। যেগুলো প্রত্যেকটি উন্নয়নের কাজ চলছে। কোনও গতানুগতিক ধারায় না নতুন প্রজন্মের কাছে যেন তাদের পছন্দসই জায়গা হিসাবে পরিচিত করা যায় সেজন্যই আমাদের এ উদ্যোগ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও নগরায়ণ-সুশাসন কমিটির সদস্যসচিব স্থপতি ইকবাল হাবিব আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য একটি মাঠ থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের শহরে প্রতি স্কয়ার কিলোমিটারে মানুষের সংখ্যা ৪৭ হাজার। সেখানে প্রতি স্কয়ার কিলোমিটারে ৪টি মাঠ প্রয়োজন। এ তথ্য অনুসারে রাজধানীতে মাঠ করার মতো সক্ষমতা আমাদের  নেই। তবে যেসব মাঠ রয়েছে তা সাংবিধানিকভাবে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া বুঝিয়ে দেয়া সরকারের উচিত। 

তিনি আরও বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ৫০টি খেলার মাঠের পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছে। দক্ষিণ জল সবুজের ঢাকার অধীনে ৩১টি ও আরবান রেজিলেন্স প্রজেক্টের আওতায় ২৪টি। বর্তমানে যেসব প্রজেক্ট তৈরি করা হচ্ছে সব পার্কে খেলার মাঠ, বয়স্ক ও নারীদের জন্য আলাদা জায়গা রাখা হচ্ছে।

ঢাকার বাড়িগুলো রিজেনারেশন করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকায় বেশির ভাগ বাড়ি তিন থেকে চার তলা। তবে বাড়িগুলো রিজেনারেশন করে উঁচু বাড়ি করা হলে আবাসনের বাহিরে দেড়গুণ জায়গায় উঠান, উন্মুক্ত খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বয়স্ক, নারী ও শিশুদের ঘোরাফেরার জন্য স্থান বের করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ সিঙ্গাপুর গেল ২৫ বছর ধরে সরকারি প্রণোদনায় পাবলিক ও প্রাইভেট বিনিয়োগের মাধ্যমে কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এভাবেই তাদের শহর গড়ে তুলেছে। যা আমাদের দেশেও পরিকল্পিতভাবে করা সম্ভব।

জিএ/এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়