Mir cement
logo
  • ঢাকা রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮

মাল্টা চাষে ভাগ্য খুলছে অনেকের 

মাল্টা চাষে ভাগ্য খুলছে অনেকের 
মাল্টা চাষ

নরসিংদীতে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে মাল্টা চাষ। বিদেশি এই ফল চাষে ভাগ্য খুলছে অনেকের। তবে এই ফল ইউরোপের গন্ডি পেরিয়ে চাষ হচ্ছে নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলায়। হেক্টর প্রতি এক লাখের বেশি করে অর্থ উপার্জন হচ্ছে এই মাল্টা চাষে। অল্প পুঁজিতে লাভ অধিক লাভজনক হওয়ায় মাল্টার বাণিজ্যিক আবাদের দিকে ঝুঁকছে বেকার যুবক ও কৃষকরা।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, নরসিংদীতে লেবুজাতীয় ফলগুলো ভালো ফলন হয়। এই মাটি লেবু জাতীয় ফসলের জন্য উপযোগী। সেই চিন্তা ভাবনা থেকে ২০১১ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়ে ২০১৩ সালে সাফল্য পেয়ে ২০১৬ সাল থেকে প্রথম মাল্টা আবাদ শুরু হয়েছে। এই এলাকায় বারি মাল্টা-১ চাষ সম্প্রসারণে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। খরচ ও পরিশ্রম কম হওয়ায় ফলটি অত্যন্ত লাভজনক। প্রতি বিঘা জমিতে ১০০ থেকে ১২০টি মাল্টা চারা রোপন করে একটানা ২০ বছর ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রতিটা গাছ থেকে প্রথম বছর ১০ থেকে ২০ কেজি হারে ফল পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় বছর থেকে গড়ে এক মণের বেশি ফল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত চারা রোপণের দুই বছর পর গাছ থেকে ফল পাওয়া যায়।

জেলায় এ বছর ৫৩ হেক্টর জমিতে মাল্টার আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে শিবপুর, রায়পুরা, বেলাবো ও মনোহরদী এই চার উপজেলায় মাল্টার ভালো ফলন পাচ্ছে চাষিরা। আগামীতে মাল্টা চাষের আরও পরিধি বাড়াতে উপজেলা কৃষি অফিস ও নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস মনিটরিং ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন মাল্টা চাষিদের ।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সাইট্রাস ফসলের মধ্যে মাল্টা অন্যতম জনপ্রিয় ফল। বিশ্বের সর্বমোট উৎপাদিত সাইট্রাস ফসলের দুই তৃতীয়াংশ হলো মাল্টা। ভিয়েতনাম, উত্তর পশ্চিম ভারত ও দক্ষিণ চীন মাল্টার আদি উৎপত্তি স্থল। তবে বর্তমানে এই ফলটি বিশ্বের উষ্ণ ও অব–উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকায় বেশি চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশে এই ফলটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং দিন দিন এর চাষ বেড়ে চলছে। কমলার তুলনায় এর অভিযোজন ক্ষমতা বেশি হওয়ায়, পাহাড়ি এলাকার ফলটি বর্তমানে নরসিংদী লাল মাটি এলাকায় সহজেই চাষ করা যাচ্ছে। এখানকার কৃষকরা মাল্টা চাষ করে সফল হচ্ছেন। এই এলাকার মাল্টা মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, শিবপুর উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের বিরাজনগর গ্রামের কৃষক ইউসুফ মিয়ার বাগানে একশ গাছে ঝুলছে মাল্টা।

কৃষক ইউসুফ মিয়া আরটিভি নিউজকে বলেন, দীর্ঘ সতেরো বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০১৭ সালে প্রবাস থেকে দেশে এসে বেকার হয়ে পড়েন। তখন তিনি নিজের জমিতে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৪০ শতক জমিতে ১০০ মাল্টার চারা লাগান।

তিনি আরটিভি নিউজকে আরও বলেন, প্রথম বছরে অল্প ফলন আসলেও বর্তমানে প্রতিটি মাল্টা গাছে ২৫০ থেকে ৩০০টি করে মাল্টার ফলন ধরেছে। বাগানের মাল্টার উপযোগী ফলন আনতে প্রতিটি গাছের পিছনে দিয়েছেন বাড়তি পরিচর্যা। বাগান করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এই বছর ইতিমধ্যে তার এ বাগান থেকে ৪০থেকে ৪৫ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রিও করেছেন এবং আরও ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা মাল্টা বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন। তার এই বাগান দেখে স্থানীয় অনেক কৃষক মাল্টা চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বলে জানান তিনি।

