logo
  • ঢাকা রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

লালমনিরহাটে হত্যার পর লাশ পোড়ানোর ঘটনায় যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত

After the killing in Lalmonirhat, the operation of the joint, rtv news
লালমনিরহাট

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে কুরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে গেলো বৃহস্পতিবার রাতে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করার পর তার মরদেহ পেট্রোল দিয়ে আগুনে পোড়ানোর ঘটনায় গতকাল শুক্রবার সকালে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

লমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর কর্তৃক গঠিত এ কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) টিএমএ মমিন। তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল হাসান ও পাটগ্রাম উপজেলার ইউএনও কামরুন নাহার।

তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

ঘটনাটির ছায়া তদন্ত করছেন রংপুর -১৩ র‌্যাব বলে জানা গেছে। এদিকে, লোমহর্ষক বেদনাদায়ক এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেলে পাটগ্রাম থানায় একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।

সকালে পোড়া লাশটি উদ্ধার করে থানায় নেন পুলিশ। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ যৌথ বাহিনীর অভিযান ও বুড়িমারীতে টহল জোরদার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় মসজিদের ঈমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ কয়েকজনকে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেন এমন খবর জানা গেছে।

শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দু’জন অপরিচিত লোক আসরের নামাজ আদায় করেন।

আসরের নামাজের জামায়াত শেষ হওয়ার পর তারা মসজিদের সামনে গিয়ে মোটরসাইকেল থামান। সেসময় মুসুল্লিবৃন্দ চলে যাচ্ছেন। অপরিচিত লোক দু’জন মসজিদের ঈমাম সাহেবের সঙ্গে করমর্দন করেন।

এরপর তারা নামাজের জন্য মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করেন। জামায়াতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেননি এমন আরও কয়েকজন মুসুল্লি নামাজ আদায় করে যে যার মতো চলে যান। রংপুর থেকে আগত অজ্ঞাত ওই দুজন লোক নামাজ আদায় করার পর মসজিদের খাদেম জোবেদ আলীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

এরই মধ্যে একজন মসজিদের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ান। অপরজন মসজিদের ভেতরে কথা বলতে বলতে খাদেমকে বলেন মসজিদের সানসেট তাকগুলোতে অবৈধ অস্ত্র আছে কিনা?

এ সময় নিজেকে গোয়েন্দা র্যাব সদস্য পরিচয় দেন বলে খাদেম দাবি করে বলেন, কথাবার্তায় অসংলগ্ন লোকটা তাকগুলোতে হাত দিতে গিয়ে কুরআন শুরিফ ও হাদিসের কপি ছাড়া আর কিছুই যখন পাননি তখন একেবারে শীর্ষে মাথার ওপরে থাকা কুরআন শরিফটিতে হাত দিতে গেলে কোনও একটা ধর্মগ্রন্থ হাত ফসকে পরে যায়। সেটি তুলে সেই লোক চুমুও খান বলে জানা গেছ। এরই মধ্যে কোনও এক ব্যক্তি কুরআন শরিফ অবমাননার কথা তুলেন। অথচ এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। ধর্ম নিয়ে কোনও কথাই উঠেনি বলে দাবি করলেন মসজিদের খাদেম জোবেদ আলী।

এদিকে মসজিদের ভেতরে কেন কারা চেক করে, কোথা থেকে এসেছে, এক কথায় দুই কথায় ৪-৫ জনের মধ্যে বিতর্ক বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। গুজব উঠে কুরআন অবমাননা করেছেন অপরিচিত সেই দুজন লোক।

মসজিদের পাশের এক ডেকোরেটর দোকানদার হোসেন আলী নাকি লোক দু’জনকে মারতে মারতে ইউনিয়ন পরিষদের দিকে নিয়ে যান এমন তথ্য দেন খাদেম জোবেদ আলী।

তিনি আরও বলেন, এরপর ইউপি সদস্য হাফিজুল হকসহ অনেকে এ ঘটনায় জড়িয়ে পরেন।

কুরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে পরলে পরিষদে আটক ওই দুই ব্যক্তির মোটরসাইকেলটিতে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেন। খবর পেয়ে হাজার হাজার উৎসুক জনতা ওই লোক দুইজনকে মারতে তেড়ে আসেন। কেউ পরিস্থিতি সামলাতে পারছেন না। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল ও ইউএনও কামরুন নাহার বুড়িমারীতে সোলার স্টিট ও বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শনে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে ভিড় দেখে সেখানে ছুটে যান। বারংবার চেষ্টা করেও উত্তেজিত জনতাকে থামাতে পারেননি চেয়ারম্যান ও ইউএনও।

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কুমার মহন্ত আরটিভি নিউজকে বলেন, তিনি জনতার কাতার ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখেন এক রুমে দু’জন লোককে আটকে রাখা ছিল। একজন পুলিশ সদস্য তাদের সঙ্গে ছিল। আরেক রুমে উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, বুড়িমারী চেয়ারম্যান মেম্বর কোনোভাবেই লোকজনকে বুঝানো যাচ্ছে না। লোক দু’জনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে রুম থেকে বের করে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে ইট-পাটকেল ও ঢিল মারতে শুরু করেন জনগণ। এ সময় ওসিসহ অনেকে আহত হন। দুই জন ব্যক্তির মধ্যে শেখ সুলতান নামে একজনকে কোনোভাবে রুম থেকে বের করে ইউপি ভবনের ছাদের ওপরে নিয়ে যান ওসি। সেখানেও ঢিল মারতে থাকেন জনগণ।

এরপর জনগণের ভয়ে ইউপি ভবনের একটা টিনের বেড়া খুলে নিশাত চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় একজনকে বের করা গেলেও ভবনের কেচি গেট ও দরজা জানালা ভেঙে আরেকজনকে গণপিটুনি শুরু করে। গণপিটুনিতে লোকটার মৃত্যু হলেও মরদেহকে আবারও বেদম মারপিট করেন উত্তেজিত জনতা।

একপর্যায়ে টেনে হেঁচড়ে মরদেহটি মহাসড়কে তুলে পেট্রোল দিয়ে আগুন পুড়িয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন তারা।তারা এ সময় আল্লাহ আকবর বলে স্লোগান দেন।

আজ জানা গেছে, রংপুর নগরীর শালবন এলাকার বেগম রোকেয়া স্মরণির নবী ভিলায় বসবাসরত আবু ইউনুছ মো. সহিদুন্নবী জুয়েল সেই হতভাগা ব্যক্তি যাকে পিটিয়ে হত্যা করার পর তার মরদেহ পোড়ানো হয়। অপরজনকে পুলিশ উদ্ধার করেন। তিনি মুন্সিপাড়া এলাকার শেখ সুলতান। বাবার নাম শেখ আব্বাস।

বর্তমানে তিনি রমেকে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। গেলো বৃহস্পতিবার রাতে হত্যা মামলা করা হয়েছে এবং গতকাল শুক্রবার আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জেবি

RTVPLUS