Mir cement
logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮

‘নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাইসি ও নতুন যুগের হাতছানি’

ইব্রাহিম রাইসি

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসির বিজয় ইরানিদের মধ্যে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা জাগিয়ে তুলেছে। নানা কারণে এমন আশা জেগেছে। এর মধ্যে একটি হলো- বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাইসি যেসব কাজ করেছেন সেগুলো ছিল বৈপ্লবিক ও আশা জাগানিয়া।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান :

ইব্রাহিম রাইসি ইতোমধ্যে নিজেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অগ্রপথিক হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরানেও কোনো কোনো অঙ্গনে কিছুটা দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে যা বিপ্লবী চেতনা ও আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ইব্রাহিম রাইসি বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দুর্নীতি দমনে মনোনিবেশ করেন। সর্বত্র ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো উপড়ে ফেলার কাজ শুরু করেন এবং অনেক দূর এগোতে সক্ষম হন। এই পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। এ কারণে তাকে অনেক প্রভাবশালীর রোষানলে পড়তে হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানই তাকে সারাদেশে আপামর জনগণের কাছে প্রিয়পাত্র করে তুলেছে।

নিজ বিভাগে শুদ্ধি অভিযান :

বিচার বিভাগের ভেতরেও শুদ্ধি অভিযান চালান রাইসি। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে বিচার বিভাগের সাবেক উপপ্রধান আকবার তাবারিকে গ্রেপ্তার করেন এবং বেশ কয়েকজন বিচারককে বরখাস্ত করেন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আকবার তাবারির ৩১ বছরের জেল হয়েছে। ইব্রাহিম রাইসি এমন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান যারা নানা কৌশলে আইন ও বিচারের বাইরে থাকার চেষ্টা চালিয়েছেন। রাইসির নির্দেশে সারা দেশে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে বড় ধরণের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ পর্যন্ত হাজার হাজার একর সরকারি জমি উদ্ধার হয়েছে। তার হস্তক্ষেপে পুনরায় চালু হয়েছে কয়েক হাজার কারখানা। ফলে বহু মানুষ চাকরি ফিরে পেয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার পর যখন মানুষকে দুর্নীতি দমন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তখন সবাই তার ওপর সহজে আস্থা রাখতে পেরেছে। কারণ তারা রাইসির সাম্প্রতিক অতীত থেকেই তার এমন কাজের নজির খুঁজে পেয়েছেন।

বঞ্চিতদের পক্ষে সরব কণ্ঠ :

ইব্রাহিম রাইসি ইতোমধ্যে মজলুমদের সাইয়্যেদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)'র বংশে যাদের জন্ম তাদের নামের আগে সাইয়্যেদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ইরানের মানুষ সাইয়্যেদদেরকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে। কথা ও কাজে বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষ নেয়ায় তাকে মজলুমদের সাইয়্যেদ হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে। বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাইসি দেশের প্রায় সব প্রদেশ সফর করেছেন। স্থানীয় আদালতগুলোর খোঁজ-খবর নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অভিযোগ-অনুযোগের কথা শুনেছেন। অনেক দরিদ্র বিচারপ্রার্থীর সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করেছেন। এমন অনেকেই তার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন যারা কোথাও গিয়ে কোনো সমাধান পাননি। প্রান্তিক শ্রেণির যেসব মানুষের কথা কেউ কোনো দিন শোনেনি, তাদের কথাও শুনেছেন তিনি।

বর্ণিল কর্মময় জীবন :

সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসি বর্ণিল কর্মময় জীবনের অধিকারী। যে পদেই আসীন হয়েছেন সততা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। এ কারণে রাইসির অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কিছুই খুঁজে পায়নি তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা। ১৯৬০ সালে ইরানের পবিত্রতম শহর মাশহাদের এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাইসি। তার বাবার নাম হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ হাজি রায়িসুস সাদাতি। তবে রাইসি বাবার সান্নিধ্য খুব বেশি দিন পাননি, কারণ পাঁচ বছর বয়সেই তার বাবা ইন্তেকাল করেন। মাশহাদ শহরেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন রাইসি। এরপর ১৫ বছর বয়সে ইরানের ধর্মীয় শিক্ষার নগরী হিসেবে খ্যাত পবিত্র কোম শহরে আসেন এবং সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি হন। তিনি কোমের বিজ্ঞ শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার ক্লাসে অংশ নেন। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার উচ্চতর ধর্মীয় জ্ঞানের ক্লাসে অংশগ্রহণেরও সুযোগ হয়েছে সাইয়্যেদ রাইসির। তিনি ধর্মীয় লাইনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আইন শাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ইব্রাহিম রাইসি নানা অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতির পাশাপাশি কিছু দিন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ইরানের বিখ্যাত ইমাম সাদেক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী ওপেন ইউনিভার্সিটিতে আইন পড়াতেন।

