logo
  • ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬

ঝিনাইদহে ‘লামথি স্কিন ডিজিজ’ নামের এক ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে গরু

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
|  ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৬:২৮ | আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৫:০১
‘লামথি স্কিন ডিজিজ’ নামের এক ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে গরু
ঝিনাইদহে ‘লামথি স্কিন ডিজিজ’ নামের এক ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে গরু
ঝিনাইদহে ‘লামথি স্কিন ডিজিজ’ নামে একটি ভাইরাসে এলাকার গরুগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত গরুগুলোর প্রথমে পা ফুলে যাচ্ছে। এরপর শরীরে জ্বর আসছে। এই জ্বর থাকা অবস্থায় ২-৩ দিনের মধ্যে গোটা শরীরে বসন্তের মতো গুটি গুটি ফোসকা বের হচ্ছে। যা পরবর্তীতে ঘায়ে পরিণত হচ্ছে। 

স্থানীয় পশু চিকিৎসকেরা বলছেন, এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ। আগে কখনও দেখা যায়নি। তবে ৯০ এর দশকে আফ্রিকাতে এই রোগ দেখা দেয়। এই রোগ মশার কামড় থেকে ছড়ায়। এবার বাংলাদেশের অনেক স্থানেই এই রোগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকরা গরুগুলো মশারির মধ্যে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

জেলার প্রাণী সম্পদ অফিস ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, জেলার ছয়টি উপজেলা ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, কালীগঞ্জ, হরিণাকুন্ডু ও শৈলকুপার প্রতিটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে গরুর ভাইরাস জনিত এ রোগ। 

সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকদের গোয়ালের হালের বলদ, দুধের গাভী, সদ্যজাত বাছুর সব বয়সী গরুই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত গরুগুলোর পা ফুলে গেছে, সারা শরীরের বসন্তের মতো গুটি গুটি ফোসকা বের হয়েছে। পায়ের খুরার উপর ক্ষত দেখা দিচ্ছে। আক্রান্ত গরুগুলো স্বাভাবিক চলাফেরা করছে না। সারাক্ষণ ঝিম ধরে থাকছে। কোনও কিছুই ভালোভাবে খেতে চাচ্ছে না।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের লিখন জানান, তার গোয়ালের মোট ৪টি গরুর পা ফুলে গায়ে ফোসকা বের হয়েছে। তার একটি বড় বলদের অবস্থা খুবই খারাপ। পায়ের ফোলা স্থানে ক্ষত হয়ে পচন ধরেছে। ক্ষতস্থানটির মাংস পচে গর্ত হয়ে গেছে। এ গরুটির জন্যই প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু এখনও সুস্থ করতে পারেননি। 

মহেশপুর উপজেলার ভৈরবা গ্রামের উজ্জ্বল হোসেন জানান, কয়েকদিন আগে তার দু’টি গরুর প্রচণ্ড জ্বর আসে। এর একদিন পরেই সারা শরীরে চাক চাক হয়ে ফুলে উঠে। স্থানীয় চিকিৎসকদের দিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, এখন অনেকটা ভালোর দিকে।  

কোটচাঁদপুর উপজেলার তালিয়ান গ্রামের নারায়ণ বিশ্বাস জানান, তার হাল চাষের তিনটি বড় বলদের অবস্থা বেশ খারাপ। স্থানীয় চিকিৎসক দেখিয়ে ওষুধ খাওয়া, কিন্তু সুস্থ হচ্ছে না। 

কালীগঞ্জ উপজেলার পারখালকুলা গ্রামের কৃষাণী মোমেনা বেগম জানিয়েছেন, তার বাড়িতে একটি গাভী পালন করছেন। গাভীটি আট মাস আগে একটি ষাঁড় বাছুর জন্ম দিয়েছিল। তিনদিন আগে এর একটি পা ফুলে জ্বর এসে সারা শরীরে বসন্তের মতো গুটি গুটি ফোসকা বের হয়। এখন কোনও কিছুই খাচ্ছে না। ফলে বাছুরটি ক্রমেই রোগাক্রান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। 

হরিণাকুন্ড উপজেলার সুফিয়া বেগম জানায়, তার দুইটি দেশি জাতের গরু রয়েছে এরমধ্যে একটি গরুর পেটের উপরে গোল করে ফোসকা ওঠে গর্ত হয়ে পচন ধরেছে। যা দেখলে ভয় লাগছে। অনেক টাকার ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে কিন্তু ভালো হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখছেন না। 

----------------------------------------------------------
আরো পড়ুন: বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে এলসি ভ্যালু বাড়িয়েছে ভারত
----------------------------------------------------------

শৈলকূপা উপজেলা কৃষক মনিরুর ইসলাম জানান, তার একটি গরুর এই অবস্থা। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারেই গরু আছে। গবাদিপশু তারা নিজেদের সন্তানের মদো করেই লালন পালন করেন। এগুলো অসুস্থ হয়ে তারা খুব ভেঙ্গে পড়েন। তারা এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য উপজেলা প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরে সহযোগিতা আশা করেন।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতিকুজ্জামান জানান, এই রোগটি দেশের অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে। লামথি স্কিন ডিজিজ (lumphy skin diseases) বলে এক ধরনের ভাইরাস এটা। আগে এই রোগ দেখা যায়নি। 

তিনি বলেন, এই রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটা কম। তবে এতে গরুর অনেক ক্ষতি হয়। গরুগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে যায়। তাছাড়া গরুর মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। 

তিনি আরও বলেন, এই রোগ দেখা দিলে অন্য গরু থেকে আক্রান্ত গরু আলাদা করে রাখতে হবে। রোগটি মশার মাধ্যমে ছড়ানোর কারণে অবশ্যই রোগাক্রান্ত গরুকে মশারির মধ্যে রাখতে হবে। ভালোগুলোও মশারির মধ্যে রাখলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।

জেলার হরিণাকুন্ডু ও শৈলকূপা উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার ডা. সুব্রত কুমার ব্যানার্জী জানান, এ রোগে কৃষকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আক্রান্ত গরুর জ্বর হলে প্যারাসিটামল ধরণের ওষুধ খাওয়াতে হবে। আর এভাবে ৪-৫ দিন অতিবাহিত হলে এবং ক্ষত জায়গা খুব খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 

দুই উপজেলার দায়িত্বে থাকা এই প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা জানান, এ রোগটি ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাচ্ছে। তবে গরুগুলো খুব দুর্বল হয়ে পড়ছে। 

জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার ডা. মো. হাফিজুর রহমান জানান, ভাইরাস জনিত এ রোগটি জেলাব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এ রোগটি এবারই প্রথম দেখা দিয়েছে। রোগের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত রোগ সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে গরুর পক্স হিসাবে চিহ্নিত করে চিকিৎসা দিচ্ছেন বলে জানান।

এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়