logo
  • ঢাকা সোমবার, ০৮ মার্চ ২০২১, ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭

যশোরে ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন চান অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী!

নির্বাচন×প্রার্থী×ইলেকশন×কমিশন×পরিষদ×পৌরসভা×চূড়ান্ত×যশোর×
ছবি সংগৃহীত

যশোরের চৌগাছায় পৌর নির্বাচনের আমেজ শেষ না হতেই ইউনিয়ন নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে থেকে প্রচারণা শুরু হলেও সম্প্রতি বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রার্থীদের প্রচারণা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।উপজেলাতে ১১টি ইউনিয়নে এবার আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রায় ৪০ জনের বেশি প্রার্থী দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এই দৌড়ঝাঁপের মধ্যে গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থীদের পাশাপাশি আছে অনেক নতুন মুখ এমনকি পুলিশের খাতার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও।

মে মাসের মাঝামাঝি দেশজুড়ে বড় পরিসরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোট শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা।

১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে নির্বাচন কমিশন বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) নতুন কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ ও নতুন সদস্যদের বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।

সিইসি বলেন, এপ্রিলের ৭ তারিখে আরেকটি পৌরসভা নির্বাচন হবে। একইসঙ্গে কিছু ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হবে। এজন্য ১৭ ফেব্রুয়ারি কমিশন সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত হবে, কয়টি পৌরসভা ও ইউপিতে ভোট করা যায় তা পর্যালোচনা করা হবে। তবে রমজানে নির্বাচন হবে না। মার্চ মাসে কোনও নির্বাচন হবে না। এক মাস আমাদের ছুটিতে যেতে হবে। কারণ আমাদের ভোটার লিস্ট তৈরি করা, সেটা চূড়ান্ত করা, তালিকার সিডি করে প্রার্থীদের দিতে হবে; এ সকল কাজে সময়টা চলে যাবে।

উপজেলার স্থানীয় নেতাদের মতে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ বা আগে পরে চৌগাছা উপজেলার ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন হতে পারে। ২০১৬ সালের চার জুন এ উপজেলার ইউনিয়ন নির্বাচন হয়েছিল। জনপ্রিয়তা যাচাই এবং স্থানীয় রাজনীতি ও গ্রপিংয়ের কারণে এবার ১১টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রত্যাশী একাধিক। গতবারের বিদ্রোহী প্রর্থিীদের নাম মনোনয়নের জন্য পাঠানো হবে কিনা প্রশ্নের উত্তরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এসএম হাবিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী বলেন, দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুয়ায়ী কাজ করা হবে। তবে এখনও কেন্দ্র থেকে কোনও নির্দেশনা আসেনি বলেও জানিয়েছেন তারা।

ইতোমধ্যে কিছ কিছু ইউনিয়নে দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত বলেই মনে করছেন ইউনিয়নবাসী।

তবে যে সকল ইউনিয়নে ইউনিয়নবাসী এবং দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের পছন্দের প্রার্থীদের পছন্দ করে ভোটের অপেক্ষায় আছেন সে সংখ্যা মাত্র ৩-৪টি। সেগুলো হচ্ছে ১ নম্বর ফুলসারা ইউনিয়ন। গতবার এ ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছিলেন মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম চৌধুরীর বড় ছেলে এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী। মাসুদ চৌধুরী দীর্ঘ ২৮ বছর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারও তিনি নৌকা প্রতীক প্রত্যাশী। এ ইউনিয়নে এবার দলীয় মনোনয়ন চাইছেন উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য প্রভাষক হারুর অর রশিদ।

অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ফুলপাশাপোল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম মহাসিন মিয়ার ভাইপো ও সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার শাহাজাহান কবিরের ছেলে সাবেক ছাত্রনেতা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোহেল এই উনিয়নের শক্ত প্রার্থী। সর্বোচ্চ শিক্ষিত, সদালাপি এই নেতার নামটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় সর্বাধিক জনপ্রিয় বলে দাবি করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

দুই নম্বর পাশাপোল ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাষক অবায়দুল ইসলাম সবুজ। পাশাপোল ইউনিয়নের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য অবায়দুল ইসলাম সবুজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অন্য কাউকেই তালিকায় নিতে রাজি না ইউনিয়নবাসী। তারপরেও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন এই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতলেব, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম। এছাড়াও আছেন মনোনয়ন চাইবেন এই ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকে প্রথম নির্বাচিত জনপ্রিয় চেয়ারম্যান কাশেম হত্যার প্রধান আসামি সাবেক চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান শাহীন।

৩ নম্বর সিংহঝুলি ইউনিয়নে মনোনয়ন প্রত্যাশী ও প্রচারণায় আছেন সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক রেজাউর রহমান রেন্দু। তিনি শহীদ জিল্লুর রহমান মিন্টুর আপন ভাই। ২০১১ সালে যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শহীদ জিল্লুর রহমান মিন্টু এই ইউনিয়নের সর্বাধিক ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৩ সালে তারই ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পাঁচটি হত্যা, অস্ত্র ও নারী নির্যাতনসহ একাধিক মামলার আসামি শামীম কবির ওরফে কিলার শামীম জনসন্মুখে জিল্লুর রহমান মিন্টুকে গুলি করে হত্যা করে। সেই কিলার শামীমও এবার দলীয় মনোনয়নের জন্য প্রচারণায় আছেন। মনোনয়ন দৌড়ে আরও আছেন উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য দেওয়ান আনিছুর রহমান, ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস সামাদ, হামিদ মল্লিক এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান টিয়া।

গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থী ইব্রাহিম খলিল বাদলও এবার দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।

চার নম্বর ধূলিয়ানী ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন চাইছেন গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থী মমিনুর রহমান। এই ইউনিয়নে মনোয়ন দৌড়ে এগিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন। মনোনয়ন চাইবেন ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি মাস্টার আলিম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য মাস্টার ফারুক হোসেন, উপজেলা যুব মহিলা লীগের সহ-সভাপতি রিপা খাতুনসহ আরও ৩-৪ জন।

৫ নম্বর চৌগাছা ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম। ইতোমধ্যে ইউনিয়নে শক্ত ও মজবুত অবস্থান তৈরি করেছেন সাবেক ছাত্র নেতা শামীম রেজা। আওয়ামী লীগ নেতা আওরঙ্গজেব চুন্নুর ছেলে শামীম রেজা শিক্ষিত ও সাংগঠনিক ছেলে হিসেবে বিশেষ করে তরুন ও যুবকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। তাই এই ইউনিয়নে মনোনয়ন যুদ্ধটি শেষ মেষ এই দুজনের মধ্যেই হবে বলে মনে করছেন ইউনিয়নবাসী।

ছয় নম্বর জগদিশপুরে চাচা ভাইপোসহ পাঁচজন দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ ইউনিয়নের উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক তবিবুর রহমান খান নৌকা প্রতীকের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। শুধু এবার না গতবারও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মনোনয়ন দৌড়ে ছিলেন তারই আপন ভাইপো উপজেলা যুবলীগের সদস্য আজাদুর রহমান খান। মনোনয়ন চাইবেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান মাষ্টার সিরাজুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক আব্দুল কাদের।

সাত নম্বর পাতিবিলা ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন দৌড়ে আছেন তিনজন। সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিয়া এবারও দলীয় মনোনয়ন প্রার্থী। কিন্তু তার বিপক্ষে মনোনয়ন দৌড়ে ও জনপ্রিয়তাই শক্ত অবস্থানে আছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা এমএ জাফর।

আট নম্বর হাকিমপুর ইউনিয়ন সবসময়ই বিএনপির দখলে। স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের গ্রুপিং ও এই ইউনিয়নের বিএনপির প্রার্থীর প্রতি সহমর্মিতার কারণে কোনও সময়ই সুবিধা করতে পারিনি আওয়ামী লীগ। গতবারের নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান। তিনিও এবার নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে এবার এ ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন কবির এবং আওয়ামী লীগ নেতা ডেভিড দলীয় জনপ্রিয়তায় শক্ত প্রার্থী। এদের মধ্যে কেউ একজন নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেলেই হাকিমপুর ইউনিয়নকে বিএনপির কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করছেন হাকিমপুর ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। এ ইউনিয়নে আরও মনোনয়ন প্রার্থীরা হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মাস্টার তসলিমুর রহমান ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা প্রভাষক রফিকুল ইসলাম।

৯ নং স্বরুপদা ইউনিয়নে মনোনয়ন চাইছেন ৭জন। তবে ১৯৭৮ সালে চৌগাছা উপজেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল কদর এবং আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মাহাবুবুল আলম রিংকু আছেন স্থানীয়দের পছন্দের তালিকায়। নুরুল কদর বেশ কিছুদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতে শেষে গতবছর আবারও তার পুরানো ঠিকানা আওয়ামী লীগের ফিরে এসেছেন। এবং রিংকু তরুণ, যুবক ও মুরব্বিদের পছন্দের প্রার্থী। পাশাপাশি মনোনয় দৌড়ে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক ও গতবারের নৌকা প্রতীক পেয়ে পরাজিত সানোয়ার হোসেন বকুল, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলাইমান হোসেন এবং উপজেলা যুবলীগের সদস্য প্রভাষক টিটো এবং গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার শেখ ।

১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়নে আছেন সাতজন। নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদিন মুকুল শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। তবুও তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। সেইসঙ্গে সাথে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ও প্রেসক্লাব চৌগাছার সম্পাদক প্রভাষক অমেদুল ইসলাম। এ ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহ আলম সরকার, উপজেলা যুবলীগের সদস্য এবং এই ইউনিয়নের নির্বাচীত মেম্বর মিলন, গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থী বিদ্যুত, যুবলীগ কর্মী শাহীনুল কবির শাহিন, ইউসুফ আলী এবং শাকিব হোসেন।

১১ নম্বর সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে মনোনয়ন প্রত্যাশী চারজন। গতবারের নৌকা প্রতীক পেয়ে পরাজিত হয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা চাঁদনী। মনোনয়ন চাইবেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলাইমান হোসেন, মাস্টার নুর ইসলাম ও গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থী তোতা মিয়া। এই ইউনিয়নে এবার দলীয় মনোনয়ন চাইবেন যশোর জেলা পরিষদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হবিবর রহমান।

মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে নৌকা প্রতীক যেই পাবেন তার সঙ্গে প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই বিএনপির সঙ্গে ভোট যুদ্ধ হবে। তবে যদি বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকে সেক্ষেত্রে একমাত্র হাকিমপুর ইউনিয়ন ছাড়া নৌকা প্রতীকের বিপরীতে চেয়ারম্যান হওয়ার মতো অন্য দলের কোনও প্রার্থী নেই বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।

জেবি

RTV Drama
RTVPLUS