• ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

রাতভর মাইকের আওয়াজ, ব্যহত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি
|  ১১ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:২৮
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর মন্দিরের আয়োজনে চলছে দোল পূর্ণিমার মেলা। গেল মাসের ২০ মার্চ দোল পূর্ণিমার দিন থেকে শুরু হয়েছে এ মেলা। গেল ২০ মার্চ থেকে এক এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৩ দিনের জন্য প্রশাসন অনুমতি দিলেও মেলা চলছে মাসব্যাপী।

whirpool
মন্দিরের সেবায়েত সূত্রে জানা যায়, মেলা কমিটি কোনও যাত্রা ও সার্কাসের অনুমতি না চাইলেও একটি যাত্রা ও একটি সার্কাসের অনুমতি স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিয়েছে এবং এই যাত্রা ও সার্কাস তারা থানা পুলিশ ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চালাচ্ছে।

এই যাত্রা ও সাকার্সে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মাইকের বিকট গানের শব্দে অশ্লীল নৃত্য, এতে করে লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে মেলার আশপাশের কয়েকটি গ্রামের এইচএসসি ও সমমান পরিক্ষার্থীসহ সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের। এছাড়াও অশ্লীল নাচ-গানের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন কিশোর, যুবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

মেলা এলাকার মধ্যেই রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল, মাদরাসাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এইসব প্রতিষ্ঠানের মাঠ দখল করে অসংখ্য দোকান দেওয়ায় প্রায় মাসব্যাপী কোনও খেলাধুলা করতে পারছে না ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র-ছাত্রীরা।

জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক সূত্র মতে প্রায় সাড়ে ৫০০ বছর আগে ১৪৯২ থেকে ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দের শাসক নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ গোপীনাথপুরে বেড়াতে আসেন। তখন এখানে নন্দিনী প্রিয়া নামে এক সাধকের আতিথিয়তায় মুগ্ধ হয়ে নবাব ওই সাধককে প্রায় ৬০৪ একর জমি লাখেরাজ দান করে দিয়ে যান। যার উৎস থেকে প্রতি বছর দোলযাত্রা ও মেলা উৎসব চলে আসছে। কিন্তু এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোক এই ঐতিহ্যকে নষ্ট করার চেষ্টা করছে এবং হিন্দু ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত হানছে।

মেলা উপলক্ষে আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ দর্শনার্থী আসেন এই মেলায়। শিশুদের খেলনা, পুতুল নাচ, মৃত্যুকুপ মোটরযান খেলা, হরেক রকমের মিঠাই-মণ্ডা আর নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর সব বাহারি দোকানের পসরা সাজিয়ে রাখেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দোকানি ও ব্যাবসায়ীরা। এতে করে মানুষের উপচে পরা ভিড় থাকে দিন-রাত। তাই অবিলম্বে এসব অশ্লীল যাত্রাপালা, সার্কাস ও পুতুল নাচ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা।

মেলার আশপাশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করে একাধিক শিক্ষার্থীরা জানান, মেয়েদের বিশেষ করে বেশি সমস্যা হচ্ছে। কারণ এ মেলায় আগত বখাটে ছেলেরা স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগামী ছাত্রীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করছে। এতে আমাদের বাবা-মা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসতে দিতে চাচ্ছে না। বিশেষ করে স্কুল ছুটি দিলে শিক্ষকরা আমাদের এগিয়ে দিচ্ছে। মেলার যাত্রা, সার্কাস ও পুতুল নাচের মাইকের শব্দে আমাদের পড়াশোনার সমস্যা হচ্ছে। আবার আমাদের স্কুলের মাঠে তারা চুলা তৈরি করে রান্না করছে। এতে এই রান্নার ধোঁয়া আমাদের ক্লাস রুমের ভেতরে ঢুকে খুবই অসুবিধার সৃষ্টি করছে।

গোপীনাথপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রুহুল আমীন বলেন, দিনের বেলা স্কুল সময়ে মাইকের গানের শব্দে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। আর আমাদের স্কুল মাঠের কোনও প্রাচীর নেই। যার জন্য মেলায় আসা দোকানদাররা এবার এ মাঠে এসে দোকান দিয়েছে। মাঠে চুলা তৈরি করে রান্না করা ছাড়াও যাতায়াতসহ বিভিন্ন কাজ করছে। ফলে আমাদের ব্যাপক সমস্যা তৈরি হয়েছে।

গোপীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, স্কুলের গেটে ও মাঠেই দোকান ও স্কুল প্রাঙ্গণেই মেলার লোকজন চলাচল করে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা-যাওয়া করতে নানা সমস্যা হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতায় অভিভাবকরা ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে আসতে দিতে চাচ্ছে না।

গোপীনাথপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আরজুমান্দ বানু বলেন, স্কুল মাঠ ফাঁকা হওয়ায় এখানে ট্রাক, ভুটভুটিসহ অনেক গাড়ি এসে ভিড় করছে। দিনের বেলা লোকজনের ভিড়ের কারণে মেয়েরা ব্যাপক সমস্যার মধ্যে পড়ছে।

মন্দিরের সেবায়েত ও মেলা মালিক রনেন্দ্র কৃষ্ণ প্রিয়া খোকন বলেন, গেল ২০ মার্চ থেকে এক এপ্রিল পর্যন্ত আমার মেলার অনুমতি ছিল। এ মেলা চলাকালীন সময়ে প্রশাসন যাত্রা, সার্কাসের অনুমতি দিয়েছে। আমি কোনও যাত্রা, সার্কাসের অনুমতি চাইনি। আর যেসব অবৈধ পুতুল নাচ ও অন্যান্যগুলো চলছে সেগুলোর কোনও অনুমতি নাই।

এ বিষয়ে আক্কেলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালাহ্উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি নিজে মেলায় গিয়ে অবৈধ অশ্লীল যাত্রাপালা, পুতুল নাচ ভেঙে দিয়েছি। এরপরও যদি আবার গড়ে ওঠে তাহলে আমি জরুরি ব্যবস্থা নেব।

জেলা পুলিশ সুপার রশীদুল হাসান বলেন, গোপীনাথপুর মেলা হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা। প্রতি বছর এ মেলা হয়ে থাকে। এ মেলায় যদি কোনও অশ্লীল নৃত্য বা কোনও অনিয়মের অভিযোগ আসে তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়