logo
  • ঢাকা শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬

নদী খনন যেমন-তেমন, চলছে বালু বিক্রির ধুম

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি, আরটিভি অনলাইন
|  ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৭:৫৩
বালু ডেজ্রার নদী খনন
এভাবেই নদী খননের নামে ড্রেজার বসিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে বালু
বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি করে দীর্ঘ ১০ বছরে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার (নিউ ধলেশ্বরী-পুংলী-বংশাই-তুরাগ-বুড়িগঙ্গা রিভার সিস্টেম) প্রকল্পের কাজ হয়েছে খুব সামান্যই। এভাবে নদী খননের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। তারা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ১৪.৫ কিলোমিটার নদী খননের কাজ পেলেও সাব ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে অবাধে শতাধিক বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করে চলেছে। এ কারণে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছে এশিয়ান ড্রেজার লিমিটেড কোনোপ্রকার সাব ঠিকাদার নিয়োগ করতে পারবে না।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নদী খনন করে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করা, বুড়িগঙ্গা-তুরাগ রুটে সারা বছর নৌ-চলাচলের উপযোগী করাসহ সেচ ও মৎস্য উন্নয়নের জন্য নেয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ৯৪৪ কোটি নয় লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১০ সালে প্রকল্পটি নেয়ার পর তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ডিজাইন বদলাতে হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে তিন বছরের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে লাগতে পারে ১১ বছর। এছাড়া আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের এপ্রিলে নেয়া প্রকল্পটি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু দু’দফায় ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতেও কাজ না হওয়ায় সর্বশেষ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের সময় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ ঠিক করা হয়। এক্ষেত্রে মূল ডিপিপির তুলনায় ছয় বছর ছয় মাস বা ১৭৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ সময় বেশি লাগছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাও ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলছেন। নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১২৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

নদী খননের জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে আনা হয়েছে দুটি ড্রেজিং মেশিন। ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত মো. আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় আরটিভি অনলাইনের। তিনি জানান, দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে তিনিসহ ড্রেজিং কাজে নিয়োজিত আছেন ২০ জন। স্থানীয় এলাকাবাসীর কারণে তারা আড়াই বছরেও খনন কাজ শুরু করতে পারেননি। নদী খনন করতে গেলই স্থানীয় এলকাবাসীর বাধার মুখে পড়তে হয়। তাই বাধ্য হয়েই তারা খনন কাজ বন্ধ রেখেছেন।

তবে স্থানীয় আব্দুস সাত্তার খান নামে এক ব্যক্তি জানান, গত তিন বছর বেলুটিয়া এলাকায় পানি প্রবাহের মূল উৎসমুখ খনন করা হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে ভরাট হয়ে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ কারণে এ কাজে নিয়োজিতরা আবার অন্য জায়গায় খনন করতে শুরু করে। এতে করে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তা বন্ধ কের দেয়। তাদের দাবি জমি অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত এ এলাকায় নদী খনন করতে দেওয়া হবে না।

মোজাম মণ্ডল নামের একজন জানান, তার জমি অধিগ্রণ করা হয়েছে ৫২ হাজার টাকা মূল্যে। তার ৬০ খতিয়ানের ২১৬ দাগের ও ২৭ দাগের ৮০ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোনও জমির মূল্য পাননি। এ নিয়ে কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে কোনও লাভ হয়নি।

একই অভিযোগ দেলোয়ার হোসেনের। তিনি জানান, ২২৩ খতিয়ানের ৬৭০ দাগের ১১৯ শতাংশ জমি ৮৫ হাজার টাকা মূল্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তিনি শুনেছেন তার অধিগ্রহণের টাকা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে এসেছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন লাখে ১০ হাজার টাকা দিলে তাকে জমি অধিগ্রহণের চেক দেয়া হবে। পরে তিনি চেক না নিয়ে ফিরে আসেন।

একই অভিযোগ আ. আওয়াল প্রামানিকের। তিনি জানান, ৪২ খতিয়ানের ১০৮ শতাংশ জমি ৬০ হাজার টাকা দরে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তার কাছে লাখে সাত হাজার টাকা দাবি করেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নদী খননের কাজ টাঙ্গাইল অংশে দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে মির্জাপুর অংশে বঙ্গজ ড্রেজিং লিমিটেড এবং কালিহাতী অংশে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড। তবে নীতিমালায় উল্লেখ্য আছে নদী খননের কাজে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই নদী খনন করবেন এবং এতে কোনও প্রকার সাব ঠিকাদার বা নিষিদ্ধ বাংলা ড্রেজার ব্যবহার করা যাবে না। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম ছিল ভূমি অধিগ্রহণ, গাইড বাঁধ নির্মাণ, কায়িক পরিশ্রম ও ড্রেজারের মাধ্যমে নদী খনন, সেডিমেন্টবেসিন নির্মাণ ও সংরক্ষণ কাজ, ব্রিজের ফাউন্ডেশন ট্রিটমেন্ট এবং পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং করা।

এদিকে উপজেলার জোকারচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড একটি মাত্র ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদী খনন করছে। এ সময় ড্রেজিং-এর কাজে নিয়োজিত এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টাঙ্গাইলের কালিহাতী অংশে নদী খননের কাজ পেয়েছে এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড। কিন্তু তারা ‘মা’ এন্টারপ্রাইজকে নদী খননের জন্য সাব ঠিকাদার নিয়েছে। এতে করে সাব ঠিকাদাররা নদী খননের নামে শতাধিক বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলন করে চলেছে। আর এসব উত্তোলনকৃত বালু ও মাটি বিক্রি করে চলেছেন।

এদিকে নদী খননের নামে বাংলা ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ খনন করলে নদী পারের মানুষ আরও হুমকির মুখে পড়বে।

জোকারচর গ্রামের শেখ মো. আবুল হাশেম জানান, এখানে নদী খনন হচ্ছে নাতো সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম আরটিভি অনলাইনকে জানান, খনন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেড কোনোভাবেই সাব ঠিকাদার দিয়ে নদী খনন করতে পারবে না। তারা যদি সাব ঠিকাদার দিয়ে নদী খনন কাজ করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে, এশিয়ান ড্রেজিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম রেজার ব্যবহৃত মুঠোফোনে বারবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • দেশজুড়ে এর সর্বশেষ
  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়