ইব্রাহিম রাইসি ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হয়েছেন মাত্র দুই বছর আগে। এর আগে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন। টানা ১০ বছর বিচার বিভাগের উপপ্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। জাতীয় নিরীক্ষণ দপ্তরের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টেরও সদস্য। দুই মেয়াদে এই পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিষদের ভাইস-প্রেসিডেন্টও তিনি। রাইসি সরাসরি বিচারকাজও পরিচালনা করেছেন।

স্ত্রী-সন্তান :

সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসি ২৩ বছর বয়সে ইরানের বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমাদ আলামুল হুদার বড় মেয়ে জামিলা আলামুল হুদাকে বিয়ে করেন। রাইসি সহধর্মিণী ড. জামিলা আলামুল হুদা বর্তমানে ইরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক। তাদের রয়েছে দুই সন্তান। দুই মেয়েই বিয়ে করেছেন। বড় মেয়ে সমাজ বিজ্ঞান এবং কুরআন ও হাদিস বিজ্ঞান-এই দুই বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। ছোট মেয়ে পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করছেন।

সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ :

ইব্রাহিম রাইসির ব্যক্তি ইমেজ ও জনপ্রিয়তা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকেও কাছে টেনে এনেছে ইতোমধ্যে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার সব প্রতিদ্বন্দ্বীই ভোটের প্রাথমিক ফলাফল হাতে পেয়েই আন্তরিক অভিনন্দন জানান রাইসিকে। তিনি রক্ষণশীল রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সংস্কারবাদীরাও তাকে জোরালো সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন। বিদায়ী সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পরপরই রাইসির সঙ্গে দেখা করে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া প্রথম থেকেই রক্ষণশীল রাজনৈতিক জোটগুলোরও একচেটিয়া সমর্থন-তো তার পেছনে রয়েছেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। রক্ষণশীলদের একচেটিয়া সমর্থন আগামীতে রাইসির পথ চলাকে অনেক সহজ করে তুলবে। কারণ ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন রক্ষণশীলদের জয়জয়কার। সাম্প্রতিক সিটি কাউন্সিল নির্বাচনেও বড় জয় পেয়েছে রক্ষণশীলরা। রাজধানী তেহরানে সিটি কাউন্সিলের ২১ আসনের সবকটিতে জিতেছে তারা। এর মধ্যে ইরানিদের চোখের মনি শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মেয়ে নার্জেসও রয়েছেন। তেহরানের পরবর্তী মেয়রকে বেছে নেবেন এই কাউন্সিলররা। ফলে নিশ্চিতভাবেই একজন রক্ষণশীল প্রার্থী পরবর্তী মেয়র হতে যাচ্ছেন। বছর খানেক আগে ইরানের সংসদ নির্বাচনেও রক্ষণশীলরা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতেছে।

গত কয়েক দশকের রীতি অনুযায়ী এমনিতেই এবার রক্ষণশীল প্রার্থীদের জেতার সম্ভাবনা বেশি ছিল। ইরানের সাম্প্রতিক কয়েক দশকের প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আট বছর পরপর সংস্কারবাদী ও রক্ষণশীলদের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। টানা দুই নির্বাচনে সংস্কারপন্থীরা জয় পেলে পরের দুই নির্বাচনে রক্ষণশীলরা জেতে। রক্ষণশীলদের বিজয়ের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে সংস্কারবাদী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির সরকারের আমলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সাধারণ মানুষের আর্থিক অনটন। এবারের নির্বাচনী প্রচারেও এই দুই ইস্যুই প্রাধান্য পেয়েছে।

রাইসির সরকারের জন্যও আর্থিক সমস্যার সমাধানই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিদায়ী রুহানি সরকার আর্থিক সমস্যার জন্য মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে থাকেন। তবে ইব্রাহিম রাইসি প্রথম থেকেই এই সমস্যা সমাধানে দেশীয় সুযোগ ও সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। এ কারণে তিনি সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের শিল্প কারখানা বন্ধ ঠেকাতে চেষ্টা করেছেন। রাইসির মতে, দেশে ন্যায়বিচার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলে এবং রাষ্ট্রের নানা অঙ্গনকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা গেলে বাইরের নিষেধাজ্ঞা উন্নয়নের পথে খুব বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। একইসঙ্গে তিনি সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের বাধ্য করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভিয়েনায় পরমাণু সমঝোতা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে যে আলোচনা চলছে তা চালিয়ে যাবেন ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাইসি। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা প্রক্রিয়া চলছে। ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

ইরানের সব প্রেসিডেন্টকেই সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে থাকেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রেসিডেন্টের প্রতিও তার পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। ইব্রাহিম রাইসিকে একজন সৎ ও সাহসী বিচারক হিসেবে জানেন সর্বোচ্চ নেতা। এ কারণে তিনি সংবিধান অনুযায়ী ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে রাইসিকে নিয়োগ দেন। সর্বোচ্চ নেতার এ আস্থাও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে ইরানিরা সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসির নেতৃত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা করতেই পারে।

ড. সোহেল আহম্মেদ

লেখক ও সাংবাদিক

ই-মেইল : [email protected]

এসআর/

মন্তব্য করুন

RTV Drama
RTVPLUS