• ঢাকা সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬

অরুণ বুধাথোকির গল্প ‘বেজন্মা’।। ভাষান্তর: নুসরাত জাহান জেবিন

মূল: অরুণ বুধাথোকি, ভাষান্তর: নুসরাত জাহান জেবিন
|  ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৪৫ | আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:০১
লাশটি খোলা মাঠে কবর দেয়া হলো। সন্ধ্যেটা সুনসান। চারপাশ জনমানবশূন্য ।

whirpool
চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় আকাশটা ম্লান হয়ে যাচ্ছিলো যেন। দু' হাত ঘষে, হাতের বালু ঝেড়ে ফেলে, পাশে পড়ে থাকা বেলচা তুলে মাটি সমান করার কাজে লেগে পড়লো অজয়।

চিৎকার করে বললো, বেজন্মা, এটাই তোর প্রাপ্য। ধর্ষকের কবরে থুথু ফেললো সে। এমন সময় তার ফোন বেজে উঠলো।

হ্যা, কাজ শেষ হয়েছে, মুখে স্বস্তির হাসি।

'ভালো করেছো, এখন কেউ দেখে ফেলার আগে তাড়তাড়ি বের হয়ে যাও সেখান থেকে।' এক অজানা কন্ঠ নির্দেশ দিলো

বেলচাটা তুলে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো অজয়। ঘটনাস্থল থেকে যেতে যেতে, অজয় টুইট করলো, ধর্ষণ একটি অপরাধ এবং ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু। # অজয়দ্যাকিলার

টুইট করার পরপর অনেকেই তার জবাব দিলেন। আবার অনেকেই সেই টুইটকে ফেভরিট, রিটুইট ও কোট করলেন। কিন্তু কেউ জানলোও না, পুরো ঘটনাটাই সত্য।

নতুন কেনা গাড়িটি একটি আবাসিক এলাকায় এসে থামলো। একজন গার্ড এসে অজয়কে অনুরোধ করলো যেন সে গাড়িটি পার্কিং লটের ভিতরে গিয়ে রেখে আসে। নির্দেশনা অনুসরণ করলো ও।

সিড়ির কাছে পৌছাতেই একজন অচেনা লোক তার দিকে উঁকি মেরে তাকাতে থাকে। দ্রুত ক্ষুদে বার্তা পাঠায় ফোনে, 'আমি ওকে পেয়েছি, এখন কি করবো'

প্রত্যুত্তর আসে, 'এদিকে ওকে চোখে চোখে রাখো। যদি কিছু সন্দেহজনক পাও, তবে আমাদের মেয়েদের থেকে একজনকে পাঠাবে।'

অজয়ের পায়ের শব্দ কমে যেতেই লোকটি উধাও হয়ে গেলো।

দরজার হাতল নিঃশব্দে ঘুরল, খুলল আর বন্ধ হলো। 

অজয় সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে এসেছে এবং জাওয়ালখেল এ সদ্য ফ্ল্যাট কিনেছে। তার বন্ধুরা জানে যে তার বাবার পুঞ্জিভূত প্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু তার সে প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।

অজয় ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা খাবার বের করে গরম হওয়ার জন্য মাইক্রোওভেনে দেয় এবং খাবার গরম হতে হতে সে টিভি অন করে। সোফায় বসে সে চ্যানেল ইএসপিএন হতে সাগরমাতা নিউজ এ পরিবর্তন করে।

টিভি রিপোর্টার তাৎক্ষণিক খবরে বলেন, এটা রিপোর্ট করা হয়েছে যে এক ত্রিশোর্ধ্ব লোককে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে ধুলিখেলের জঙ্গলে। পুলিশ এখনো মৃত ব্যক্তিটির পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই মাসের চতুর্থ খুন এটি। 

আশ্চর্যজনক হলো যে, এ মৃত ব্যাক্তিগুলোকে আগে ধর্ষণের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হলেও, তাদের বিচার হয়নি।

ওভেনটা তিনটি গুণ গুণ শব্দে করে থেমে যায়। টিভি বন্ধ। সে তার খাবারটা খায় তার বোনের কথা ভেবে।

অজয়ের বোন সদ্য গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হয়েছিলো। হোয়াইট হাউজ ইন্টল কলেজে পড়তো। বোনের সাথে দেখা করার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলো সে।

এটি একটি সুন্দর সন্ধ্যা ছিলো এবং অবিশ্বাস্য রকম নিখুতও ছিলো। কিন্তু ওই সন্ধ্যাই ছিলো তার বোনের জীবনের শেষ সন্ধ্যা। তার বোন তার সাথে সব কিছু নিয়ে কথা বলতো এবং সে অজয়কে তার মনমুগ্ধকর ও উৎসাহী এক লোকের সঙ্গে ডেটের কথাও বলেছিলো।

অজয়ের কোনো ধারণাই ছিলো না যে ওই লোকটি কে ছিলো, কিন্তু যেহেতু সে তার বোনকে ভালোবাসতো, তাই সে তাকে অভিনন্দন জানায়। সে অজয়কে বলেছিলো যে সে নাগারকোট যাবে। সেদিন তার বোন নাগারকোটের একটি মোটেলে যায় এবং তাকে ধর্ষণ ও খুন করা হয়। ক্ষোভে অজয় খাবারের থালা ছুঁড়ে মারে এবং এর থেকে বেশি ভাবতে অস্বীকার করে। সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে এক স্বপ্নহীন ঘুমে।

অজয় স্বপ্নে দেখে যে তার বোন তার নাম ধরে চিৎকার করে বলছে সাহায্য করো আমাকে ভাই! বাঁচাও আমাকে!

ভোর তিনটায় পাঁচবার তার ফোন বেজে উঠে। তখন সে স্বপ্নে বিভোর। অজয় শেষে কোনোমতে ফোনটা ধরে।

'হ্যালো! কে অসময়ে ফোন করেছেন কেন?' চিৎকার করে উঠলো অজয়।

'আমি মিস্টার এ। মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনুন। আমি এক বেনামি গ্রুপের সাথে একটি ওয়েবসাইট তৈরির জন্য কথা বলেছি। এটা কি নিরাপদ?'

'হ্যাঁ, এটা নিরাপদ। তুমি তো জানো, ওরা অনেক দক্ষ হ্যাকার। আর আমার মনে হয় না, নেপাল সরকারের প্রযুক্তি সম্পর্কে তেমন কোনো জ্ঞান আছে যা এই পোর্টালকে থামাতে পারবে।'

'তাহলে ঠিক আছে। রাখছি তাহলে।' জবাব এলো ওপাশ থেকে।

••••••

অজয় তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে তার ল্যাপটপ খুললো। ওয়েবসাইট তৈরির কাজে লেগে পড়লো। নাম দিলো কিলিংদ্যারেপিস্টডট কম।

আইপি ঠিকানা এবং সার্ভার নিরাপদ করে, বেনামে ওয়েবসাইট চালু করে। তার প্রথম পোস্টে সে লিখলো, 'এই সাইটটি ধর্ষণের শিকার সকলের জন্য, তুমি নিজের ধর্ষকের নাম লিখো আর আমরা তাকে খুন করবো।'

উত্তেজনা আর আহ্লাদে সে আবার ঘুমাতে যায়।

পরেরদিন সে তার ওয়েবসাইট এ ঢুকে দেখতে পায় এর মধ্যেই সে ওয়েবসাইট 50,000 হিটস পেয়ে গেছে।

একটা নোট লিখলো ও।

'এই ওয়েবসাইট তৈরির কারণ হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের শিকারদের সমস্যা নিয়ে কথা বলা। আমাদের একটি সমাজ ও সরকার রয়েছে যা অপ্রীতিকর এবং কুসংস্কারের শিকার মানুষে ভরা। বেশ্যাবৃত্তি বৈধ করা এক জিনিস আর কাউকে জোর করে যৌন সহবাস করানো হলো এক ধরনের হিংস্রতা। পুরুষ এখন পশুর মত হয়ে গেছে এবং আমাদের এটা শেষ করতে হবে।'

তার নোটগুলো দ্রুত শহরবাসীর আতঙ্কে, ভয়ে ও কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে শহরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হলো। কাঠমন্ডুর রাস্তায় রাস্তায় মানুষ একে অপরের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা শুরু করে। যেখানে কেউ তার এ ধরনের লেখা নির্ধারণে তাকে বাহবা দিয়েছে আবার কেউ এর বিরুদ্ধে জোর আওয়াজও তুলে দিয়েছেন। অজয় সপ্তাহের শেষ দিকে নেপাল ত্যাগ করে।

সোমবার সন্ধ্যায় অজয় তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল যেন সে কোনো বোকামি না করে বসে, যা তার পরিবারের কাছে কষ্ট ও লজ্জার কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। কিন্তু তখন তার চোখে তার বোনের ছবি ভেসে উঠে। এটা একটা স্বপ্নের মত ছিলো, যেনো তার কল্পনা।

সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেবে শেষে একটা সিদ্ধান্তে এলো। ধর্ষককে খুন করবে ভাবলো। কয়েক মাস ধরে সে সেই লোকটির কার্যকলাপ অনুসরণ করে আসছিলো। তারপর একটি পরিকল্পনা তৈরি করে। ধর্ষকের আচার আচরণ বোঝার পর, সে তাকে ফেইসবুক ও টুইটারে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে অনুসরণ করে। অজয় দ্রুত লোকটির সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করে। সে লোককে নতুন বছর পালনের পার্টিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে। লোকটি রাজি হয়ে যায়। 

পার্টিতে যাওয়ার পথে অজয় ইতোমধ্যে বিয়ারের বোতল নিয়ে নিয়েছিলো এবং তা থেকে একটা সেই লোককে দেয়। মিস্টার এক্স তা পান করে সাথে সাথে ঢলে পড়েন। অজয় কবরস্থানের সামনে তার গাড়িটি থামায়। 

তখন অনেকটাই অন্ধকার। অজয় মিস্টার এক্স'র প্যান্টের চেইন খুলে পুরুষাঙ্গ ছিন্ন করে ফেলে।

অজয় ছিন্ন করা অঙ্গটি একটি পলিথিনের ব্যাগ এ রাখে এবং তার রক্তাক্ত হাতমোজা দিয়ে লোকটির শরীরকে টানা শুরু করে। লাশটিকে ছুঁড়ে ফেলে খোদাই করা কবরে। ফিরে আসে কোনো অনুতাপ ছাড়া, নিজের হিংস্রতায় সে সন্তষ্ট। তার ভীষণ খুশি লাগছে।

[নেপালে ইংরেজিভাষী এই সময়ের তরুণ গল্পকারদের মধ্যে অন্যতম অরুণ বুধাথোকি। তিনি গল্প, উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতা লিখেও খ্যাতি পেয়েছেন। বর্তমানে ‘কাঠমাণ্ডু ট্রিবিউন’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষাগত কারণে থেকেছেন ভারতের হায়দরাবাদে। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন ইংল্যান্ডে। এরই মধ্যে ৬টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নেপালের জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।

ম্যাড স্যুয়ারলে প্রকাশিত বেজন্মা গল্পটি  আরটিভি অনলাইনের জন্য অনূদিত হয়েছে।]

এসজে/জেবি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়