logo
  • ঢাকা বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৬ ফাল্গুন ১৪২৬

সংবাদ সম্মেলনে স্ত্রীর দাবি

`রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বর্জন করা মুক্তিযোদ্ধার সেই চিঠিটি তার লেখা নয়’

দিনাজপুর প্রতিনিধি, আরটিভি অনলাইন
|  ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৫১ | আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:২৪
মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় সম্মান
সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় স্ত্রী মর্জিনা বেগমসহ পরিবারের সদস্যরা
দিনাজপুরের আলোচিত প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না নেওয়া বিষয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল তা তার লেখা নয়। ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় স্ত্রী মোছা. মর্জিনা বেগম সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন।

গতকাল সোমবার দুপুর ১২টায় দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ডাক বাংলোতে সংবাদ সম্মেলন করে ২৫ বছর সংসার জীবনের কথা তুলে ধরে নিজের সংসার ও জীবনের করুণ বাস্তবতা সাংবাদিকদের কাছে জানান তিনি।

প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় স্ত্রী মর্জিনা বেগমের পক্ষে তার ছেলে দশম শ্রেণির ছাত্র মো. মুছাদ্দেক হোসেন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।

লিখিত বক্তব্যে মর্জিনা বেগম জানান, আমি মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের তৃতীয় স্ত্রী মর্জিনা বেগম। আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে প্রকৃত সত্য ঘটনা প্রকাশ করছি।

মর্জিনা বেগম জানান, আমাদের বিয়ে হওয়ার পর ২৫ বছর ধরে আমরা দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ বাজারে বসবাস করে আসছি। আমার স্বামীও বোচাগঞ্জের বৈধ ভোটার। তিনি সুস্থ থাকা অবস্থায় একটি বিমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেই চাকরির টাকা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়েই আমাদের সংসার চলত। কিন্তু আমার স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর সেই চাকরিও চলে যায় এবং সামান্য মুক্তিযোদ্ধার ভাতা দিয়েই আমাদের সংসার কোনোরকম করে চলত। মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বৃদ্ধির আগে আমি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালিয়েছি।  আমি স্বামী-সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করেছি।

তিনি বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর পর জেনে অবাক হয়েছি যে, আমার স্বামী নাকি একটি চিঠি লিখে গেছেন। যেখানে বলে গেছেন, আমার মৃত্যুর পর তাকে যেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া না হয়! মৃত্যুর পর আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর ছেলেরা হাসপাতালে এসে আমার স্বামীর মৃতদেহ তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধার সব কাগজপত্র, ব্যাংকের চেক বইসহ যাবতীয় কাগজ তারা নিয়ে যায়। আমি এবং আমার দুই সন্তানকে নিয়ে যখন আমার স্বামীর গ্রামের বাড়ি যাই, তখন সবাই বলাবলি করলে আমি জানতে পারি যে, আমার স্বামী নাকি এই বিষয়ে চিঠি লিখে গেছেন। অথচ আমার স্বামী আমার সন্তানদের গর্ব করে বলতেন, আমার মৃত্যুর পর আমার জানাজার আগে আমাকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সম্মান জানাবে এবং আমার কফিনের ওপর বাংলাদেশের পতাকা দেওয়া হবে।

লিখিত বক্তব্যে মর্জিনা বেগম বলেন, যে ব্যক্তি প্রতিনিয়তই এমন কথা বলত, সেই ব্যক্তি মৃত্যুর পর সম্মাননা গ্রহণ করবেন না এটা আমার বিশ্বাস হয় না। এটা একটা ষড়যন্ত্র হতে পারে উল্লেখ করে বলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি এমন সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানাবেন না এটা মানতে পারছি না।

আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সন্তানের চাকরি কেড়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই আমাকে জানাতেন। কিন্তু আমার অসুস্থ স্বামী এরূপ কোনও কথা আমাকে বলেননি।

মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মর্জিনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে এবং তার ছেলেদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কোনও যোগাযোগ ছিল না। প্রথম স্ত্রীর সন্তান চাকরি হারিয়েছে এমন কোনও কথাও বলেনি, দুঃখও প্রকাশ করেনি।

প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা তার বাবার খোঁজ-খবর নিতেও কোনোদিন সেতাবগঞ্জ আসেনি।

 আমার স্বামী হাঁপানির রোগী ছিল। প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কিন্তু অসুস্থ  বাবার কোনও সংবাদ তারা নেয়নি।

---------------------------------------------------------------
আরো পড়ুন: এসপি-ডিআইজিকে দেওয়ার কথা বলে ওসির পরিচয়ে টাকা দাবি !
---------------------------------------------------------------

তিনি বলেন, আমার স্বামী গেল ২১ অক্টোবর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে আমি বোচাগঞ্চ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসক আমার স্বামীকে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। আমি অ্যাম্বুলেন্সে করে আমার স্বামীকে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালে আমি এবং আমার দুই সন্তান সবসময়  তার কাছে ছিলাম। এই সময় প্রথম পক্ষের কেউ তার সেবা-যত্ন করেনি। অথচ মৃত্যুর পর আমার সঙ্গে কোনও কথা না বলেই তারা গ্রামের বাড়ি নিয়ে আমার স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করে লাশ দাফন করেন।

মর্জিনা বেগম বলেন, যেদিন আমার স্বামীর কুলখানি হয় সেদিন আমাদের যেতে বলে এবং সেদিনই স্থানীয় এমপি, বিভাগীয় কমিশনার, দিনাজপুর জেলা প্রশাসকসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু প্রথম পক্ষের ছেলেরা আমাকে এবং আমার দুই সন্তানকে ঘরে বন্দি করে রাখে যাতে আমরা কারও সামনে গিয়ে কথা বলতে না পারি।

মর্জিনা বেগম চোখের পানি ফেলে বলেন, আমার স্বামীর মৃত্যুর আগে যাদের কোনও খবরই ছিল না তারাই আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমার স্বামীর মালিক হলো! আমার স্বামীকে দীর্ঘদিন ধরে সেবা-যত্ন করে আসছিলাম অথচ তার মৃত্যুর পর কোথায় জানাজা হবে, কোথায় কবর হবে, কখন কুলখানি হবে এসবের কোনও কিছুই আমাকে জানানো হলো না।

মর্জিনা বেগম দাবি করেন, প্রকাশিত চিঠি আমার স্বামীর লেখা নয়! হাসপাতালে যে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে তিনি জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন, সেখানে এত কথা বলার মতো বা লেখার মতো অবস্থা আমার স্বামীর কোনোভাবেই ছিল না। যে চিঠি নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এতো হইচই হচ্ছে সেই চিঠিটি আমার স্বামীর লেখা নয়। এটা কেউ অসৎ উদ্দেশে নিজ স্বার্থ হাসিল করার জন্য এমনটা করেছেন।

মর্জিনা বেগম স্বামীর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে বলেন, আমার স্বামীকে যারা রাষ্ট্রীয় সম্মাননা থেকে বঞ্চিত করল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিচার দাবি করছি। আমার স্বামীকে নিয়ে মিছিল-মিটিং হচ্ছে অথচ আমি স্বামীহারা হয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে আছি আমার খোঁজও কেউ করেনি। আমার স্বামীর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা যারা দিতে দিল না এবং আমার স্বামীকে চিকিৎসাসেবা হতে বঞ্চিত করল তাদের তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবি করছি। সেইসঙ্গে আমার সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে আমার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির জন্য সরকার এবং জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।

জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • দেশজুড়ে এর সর্বশেষ
  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়