logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

দেশের প্রথম লাভ পয়েন্ট রাঙামাটিতে

বসন্ত ভালোবাসা লাভ পয়েন্ট
ছবি: সংগৃহীত

ভালোবাসার মানুষটাকে শক্তভাবে আঁকড়ে রাখতে কতো কিছুই না করে প্রিয় মানুষটি। অনেকেই ছুটে যায় গণকের কাছে কেউবা শরণাপন্ন হন জ্যোতিষীর। এমনও হাজারও পাগলামির ইতিহাস রয়েছে পৃথিবীতে। কতো গল্প-উপন্যাসই সৃষ্টি হয়েছে ভালোবাসার এসব পাগলামো নিয়ে। কিন্তু রাঙামাটিতে ঘটেছিল এক যুগলের প্রেমের করুণ পরিণতি। সদ্যবিবাহিত আলাউদ্দিন-লিমার আলিঙ্গনে মৃত্যুর সংবাদটি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বেশ আলোচিত-আলোড়িত হয়েছিল।

সেই করুণ মৃত্যুর কাহিনী জানে না এমন মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। আমেরিকা প্রবাসী আলাউদ্দিন নববধূকে নিয়ে হানিুমনে এসেছিল হ্রদ-পাহাড়ঘেরা রাঙামাটি শহরে। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ বিকেলে পর্যটন ঝুলন্ত সেতু থেকে ছোট্ট বোটে করে হ্রদ দেখতে ভ্রমণে বের হন দুজনে। হাত ধরাধরি করে বোটে ওঠে দুজন। সুনীল আকাশের নিচে স্বচ্ছ হ্রদের বুক চিরে চলছে ছোট্ট নৌযান আর পাশেই বসা ভালোবাসার মানুষটি। বসন্তের উথাল হাওয়ায় তারাও যেন ভাসছে স্বপ্নের ভেলাতে। কিন্তু সেই স্বপ্নিল উথাল হাওয়া যে তাদেরকে পরপারে নিয়ে যাবে তা কে জানতো। হঠাতই কালবৈশাখীর উথালপাতাল হাওয়ায় ঢেউ তুলে শান্ত হ্রদে। মুহূর্তেই উল্টে যায় ছোট্ট বোটটি।

বোট থেকে ছিটকে পড়ে লিমা। ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচাতে হ্রদেই ঝাঁপ দেয় আলাউদ্দিন। শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দুজন দুজনকে। মিনিট দশেকের কালবৈশাখীর ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় আলাউদ্দিন-লিমার সুখের স্বপ্ন। তলিয়ে যায় হ্রদের অথৈই জলে। লাশ খুঁজতে নামে লোকজন। রাঙামাটির ফায়ার সার্ভিস ও কাপ্তাই নৌ-বাহিনীর ডুবুরিদের দুইদিনের নিরন্তর প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ২২মার্চ সকালে আলিঙ্গণরত আলাউদ্দিন-লিমার লাশ ভেসে ওঠে ডিসি বাংলোর অদূরে পলওয়েল পার্কের পাশেই। অবাক বিস্ময়ে সেদিন রাঙামাটিবাসী দেখেছিল ভালোবাসার এক অনন্য নজির। এই যেন লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট, রজকিনী-চণ্ডিদাসের প্রেমকাব্যকে হার মানিয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের সুবাদে দ্রুতই দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এই সংবাদ। সংবাদ মাধ্যমের সেইসব সংবাদ লাখো মানুষের ফেসবুকের ওয়ালেও জায়গা করে নেয়। রাঙামাটিতে বেড়াতে এসে কত শতই না দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোনও মৃত্যুই এতটা নাড়া দিতে পারেনি; যতটা নাড়া দিয়েছিল আলাউদ্দিন-লিমার আলিঙ্গনরত লাশ। এই নবদম্পতির ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্বরূপ আজকের লাভ পয়েন্ট। তবে এটির পেছনেও রয়েছে গল্প।

২০১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাঠকবহুল অনলাইন দৈনিক পাহাড় টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এ জেলার পর্যটন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিউজ করি। আর সেই নিউজ নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করলে দৃষ্টি পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরার। পোস্টের নিচে কমেন্টস করেন তিন জেলার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে দ্রুতই একটি সেমিনার করবেন। কথা দিয়েছেন; কথা মতো আয়োজনও করেছেন তিনি।