মাল্টা চাষি ফোরকান আহমেদ আরটিভি নিউজকে বলেন, এক সময় বেকার ছিলাম, সবার দেখাদেখি আমি আমার বাড়িতে মাল্টা চাষ করেছি। মাল্টা চাষ করে অনেক লাভবান ও স্বাবলম্বী হচ্ছি। যদি আমার মতো আশেপাশে যারা বেকার রয়েছে তারা সকলে যদি অল্প অল্প করে মাল্টা চাষ করে তাহলে আমাদের দেশে যে বেকারত্ব রয়েছে তা একটু হলেও ঘুচবে। সবাই যদি মাল্টা চাষের প্রতি আগ্রহী হই তাহলে বিদেশি মাল্টা আর আমদানি করতে হবে না। আমাদের দেশের সবুজ মাল্টা দিয়ে একদিন চাহিদা মেটানো যাবে।

মাল্টা চাষি মো. আবুল হোসেন আরটিভি নিউজকে বলেন, আমার বাগানে

১২০টা মাল্টার গাছ আছে। এই বাগান করতে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম বছর যখন ফল আসে তখন ১৫ হাজার টাকার মাল্টা বিক্রি করি। এবার বাগানে প্রতিটি গাছে প্রচুর ফল ধরেছে। আশা করি এবার ৬০ থেকে ৭০ টাকা বিক্রি করতে পারবো। এই মাল্টা চাষ করে আমরা অনেক লাভবান। বাজারে এই ফল ১৮০ টাকা করে বিক্রি করে। অনেক পাইকার ফল কেনার জন্য যোগাযোগ করে বাগানে এসে ১৫০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা করে ক্রয় করেন।

মাল্টা চাষি নিলুফা ইয়াছমিন আরটিভি নিউজকে বলেন, আমার বাগানে মাল্টা ৫ থেকে ৬টায় এক কেজি হয়। একটা গাছে ২৫০ থেকে ৩০০ মাল্টা আসে। এই ফল ১৫০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা করে বিক্রি করা যায়।

আমাদেরকে বাজারে যেতে হয় না। বেপারীরা বাড়ি থেকে ফল কিনে নিয়ে যায়।

মাল্টা চাষি মো. সুলতান মিয়া আরটিভি নিউজকে বলেন, হলুদ মাল্টা একটা বিদেশি ফল। এই মাল্টায় বিষাক্ত ঔষধ দেওয়া হয়। আমাদের দেশের সবুজ মাল্টা যখন খাওয়ার উপযুক্ত হয় তখন আমরা কোন বিষাক্ত ঔষধ দিই না। এই জন্য সবুজ মাল্টা খুব চাহিদা। নরসিংদীর আশেপাশে জেলার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে পাইকাররা বাগানে এসে ফল কিনে নেয়।

এই মাল্টা সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় চাহিদা অনেক ভাল এবং পরিশ্রম কম। অল্প খরচ হওয়ায় আমরা খুব লাভবান। এই মিলে যদি বাগানে ফলন আসে তাহলে আগামীতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে দেশের বাহিরেও দিতে পারবো।

নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষন কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ আরটিভি নিউজকে বলেন, নরসিংদীতে এই মৌসুমে ৫৩ হেক্টর জমিতে বারি-১ জাতের মাল্টা চাষ করা হচ্ছে।

শিবপুর, রায়পুরা, বেলাবো ও মনোহরদী এই চার উপজেলায় মাল্টার ভালো ফলন পাচ্ছে চাষীরা। আমরা ভিয়েতনাম জাতের একটা মাল্টা সারা বছর ফলন আসে। সেইটাও আমরা অনেক বাগানে রোপন করতে দিয়েছে যাতে সারা বছর উৎপাদন হয়। আর এই মাল্টা উৎপাদন হলে বিদেশ থেকে যে কোটি টাকার মাল্টা আমদানি করতে হয় সে আমদানি নির্ভর কমে আসবে। এছাড়া প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ১২ মেট্রিক টন ফল ওঠার আশা রাখছে কৃষিবিভাগ।

এমআই

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS