logo
  • ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ আশ্বিন ১৪২৭

অবৈধ বালু বাণিজ্যের হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

  পাবনা প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

|  ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৮:৪৯ | আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৯:৩২
After lifting the sand, the sand eaters have piled it up
বালু উত্তোলনের পর স্তুূপ করে রেখেছে বালুখেকোরা
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাবনায় সুজানগর, বেড়া, ঈশ্বরদী এবং সদর উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। সুজানগর ও পাবনা সদর উপজেলার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে পদ্মা নদী থেকে কোটি কোটি টাকার এই বালু বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙনের ফলে পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ি, বসতভিটা, হাটবাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ শত শত বিঘা কৃষি জমি। সরকারিভাবে বালু উত্তোলন নিষেধ থাকলেও প্রভাবশালী মহল সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবাধে এই বালু উত্তোলন এবং কোটি কোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য করে যাচ্ছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে দু’একটি লোক দেখানো অভিযান চালানো হলেও অভিযানের একদিন বা দু’দিন পরই তারা আবারও একইভাবে বালু উত্তোলন চালিয়ে যেতে থাকে। বালু সন্ত্রাসীদের কবল থেকে ঘরবাড়ি বসতভিটা ও কৃষি জমি রক্ষার দাবিতে এলাকায় বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন এলাকাবাসী।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে সুজানগর উপজেলার বিশ্বনাথপুরে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধনসহ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল ক্ষতিগ্রস্তরা । তবে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ার কারণে সেটা বাতিল করা হয়।

---------------------------------------------------------------
আরও পড়ুন: সিনহা হত্যা: কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে আসামি অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন খারিজ
---------------------------------------------------------------

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার সুজানগর, পাবনা সদর, ঈশ্বরদী এবং বেড়া উপজেলার ২৪টি পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সুজানগর উপজেলার সাতবাড়ীয়া ইউনিয়ন থেকে নাজিরগঞ্জের হাসামপুর পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার এলাকায় শতাধিক ড্রেজার দিয়ে অবাধে বালু তোলা হচ্ছে। নদীজুড়ে চায়না ড্রেজার আর ড্রেজার। শুধুমাত্র নাজিরগঞ্জেই ৩২টি চায়না ড্রেজার কাটার দিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। আর অবৈধভাবে যত্রতত্র বালু উত্তোলন করে স্তূপাকারে রাখায় অত্রাঞ্চলে পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এতে কৃষকরা যেমন ফসলি জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তেমনি সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

পদ্মা নদী তীরবর্তী সুজানগর পৌরসভার চরভবানীপুর, চরসুজানগর, হাজারবিঘা, ভাঁয়না ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, চরবিশ্বনাথপুর, চরখলিলপুর, নাজিরগঞ্জ, এবং সদর উপজেলার চরতারাপুরসহ নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর পাড় ঘেঁষে বালু উত্তোলনের ফলে অসময়ে পদ্মা নদীতে দেখা দিয়েছে প্রচণ্ড ভাঙন। ভাঙনে নদী তীরবর্তী শত শত বিঘা কৃষি জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। এসব জমিতে টমেটো, বেগুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ছিল কৃষকের। কিন্তু নদীগর্ভে জমি চলে যাওয়ায় ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন এ অঞ্চলে কৃষকেরা।

সবচেয়ে বেশি বালু উত্তোলন করা হয় নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নে। নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট থেকে বুলচন্দপুর, বরখাপুর ও হাশামপুর পর্যন্ত এলাকায় অর্ধ শতাধিক ড্রেজার দিয়ে বালু কাটা হচ্ছে। নাজিরগঞ্জ এলাকায় গত শুক্রবার উপজেলা প্রশাসনের একটি অভিযানের পর সাময়িক বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও অন্য জায়গায় যথারীতি চলছে।

