logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গরীবের হোটেল ‘রবিনহুড’

কামাল হোসেন, টাঙ্গাইল
|  ২২ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫০
জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গরীবের হোটেল ‘রবিনহুড’
জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গরীবের হোটেল ‘রবিনহুড’
মির্জা মাসুদ রুবেল। পেশায় একজন সাংবাদিক। রয়েছে হোটেল ব্যবসাও। সেখান থেকে যা আয় হয় তার কিছু অংশ ব্যয় করেন আর্তমানবতার সেবায়। তাই অসহায়, দুস্থ ও গরীবদের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে গড়ে তুলেছেন হোটেল ‘রবিনহুড’। যেখানে প্রতি শুক্রবার বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করা হয়। ভিক্ষুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির অসহায় ও দুস্থ নারী-পুরুষ ছুটে আসে রবিনহুডে। 

মির্জা মাসুদ রুবল বলেন, ‘আমার পূর্ব-পুরুষরা এক সময় অসহায়, দুস্থ ও দরিদ্র মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাদের আর্তমানবতার জন্য নানামুখী কর্মকাণ্ড দেখে এসেছি। তারই ধারাবাহিকতা এবং অনাহারীর মুখে একবেলা খাবার তুলে দেয়ায় তাদের মুখে যে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠে তা আমাকে আপ্লুত করে। তাইতো শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এসব অসহায় মানুষকে ফেরাতে পারি না। তারা যখন পেট ভরে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে সেটা দেখে আমার খুব ভাল লাগে।’

গেল শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্র নিরালা মোড় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক দরিদ্র, অসহায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ খেয়ে যাচ্ছেন তৃপ্তির সঙ্গে। যেন কারো দিকে খেয়াল করার মতো সময় নেই তাদের কাছে। স্বেচ্ছাসেবীরা প্রয়োজনমতো সবার হাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

সময় মতো পানিসহ অন্যান্য খাবার উপকরণ দেয়া হচ্ছে। তাই তেমন কোনও হৈচৈ নেই। খাবার পাওয়ার জন্য কোনও হুড়োহুড়ি বা কাড়াকাড়ি নেই। কারণ সবাই জানেন এখানে কাউকে না খেয়ে ফিরে যেতে হয় না। তাইতো জেলার গণ্ডি পেড়িয়ে অন্য জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে গরিবের হোটেল ‘রবিনহুডের’ নাম-যশ। 

টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্র নিরালা মোড়ে শহীদ মিনারের সামনে সাজানো হয় খাবারের পসরা। শহীদ মিনারের পাদদেশে সুশৃঙ্খলভাবে বসে পড়েন দুস্থ অতিথিরা। একবেলা ভালো খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন সবাই। দু’হাত তুলে দোয়া করেন এই নিবেদিত প্রাণ পুরুষের জন্য। 

দিনমজুর আব্দুল মজি বলেন, ‘দৈনিক খেটে-খুটে যা আয় হয় শহরের হোটেলে খেতে গেলে তার অনেকটা চলে যায়। তাই এখানে এসে বিনামূল্যে খাবার পাওয়ায় সেই টাকাটা সাশ্রয় হয়। এতে পরিবারের মুখে বাড়তি কিছু তুলে দিতে পারি।’ 

ভিক্ষুক সমিতির সভাপতি আক্কাস আলী বলেন, ‘রুবল ভাই খুবই ভালো মানুষ। তিনি আমাগো মতো গরিবের দুঃখ বুঝেন। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং মৃত স্বজনদের আত্মার শান্তির জন্য বিভিন্নভাবে দান-দখিনা করে থাকেন।’ এসময় তার কথার সঙ্গে সুর মেলালেন আরও অনেকেই। 

হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা মাসুদ রুবল জানান, প্রায় আড়াই বছর ধরে তিনি এই বিনামূল্যে খাবার হোটেলটি চালিয়ে যাচ্ছেন। শহরে ‘নিরালা হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে তার একটি হোটেল রয়েছে। সেখান থেকে যা আয় হয় তার কিছু অংশ খরচ করেন এই বিনামূল্যের খাবার হোটেলে। দীর্ঘদিন এই বিনামূল্যের হোটেলে দুস্থরা প্রতিদিন দুপুরে এসে খেয়ে যেতো। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এখন সপ্তাহে একদিন (শুক্রবার) দুপুরে তাদের খাওয়াতে পারছি। ইচ্ছা আছে আল্লাহ সহায় হলে খুব শীঘ্রই আগের নিয়মে প্রতিদিন একবেলা করে তাদের মুখে খাবার তুলে দিবো। হোটেলটি চালানোর জন্য কারো কাছে কখনো সাহায্য চাইনি। তবে কেউ যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসে তাহলে অবশ্যই তার সহযোগিতার হাত গ্রহণ করা হবে। দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি।’ 

সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও হুগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন তোফা বলেন, ‘মির্জা মাসুদ রুবল যেটা করছেন নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি এককভাবে বিনামূল্যের হোটেলটি এভাবে কতদিন চালিয়ে যেতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই রুবল ভাইয়ের মতো সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে এসে তাকে সহযোগিতা করা উচিৎ। অথবা নিজেদের অবস্থান থেকে দারিদ্রপিড়িত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করা উচিৎ।’ 

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল মালেক বলেন, ‘যে সকল দরিদ্র, অসহায় রোগী হাসপাতালে আসে তাদেরকে সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা হয় আমাদের সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে। কিন্তু মির্জা মাসুদ রুবল এককভাবে যেটা করছেন তা অনেকের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হয়তো একদিন এই দেশ ভিক্ষুক ও চরম দারিদ্রতা মুক্ত সমৃদ্ধির বাংলাদেশ হবে।’

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • দেশজুড়ে এর সর্বশেষ
  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়