Mir cement
logo
  • ঢাকা সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৫ আশ্বিন ১৪২৮

হাতিয়ার চরের ভূমিহীনদের একমাত্র ভরসা গ্রাম্য ডাক্তার 

হাতিয়ার চরের ভূমিহীনদের একমাত্র ভরসা গ্রাম্য ডাক্তার 
ভূমিহীনদের একমাত্র ভরসা গ্রাম্য ডাক্তার 

গ্রামের চৌকিদার হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী স্বপ্না বেগম (৪৫)। অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ হয়ে দুইমাস পর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও নদী উত্তাল থাকায় তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। অবস্থার অবনতি হলে প্রতিবেশিরা গ্রাম্য ডাক্তারকে সংবাদ দিয়েছিল। কিন্তু অস্বাভাবিক জোয়ারে পথঘাট ডুবে যাওয়ায় গ্রাম্য ডাক্তার সঠিক সময়ে আসতে পারেনি। দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্য হয় স্বপ্না বেগমের। অনেকটা বিনা চিকিৎসায় গত ১৫দিন আগে স্বপ্না বেগমের মৃত্যু হয়েছে। পরে প্রতিবেশিরা চাঁদা তুলে মৃত স্বপ্নার দাপন সম্পন্ন করা হয়।

দুই সন্তান নিয়ে স্বপ্না বসবাস করতেন নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরগাসিয়ায়। স্বামী গ্রাম চৌকিদার হেলাল আরও একটি বিয়ে করে বসবাস করেন মূল ভূখণ্ডের সাথে বয়ারচরে। স্বপ্নার প্রতিবেশি চরগাসিয়ার রসূলপুর গ্রামের বৃদ্ধা মোস্তাফিজ মিয়া (৭৫) চরের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি আরটিভি নিউজের সাথে এসব মন্তব্য করেন।

মোস্তাফিজ মিয়ার সাথে দেখা হয় চরগাসিয়া সূর্যমুখী আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাঠে। তার সাথে থাকা একই গ্রামের কৃষক জসিম উদ্দিন (৪৮) আরটিভি নিউজকে বলেন, ১৫ থেকে ২০ দিন আগে নিজের পালিত ষাঁড় শিং দিয়ে আঘাত করে জনতাবাজারের পাশে বসবাস করা শাহেনা বেগম (৪০) কে।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলে নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে তাকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নোয়াখালী জেলা সদরে পাঠানো হয়। হাতিয়া থেকে জেলা সদরে নেওয়ার পথে নদীতে স্প্রিটবোডে তার মৃত্যু হয়। চরে ভালো চিকিৎসা দিতে পারলে হয়তো শাহেনার মৃত্যু হতো না বলে জানান কৃষক জসিম উদ্দিন।

স্বপ্না, শাহেনার মত বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর অসংখ্য ঘটনা রয়েছে চরগাসিয়ায় চরে। কারণ এখানে উন্নত স্বাস্থ্যসেবার কিছুই নেই। চরে বসবাস করা প্রায় ৮ হাজার পরিবারের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র অবলম্বন ৬জন পল্লী চিকিৎসক। এর মধ্যে তিনজন রোগী দেখেন চরগাসিয়ার দক্ষিন পাশে জনতা বাজারে । আর তিনজন থাকেন উত্তর পাশে বারআওলিয়া বাজারে।

স্থানীয়রা আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, এসব পল্লী চিকিৎসকদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ঔষধ দোকানের মালিক থেকে তারা পল্লী চিকিৎসক হয়েছেন। এদের মধ্যে একজন জনতাবাজারের ঔষধ দোকানদার রিয়াজ উদ্দিন। রিয়াজ পেশায় পশু ডাক্তার হলেও গত দুই বছর ধরে তিনি চরে বসবাসকারী মানুষদেরকেও ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। এসব পল্লী চিকিৎসকরা চরে বসবাস করা নারী পুরুষ সবার যেকোনও জটিল রোগে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে ছেলেদের খতনার মতো চোট চোট অপারেশনও করে থাকেন তারা।

আলাপকালে জনতাবাজারের পল্লী চিকিৎসক মানিক (৪৫) আরটিভি নিউজকে বলেন, আমরা চরে বসবাস করা মানুষদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি। জটিল কোনো রোগী এলে চেয়ারম্যানঘাট ও হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

চরগাসিয়া সূর্যমুখী আশ্রয়ণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের সাথে জড়িত থাকা তৌয়মুর হোসেন নামে একজন আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, এই চরের সাথে হাতিয়া মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থা হলো নদী পথে। প্রতিদিন একটি ট্রলার সকালে আসে বিকেলে চলে যায়। তাই এই চরের মানুষদের ছোট বড় সকল রোগে স্থানীয় এসব চিকিৎসকের উপর ভরসা করতে হয়। আমরা যারা এই চরে থাকি আমরা কোনো সমস্যা হলে মোবাইলে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারদের সাথে কথা বলে একটা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ঐষধ কিনে থাকি। তবে চরে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। তাই যে কেউ যেকোনও সময় চাইলেও এই সুবিধাটা নিতে পারেনি।

এই ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার নাজিম উদ্দিন আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, আমাদের চিন্তাভাবনা আছে চরগাসিয়াতে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক করার। কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে প্রস্তাব চাইলে আমরা কাগজপত্রসহ এই চরের জন্য দুটি ক্লিনিক করার প্রস্তাব পাঠাবো।

নতুন জেগে উঠা এই গাসিয়ার চর উত্তর-দক্ষিনে আট কিলোমিটার ও পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় চার কিলোমিটার। হাতিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নদীভাঙ্গা প্রায় আট হাজার পরিবার বসবাস করছে এই চরে।

এমআই

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS