logo
  • ঢাকা বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

প্রত্যন্ত গাঁয়ে ‘শাপলা ফুলে সূর্যোদয়’ ও শারদীয় বইমেলা

কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি
|  ১০ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৪৮ | আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:১৬
শাপলা ফুলে সূর্যোদয় শারদীয় বইমেলা
মিলনায়তনজুড়ে শিশু-নারী-পুরুষ সব বয়সী মানুষের সমাগম। তাদের কারো চোখ আটকে আছে মিলনায়তনের দেয়ালজুড়ে ঝুলানো ছবির দিকে। আবার কারো চোখ মাঝখানে রাখা নানারকম বইয়ের পাতায়। কেউ বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছেন আবার কেউ নাড়াচাড়া করছেন। আর চারিদিকে ঘুরে ঘুরে কারো চোখ আটকে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ছবিতে, আবার কারো চোখ যীশুখ্রিষ্টের দিকে। কেউ দেখছেন শাপলা তোলার দৃশ্য, ঘাটে বাঁধা নৌকা, আবহমান গ্রামীণ জনজীবনের চিত্র।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক ও সত্তরোর্ধ্ব বাউলশিল্পী অনিল কুমার দে’র চোখ আটকে গেল একটি বুলবুলি পাখির দিকে। অনেক আগ্রহ নিয়ে তিনি চেষ্টা করছেন মোবাইল ফোনে পাখিটির ছবি তুলতে। আবার কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক শিখারানি বিশ্বাস বলছেন, এখানে কি সুকান্ত রচনাসমগ্র আছে?

এমন নানা কৌতূহলী প্রশ্ন ও চোখ নিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক এমনকি কৃষক-শ্রমিকদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ ছিল চারদিনব্যাপী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ও শারদীয় বইমেলা। না, এটি রাজধানী তো দূরের কথা কোনো বিভাগীয়, জেলা বা উপজেলা শহরের ঘটনা নয়। এটি একেবারেই প্রত্যন্ত গ্রামের ঘটনা। ঘটনাস্থল গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের ধারাবাশাইল গ্রামে শেখ হাসিনা আদর্শ মহাবিদ্যালয় মিলনায়তন। কলেজের চারপাশজুড়েই পানি আর পানি। পানিতে ফুটে আছে শাপলা ফুল। সেই শাপলা ফুলের মধ্যেই যেন সূর্যোদয়।

চারদিনব্যাপী (৭-১০ অক্টোবর) শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ও শারদীয় বইমেলার আয়োজন করে কান্দি ইউনিয়ন যুব সংঘ-ঢাকা। ঢাকায় বসবাসকারী কান্দি ইউনিয়নের ছাত্র-যুবক-পেশাজীবীদের সমন্বয়ে শিক্ষামূলক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এটি।

চারদিনব্যাপী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ও শারদীয় বইমেলা প্রসঙ্গে এর মূল পরিকল্পনাকরী ও সংগঠনটির সাবেক সভাপতি প্রশান্ত অধিকারী আরটিভি অনলাইনকে বলেন, কান্দি ইউনিয়ন যুব সংঘ-ঢাকা প্রতিষ্ঠার পর থেকে তার নিয়মিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের এক বছরের জন্যও ব্যত্যয় ঘটেনি। ঢাকায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে মনে হয়েছে রজতজয়ন্তী উপলক্ষে ভিন্ন কিছু করার। তখন ভাবলাম আমাদের ইউনিয়নে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করা ৭-৮ জন সম্ভাবনাময় শিল্পী আছে। তাদের শিল্পকর্ম নিয়ে এমন একটি আয়োজন করলে কেমন হয়। সেই ভাবনা থেকেই শিল্পকর্ম প্রদর্শনী আর শরৎকাল উপলক্ষে শারদীয় বইমেলা করার সিদ্ধান্ত নেই আমরা।

শিল্পী সুমন বিশ্বাস, অপু রায়, রেমন বিশ্বাস, জয়দেব বিশ্বাস, বিশ্বজিৎ রায়, সবুজ রায় ও প্রতাপ অধিকারীর শিল্পকর্ম এই প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করা হয়।

শিল্পী সুমন বিশ্বাস আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই শাপলা ফুলবেষ্টিত বিলাঞ্চলে। এখান থেকেই আমরা ৮ জন তরুণ শিল্পী ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলা বিষয়ে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি। সবাই পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে রাজধানী শহরে প্রদর্শনী করতে চায়। কিন্তু আমরা ঠিক উল্টোটা করেছি আমাদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। যদিও এ কাজটি করতে আমরা সাহত পেতাম না, যদি সংগঠনের সাবেক সভাপতি প্রশান্ত অধিকারী আমাদের সাহস না যোগাতেন। মূলত তার চিন্তা ও স্বপ্নের ফসল এটি।

অতিথি হিসেবে এই শিরোনামে শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে এসে অবাক হয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক ও চিত্রশিল্পী আশরাফুল আলম পপলু। আর অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য দেখে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন শারদীয় বইমেলার উদ্বোধক কথাসাহিত্যিক ও বাংলাদেশ কাস্টমস্-এর অতিরিক্ত কমিশনার অরুণ কুমার বিশ্বাস।

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত নির্মল সেন এর লেখা ‘আমার জবানবন্দি’ বইটি পড়ছিলেন নারিকেলবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা সহদেব বৈদ্য। কোটালীপাড়ার মানুষ রাজনীতিক, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা নির্মল সেন এর লেখা বইটি দেখে আগ্রহ নিয়ে বইটি কিনে নিলেন তিনি।

এমনই শিশু-কিশোরসহ সব বয়েসীদের উপযোগী বাছাইকৃত নির্বাচিত সেরা বইগুলো নিয়ে এবং উপজেলার লেখকদের প্রাধান্য দিয়ে আয়োজন করা হয় শারদীয় বইমেলাটি। বাংলা একাডেমি, বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ইউপিএল, ভূমিকা, মূর্ধণ্য, গদ্যপদ্য, গতিধারা, শোভা প্রকাশ, বেহুলা বাংলা, পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স, দেশ পাবলিকেশন্স, অনিন্দ্য প্রকাশ, অয়ন প্রকাশন, সূর্য প্রকাশ, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি একাডেমি, ছায়ানট প্রকাশিত নির্বাচিত বইগুলো মেলায় স্থান পায়।

প্রত্যন্ত গ্রামে এমন ভিন্নধর্মী আয়োজন দেখে লেখক, প্রকৌশলী গোপালকৃষ্ণ বাগচী আরটিভি অনলাইনকে বলেন, এরকম একটি আয়োজন যা সাধারণত জেলা বা উপজেলা পর্যায়েই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না কিংবা হয়না বললেই চলে। সেটি একবারেই গ্রামে আয়োজন করা এবং এতো চমৎকারভাবে তার উপস্থাপন করা হয়েছে, যা না দেখলে আমার বিশ্বাসই হতো না। এটি নিঃসন্দেহে উন্নত চিন্তার এবং সাংস্কৃতিক জাগরণের বহিঃপ্রকাশ। আমি আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই।

পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়