logo
  • ঢাকা শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৭

সেই দুরন্ত ছেলেটিই মিশে আছে লাল সবুজে

শিশির রাজন
আরটিভি অনলাইন
|  ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৫৫ | আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:২১
মুক্তিযুদ্ধ লাল সবুজ স্বাধীন
ছবি: সংগৃহীত
১.

সেই ভবঘুরে স্কুল পলাতক ছেলেটি আজ তেষট্টি বছরের পরিণত পুরুষ। ঘুমিয়ে  আছে সে। আষাঢ়ের মেঘময় গোধূলি সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরে এসেছে। চারদিকে পাখির কলতান । মানুষের ভিড় বাড়ছে। নিজের শেকড়ের টান আর প্রিয় মাটির গন্ধে তাঁর ঘুম আরও গাঢ় হচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে অনেকেই যেন কিছু একটা প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২.

গ্রামের নাম রায়পুর। শান্ত শীতল গ্রাম। তিন দিকে কংস নদ। কংসের অনুপম ধারায় গ্রামটি এক সবুজ ক্ষেত্র। আছে প্রাচীন স্থাপনা। জমিদারদের বাড়ি, মন্দির ও পুকুর ঘাট। প্রাচীন এ স্থাপনাগুলো যে কাউকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে পেছনের ঐতিহ্যময় অতীতে।

৩.

হীরেন্দ্র দত্ত মজুমদার। রায়পুর গ্রামের একজন শিক্ষক। দেশ বিভাগে পরিবারের সদস্যরা ভারতে চলে গেলেও মাটির মায়ায় তিনি পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক চাপা কষ্ট নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেই থেকে যান। হীরেন্দ্র বাবু নির্লোভ নির্ভেজাল মানুষ। পাঁচ ছেলে সন্তানের মধ্যে তাঁর যতো চিন্তা ভবঘুরে ছোট ছেলেকে নিয়ে। বড় ছেলেরা যখন মেধার পরিচয় দিয়ে এলাকায় গ্রামেগঞ্জে বিখ্যাত। তখন কিশোর ছোট সন্তানটি পড়াশোনা বাদ দিয়ে রাখাল বালকের পেছনে ঘুরে বেড়ায়।

 সারাদিন দুষ্টামিই তার কাজ। পড়ায় মন বসে না। খুব জবরদস্তি করে এ বছর নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে সে। কিশোরটির প্রকৃতিও ভিন্ন। একরোখা, জেদি। সমগ্র গ্রামেই যেন তার খেলার মাঠ। সে মুগ্ধ হয়ে কংস নদের  ঢেউ দেখে। সময় কাটায় কংসের শীতল জলে। দেশ বিভাগের খড়গে ছোট হয়ে আসা পরিবারে সেই তার প্রজন্মের শেষ বংশধর। সকলের অনাবিল আদর তাকে দুরন্ত করে তুলেছে।

৪.

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। বর্বর পাক হায়েনারা ঢাকা শহরে চালায় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। নিরীহ বাঙালির রক্তে ভেসে যায় ঢাকার রাজপথ অলিগলি। হায়েনাদের এ গণহত্যা ছড়িয়ে পরেছে সমগ্র বাংলাদেশে। সবুজ শ্যামল রায়পুর গ্রামটি যেন হঠাৎ করে তার জৌলুস হারিয়েছে। মানুষের মনে ভয় ও আতঙ্ক। এদিকে পাক সেনাদের বিরোধে সারাদেশে সমান তালে চলছে প্রতিরোধ।

৫.

১৯৭১ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি। পাখির ডাকে ভোরের আলোয়  সবুজ গ্রামকে পেছনে ফেলে হীরেন্দ্র বাবু পরিবারের সকলকে নিয়ে ছুটে চলেছেন। গন্তব্য মেঘালয়ের রংরা এলাকা। দেশত্যাগী দলের সাথে তার অসুস্থ স্ত্রীও আছে। হঠাৎ দেখা গেলো দলের সাথে হীরেন্দ্রবাবুর সেই ভবঘুরে ছোট ছেলেটি নেই। মায়ের মন কেঁদে উঠলো। তবু বাধ্য হয়ে সেই ছেলেটিকে রেখে হীরেন্দ্রবাবুর পরিবারকে ছুটতে হলো অজানার উদ্দেশে।

৬.

‘মহান জাতির মহান নেতা- শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’ আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। রক্তের বদলায় উন্মুখ তরুণ দল। পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দেশমাতার মুক্তির আহ্বান। তরুণ মুক্তিযোদ্ধার দলে অস্ত্রহাতে ১৫ বছরের যে কিশোরটি আছে তিনিই শরণার্থী দল থেকে পালিয়ে যাওয়া দুরন্ত, পড়াশুনায় উদাসীন হীরেন্দ্র বাবুর ছোট ছেলে। অসুস্থ মাকে রেখে পালিয়ে এসে সে মুক্তি বাহিনীতে যোগদান করে, ট্রেনিং গ্রহণ করছে ভারতের তুরা ট্রেনিং ক্যাস্পে। যার চোখে মুখে শত্রু হত্যার প্রত্যয়। প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প। ট্রেনিং শেষে সে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রচণ্ড প্রতাপে যুদ্ধ করে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুড়ি এলাকায়। সবার কাছে সে আদুরে কিশোর যোদ্ধা। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন সে। জানে না তারা কোথায় আছে। আর দেখা হবে কিনা। অপেক্ষায় থাকে অসুস্থ মাকে কখন দেখবে। অবশেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের বিজয়। সে ফিরে আসে বাড়িতে। কিছুদিন পর আসে পরিবার। কিন্তু তার মা আর ফিরে আসেননি। যুদ্ধাবস্থায় কিশোর ছোট ছেলের চিন্তার একরাশ শূন্যতা নিয়ে ত্যাগ করেন পৃথিবীর মায়া। আর দেখা হয়নি আদুরে ছোট ছেলের সঙ্গে।

৭.

মাটির ঘ্রাণে পড়ন্ত গোধূলিতে ১৯৭১ সালের সেই কিশোর বীরযোদ্ধার নাম সুদীপ দত্ত মজুমদার। ডাকনাম বাবুল। যুদ্ধের পরে মা হারানো ছেলেটি যেন আরও উদাস হয়ে পরে। আর ভর্তি হয়নি স্কুলে। সুযোগ আসে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরির। কিন্তু তিনিতো উদাস ভবঘুরে দুরন্ত। কোনও গণ্ডিবদ্ধ জীবন তাকে মানায় না। গ্রহণও করেননি । জীবনের অনেকগুলো বছর চলে যায়। সংসার হয়। তবু তিনি একই আছেন। শুধু গল্প বলে যান বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের। সংসারেও মন নেই। পৌষের আগুন পোহানো রাতে, বিকেলের সবুজ ঘাসে পরিবারে ছোটদের সাথে যুদ্ধের গল্প বলে যান। তুলনামূলক রাগি, একরোখা তিনি যুদ্ধের গল্প বলতে বলতে যেন ধীর স্থির দৃঢ় হয়ে যেতেন। তার চোখে মুখে ঝিলিক দিয়ে উঠতো গর্বে। কখনো অন্য বীরযোদ্ধার শহীদ হওয়ার গল্পে তার চোখ ছলছল করতো। শৈশবেই অনুভব করেছি ভবঘুরে দুরন্তপনা আর জেদি মেজাজের বাইরে তার প্রগাঢ় দেশপ্রেম।

৮.

আজ থেকে তিনি আর গল্প বলবেন না। যাবেন না গর্বিত পতাকা নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোনও অনুষ্ঠানে। নিজের প্রতি প্রচণ্ড উদাসীন যোদ্ধাটি টেরই পাননি কখন তার শরীরে বাসা বেধেছে মরণব্যাধী ক্যান্সার। হেরে গেছেন এর কাছে। ঢাকা মেডিকেল হতে ফিরে এসেছেন প্রিয় গ্রাম, প্রিয় বাড়ির আঙিনায়, প্রিয় মাটিতে। আজ আর তার কোনও চাওয়া পাওয়া নেই। নেই সংসারের অভাব অভিযোগ। গর্বিত পতাকায় জড়ানো তার নিশ্চল দেহ। প্রিয়জনদের কান্নার বাতাস সবুজে মাটির গানে স্তব্ধতা। শেষকৃত্য প্রস্তুতি নেওয়া দলটির প্রস্তুতি সম্পন্ন। অতঃপর আষাঢ়ে তুমুল বর্ষণে বকুল গন্ধে প্রিয়মাটিতে মহাচিতায় ঘুমিয়ে পরলেন তিনি। হয়তো তিনি আসবেন জোসনা রাতে আলোর উৎসবে, বিজয় গানে। আসবেন স্বপ্নে গল্প বলতে। মিশে থাকবেন লাল সবুজের রঙে। পাহারা দিবেন প্রিয় মাটিকে। গল্পে মাতবেন সহযোদ্ধাদের সাথে, কংসের ধারায়। যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। থাকবেন বকুল ঘ্রাণে, পুকুর পারের চির সবুজে। আমাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধার মন্দিরে।

এজে/জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • শিল্প-সাহিত্য এর সর্বশেষ
  • শিল্প-সাহিত্য এর পাঠক প্রিয়