এলাকাবাসী জানান, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ফকিৎপুর, নরসিংহপুর, মানিকহাট ইউনিয়নের বিলমাদিয়া, তিল মাদিয়া, মামুদিয়া, নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের চর বরখাপুর, বিজলীচর, রাণীনগর, বালিয়াডাঙ্গি ও সাদারচরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম। ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী, সাড়া ও রূপপুর ইউনিয়নের চররুপপুর, দাদাপুর এলাকায় পদ্মা নদীতে খুবই ভালমানের বালু পাওয়া যায় যেহেতু এখানকার বালু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বেপরোয়া ও ক্ষমতাসীন। রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতুর উজান এবং ভাটিতে পদ্মা নদী থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বেড়া উপজেলার নাকালিয়া, চর নাকলিয়া, চর সাড়াশিয়া, রাকশা, সিংহাসন এলাকায় যমুনা নদী থেকে বালু উত্তোলন হচ্ছে। এসব এলাকায় প্রায় দেড়’শ শ্যালো ইঞ্জিন চালিত মেশিনে নৌকায় করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, জেলার ২৪টি পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ৪ টাকা হিসাবে এক কোটি টাকা। প্রতিদিন বালু ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন মহলে অন্তত ২৫ লাখ টাকা করে সুবিধা দিচ্ছে।

গ্রামবাসীরা বলেন, বালু ব্যবসায়ীরা এতোটাই বেপরোয়া যে তারা বালু উত্তোলনে বাধা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে হয়রানি করে। আবার কখনও অভিযান চালিয়ে বালু জব্দ করা হলে সে বালুও নিলামে কিনে নেন সিন্ডিকেটের সদস্যরাই। বালু উত্তোলন বন্ধে উচ্চ আদালত গত জানুয়ারিতে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করলে প্রশাসন মাঠে নামে এবং গত ২৭ জানুয়ারি সুজানগরের সাতবাড়ীয়ায় ১টি, মালিফাতে ২টি, নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের মহব্বতপুর, বরখাপুর, হাসামপুর, বুলচন্দ্রপুরের ৯টি পয়েন্টে অবৈধভাবে উত্তোলিত ১২টি জব্দকৃত বালুস্তুপ ২২ লাখ ৩০ হাজার ৮শ’ টাকায় প্রকাশ্য নিলামে বিক্রি করে। কয়েক কোটি টাকার বালু নামমাত্র মূল্যে বালু কারবারিরাই ক্রয় করে নেয়।  সুজানগর মৌজার বিশ্বনাথপুর পয়েন্টে ১৬টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করতে দেখা গেছে। সারাদিন সেখানে অর্ধ শতাধিক নৌকা বালু পরিবহনে ব্যবহার করা হয়।

---------------------------------------------------------------
আরও পড়ুন: ওসি প্রদীপের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলার আবেদন
---------------------------------------------------------------

সুজানগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রওশন আলীর কাছে আরটিভি নিউজ জানতে চায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সম্পর্কে, তিনি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, গত শুক্রবার অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একটি অভিযান পরিচালনা করা হলে সংশ্লিষ্টরা আগেই কীভাবে যেন অভিযানের খবর পেয়ে সটকে পড়েন। এজন্য কাউকে আটক করা যায়নি। তবে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

অবৈধ বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসনের একার পক্ষে দেখা দুরূহ ব্যাপার। তারপরও এসব অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও অভিযানের একদিন পরই তারা আবারও একইভাবে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে বলে খবর আছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ ব্যাপারে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

তবে এলাকার সচেতন মহল মনে করছেন সরকার এবং প্রশাসন শক্ত হাতে অবিলম্বে এসব বালু খেকোদের দমন না করলে নদীভাঙন আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। ফলে অনেক মানুষই ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়বে।

এসএ/জেবি

RTVPLUS
bangal
corona
দেশ আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ৩৪৪২৬৪ ২৫০৪১২ ৪৮৫৯
বিশ্ব ৩,০১,২৬,০২০ ২,১৮,৭৪,৯৫৭ ৯,৪৬,৭১২
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • দেশজুড়ে এর সর্বশেষ
  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়