শত ব্যস্ততার মাঝে ভুলে যাননি। ওই বছরের ১৬ নভেম্বর তিন পার্বত্য জেলার জেলাপ্রশাসন ও জেলা পরিষদের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা’  শীর্ষক মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়। উঠে আসে নানা প্রস্তাবনা। প্রশাসনিক কর্তা-পর্যটন ব্যবসায়ী-লেখক-সংবাদকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন আয়োজনের উদ্যোক্তা ও উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা। দীর্ঘসময় ধরে চলা সেই মতবিনিময় সভায় পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা করেন দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড় টোয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদক ফজলে এলাহী। দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো এই সংবাদকর্মী নিজ অভিজ্ঞতা থেকে প্রস্তাব করেন লাভ পয়েন্টের। বিশ্বের কয়েকটি দেশেই রয়েছে লাভ পয়েন্ট। ভালোবাসার মানুষকে আজীবন আঁকড়ে রাখতে করা হয় এসব লাভ পয়েন্ট। যেখানে তারা তালা ঝুলিয়ে চাবি ছুঁড়ে ফেলে পানিতে। বন্ধন খোলার আর থাকে না কোনও উপায়। ব্যতিক্রমী এই আইডিয়া সবার মনে দাগ কাটে। কিভাবে কোন আদলে এবং কোথায় করা হবে এই লাভ পয়েন্ট। শুরু হয় ভাবনা। জানুয়ারিতে এই লাভ পয়েন্ট উদ্বোধনের দিন-তারিখও ঘোষণা করা হয়। এর মাঝেও চলে নানা কথাবার্তা, লাভ পয়েন্টের ডিজাইন নিয়েও আলোচনা হয় একাধিকবার। প্রথমে এটি পর্যটনের নতুন মোটেলের পেছনে করার প্রস্তাব করা হয়। সেই অনুযায়ী উদ্বোধনের জন্যও পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ আলাউদ্দিন-লিমা পর্যটন মোটেল থেকেই বোটে চড়েছিলেন। উদ্বোধনের আগে পর্যটন মোটেলে নাস্তা সারেন অতিথিবৃন্দ।

সঙ্গে ছিলাম আমরা কয়েকজন সংবাদকর্মী। চেয়ারম্যানকে নিজেই আগ বাড়িয়ে বুঝালাম এখানে লাভ পয়েন্ট হলে কেউ আসবে নামানুষের আগ্রহও থাকবে না। তাছাড়া যেহেতু আলাউদ্দিন-লিমার স্বরণে এই লাভ পয়েন্ট। সব কিছুর বিবেচনায় পলওয়েল পার্কেই লাভ পয়েন্ট হওয়াটা সমীচীন। কারণ আলাউদ্দিন-লিমার লাশও পলওয়েলের পাশেই ভেসে উঠেছিল। পাহাড়ের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা ও সবসময় চিন্তা করা বিচক্ষণ চেয়ারম্যানও আমার কথায় সায় দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিলেন স্থান পরিবর্তন ও পরিদর্শনের। সেখান থেকেই আমরা চলে আসলাম পলওয়েল পার্কে। চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরার নির্দেশে একদিনের মাথায় এখানে ভিত্তি বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৬ জানুয়ারি সকালে ডিসি বাংলো এলাকার পলওয়েল পার্কে আলাউদ্দিন-লিমার স্বরণে লাভ পয়েন্টের ভিত্তি বসান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা। চেয়ারম্যাননের আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় দ্রুতই এগোয় লাভ পয়েন্টের কাজ।

সঙ্গে সংযোজন করা হয় আলাউদ্দিন-লিমার মৃত্যুর করুণ কাহিনী। আর এটি পরিচিতি পায় রাঙামাটি ছাড়িয়ে সারা দেশে। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় লাভ পয়েন্ট। ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় স্বপ্নের লাভ পয়েন্ট। এখন কেউ বা চুপিসারে কেউ বা প্রিয়জনের হাত ধরে লাভ পয়েন্টে ঝুলিয়ে দিয়ে আসে তালা। আর চাবি ছুঁড়ে ফেলে হ্রদের জলে। এভাবেই ভালোবাসার মানুষটিকে আঁকড়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টায় থাকেন প্রিয় মানুষটি। বেঁচে থাকুক পৃথিবীর সকল ভালোবাসা। পূর্ণতা পাক আলাউদ্দিন-লিমার মতো অকৃত্রিম ভালোবাসা।

জেবি

RTVPLUS