logo
  • ঢাকা শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পদ্মার পানি বিপদসীমার ওপরে, হুমকিতে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট

রাজবাড়ী প্রতিনিধি
|  ০২ অক্টোবর ২০১৯, ২০:০০
পদ্মার পানি বিপদসীমা দৌলতদিয়া ফেরিঘাট
রাজবাড়ীতে গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বুধবার বিকেলে দৌলতদিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পদ্মায় শুরু হয়েছে তীব্র ঘূর্ণায়মান স্রোত ও ভাঙন। পানি বৃদ্ধিতে তীব্র ঘূর্ণায়মান স্রোতের কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের দৌলতদিয়া প্রান্তের ১ ও ২নং ফেরিঘাটের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। পদ্মায় ঘূর্ণি স্রোতের কারণে দুপুর গত সোমবার ১২টার পর থেকে ফেরি ঘাটটি দিয়ে যানবাহন পারাপার বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।

পদ্মায় তীব্র ও ঘূর্ণি স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। স্রোতের কারণে ঘাটের পন্টুনে ফেরি ভেড়াতে চরম বিপাকে পরছে বিআইডব্লিউটিসি কর্তৃপক্ষ।

দৌলতদিয়া ঘাটের বিআইডব্লিউটিসির ব্যবস্থাপক বাণিজ্য আবু আবদুল্লাহ জানান, দৌলতদিয়ায় ৬টি ফেরিঘাটের মধ্যে ১ ও ২নং ফেরিঘাটে স্রোতের তীব্রতা বেশি। সেখানে ঘূর্ণি স্রোতের কারণে ফেরি ভেড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই ১ ও ২নং ফেরিঘাটের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বাকি ৪টি ঘাট সচল আছে। বর্তমানে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের ১৬টির মধ্যে ১৩টি ফেরি চলাচল করছে। বাকি ফেরিগুলো অতি পুরোনো ও ইঞ্জিনে ক্রটির কারণে পাটুরিয়া ভাসমান কারখানায় মেরামতে আছে। স্রোত কমলে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হবে।

গত দশদিন ধরে পদ্মায় পানি অব্যাহত থাকায় এরই মধ্যে নতুন করে রাজবাড়ী জেলার সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। শুধু প্লাবিত নয় নতুন করে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে ভাঙন। এর মধ্যে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নে পদ্মার তাণ্ডব সবচেয়ে বেশি। এতে করে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে দৌলতদিয়া লঞ্চ ও ফেরিঘাটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দফায় দফায় পদ্মার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাল্লা দিয়ে গ্রাস করছে নদী পাড়ের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। আতঙ্কে সরিয়ে নিচ্ছে শত শত ঘরবাড়ি। পানিতে প্লাবিত ইউনিয়নগগুলো হলো গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম, দৌলতদিয়া, রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানুপুর, চন্দনী, খানগঞ্জ, বরাট ও কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া।

ভাঙনের শিকার স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, গত ৫দিনে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ঢল্লাপাড়া, ১নং বেপারিপাড়া, জলিলমন্ডলের পাড়া এবং দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাওলজানি গ্রামের কয়েকশ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এ ছাড়া ভাঙনের শিকার হয়ে প্রায় ৩০০ পরিবারের ভিটেমাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে প্রায় ২০০ পরিবার। তাছাড়া ওই এলাকার আরো প্রায় ৫০০ পরিবার ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে। এ ছাড়া দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের লঞ্চঘাট ও ফেরিঘাটসহ এর সংলগ্ন প্রায় ৩ শতাধিক বসতবাড়ি, একটি মসজিদসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।

বুধবার  সরেজমিনে দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট সংলগ্ন ঢল্লাপাড়া, ১নং বেপারিপাড়া, হাতেম মেম্বার পাড়া, এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরিবার তাদের দীর্ঘদিনের ঠিকানা থেকে সহায় সম্বল গুটিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেই একাধিকবার ভাঙনের শিকার হওয়া পরিবার রয়েছে। তাদের শেষ জমিটুকু হারিয়ে পরবর্তী ঠিকানাও মেলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে হাসেম ফকির, আবুল কাসেম ফকির, মানিক শেখ, কালাম সরদার, লুৎফর সরদার, আঃ রশিদ সরদারের বাড়িসহ প্রায় ৩০০ বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।  এ সময় অনেকেই নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ভয়ে তাদের বসত বাড়ির ঘর ভেঙে এনে কোথাও রাখার জায়গা না পেয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে স্তুপ করে রাখতে দেখা যায়।

দৌলতদিয়া ১নং বেপারিপাড়ার আঃ ছাত্তার বেপারি জানান, গত কয়েক দিনে বেপারিপাড়া ও ঢল্লাপাড়ার ৭০টি, হাতেম মন্ডলের পাড়ার ৫০টি এবং দেবগ্রামের কাওয়ালজানি, মুন্সিপাড়া ১৬০টি পরিবারসহ প্রায় ৩০০ পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে।

এ সময় ভাঙনের শিকার হওয়া দৌলতদিয়া এলাকার ঢল্লাপাড়া গ্রামের রেজাউল করিম জানান, ওই এলাকায় তাদের প্রায় ১০০ বিঘা জমি ছিল। গত কয়েক বছরে ৫ বার ভাঙনের পর প্রায় ২০ বিঘা জমি অবশিষ্ট ছিল। চলতি দফায় ৫ দিনের ভাঙনে তাও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যের জমিতে ফেলে রাখা হয়েছে। তার পরিবারের সদস্যরা প্রায় ৫০ হাজার টাকার খরচ করে টমেটো, বেগুন, কপিসহ নানা জাতীয় সবজির বীজ রোপণ করেছিল। সবই নদীগর্ভে চলে গেছে। দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতর আলী সরদার বলেন, ‘কয়েক বছরের পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে ইউনিয়নটির অর্ধেকের বেশি নদীতে চলে গেছে। এই ইউনিয়নের প্রতি কারো কোনো নজর নেই। মানুষের হাহাকার দেখে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের কাছে বার বার গিয়েছি। আমাদের একটিই চাওয়া ছিল ত্রাণ নয়, নদী শাসন চাই। কিন্তু সে বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। এ বিষয়ে এখন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুবায়েত হায়াত শিপলু বলেন, ভাঙন অব্যাহত থাকলে দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চ ঘাট হুমকির মুখে পড়বে।

ভাঙন এলাকা পরিদর্শন শেষে রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী বলেন, এভাবে ভাঙতে থাকলে দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট রক্ষা করা মুশকিল হয়ে পড়বে। তাই অন্তত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ঠিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ফেরি ও লঞ্চ ঘাট রক্ষা করতে জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 

পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
  • দেশজুড়ে এর সর্বশেষ
  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়