• ঢাকা সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬

৮০ বছর বয়সেও বিনা পয়সায় কুরআন শেখান তিনি

রাজীবুল হাসান, গাজীপুর
|  ১২ মে ২০১৯, ১৩:৫৭
আছিয়ার বয়স ৮০। বয়সের ভারে অনেকটা নুয়েও পড়েছেন। মুখের দিকে তাকালেই বলিরেখা চোখে ভাসে। এই বয়সে এসেও থেমে নেই। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ আর শিশুদের কুরআন শেখাচ্ছেন তিনি। একদিন দু’দিন নয়, গত পঞ্চাশ বছরেও বেশি সময় ধরে। তাও আবার টাকা পয়সা ছাড়াই। 
 
ভাবছেন এখনও এমন মানুষ আছে! হ্যাঁ-গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের বেলদিয়া এলাকার আছিয়া বেগম নামে এমন এক বৃদ্ধাকে পাওয়া গেছে। মরহুম আবুল হাশেমের স্ত্রী শুধু কুরআনই শিক্ষা দিচ্ছেন না- ধাত্রী হিসেবেও তার রয়েছে বেশ খ্যাতি। আশেপাশের অন্তত ৫-৬টি গ্রামে গত অর্ধশতাব্দীতে কয়েকশ’ শিশু জন্ম হয়েছে তার হাতে। এলাকাবাসীর কাছে ‘কুরআনের নানী’ হিসেবে পরিচিত এই লড়াকু মহিলা। 
 
এই নারী চরম অর্থ সংকটেই জীবন কাটিয়েছেন। সুখের ছোঁয়া লাগেনি জীবনে। স্বামী মারা গেছেন পঁচিশ বছর আগে। এক পুত্র আর তিন কন্যা সন্তানের জননী আছিয়া গর্ভবতী নারীদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো আর মানুষকে কুরআন শিক্ষা দেয়ার মধ্যেই জীবনের সব সুখ-শান্তি খুঁজে পান। জীবনের দেনা পাওনার হিসেব করেননি কখনো। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসেও শৈশবে দেখা একটা স্বপ্ন আছিয়াকে ঘুমোতে দেয় না। পবিত্র কাবা ঘর দেখা আর প্রিয় নবীর রওজা মোবারক জিয়ারত করা। মৃত্যুর আগে অন্তত একবার যেতে চান প্রিয় নবীর জন্মভূমিতে। ইমন নামে তার এক ছাত্রকে গত কয়েকদিন আগে আছিয়ার স্বপ্নের কথা শোনান। 
 
তিনি বলেন, আস্তে আস্তে তো মৃত্যুর কাছাকাছিই চলে এসেছি। কবে যেন চলে যাই! আছিয়ার এই আফসোসের কথা লিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন ইমন। লেখাটি চোখে পড়ে শ্রীপুর থানায় কর্মরত শহিদুল ইসলাম মোল্লাহ নামে এক পুলিশ অফিসারের। আছিয়ার কাছে ছুটে যান তিনি। আছিয়ার ইচ্ছার কথা মাত্র কয়েক মিনিটের ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন ওই লোক। মাত্র কয়েকদিনে সেই ভিডিওর দর্শক সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখে। আছিয়ার শেষ ইচ্ছা পূরণে এগিয়ে আসেন সাদ্দাম হোসেন নামে এক ব্যক্তি। 
 
পুষ্পদাম নামে একটি রিসোর্টের পরিচালক সাদ্দাম হোসেন নিজের খরচে আছিয়াকে প্রিয় নবীর জন্মভূমি দর্শন ও ওমরা পালনের সকল ব্যবস্থা করে দেন। গত ৪ মে রাতে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে আছিয়া বেগম যান স্বপ্নের মক্কায়। 
 
এর আগে আছিয়ার জীর্ণকুটিরে গিয়ে যখন ভিসা আর বিমান টিকিট নিয়ে সাদ্দাম হোসেন অনন্ত যান তখন এ সব হাতে পেয়ে আছিয়া আনন্দে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। এসআই শহিদুল হক মোল্লাহ বলেন, আছিয়া নানী সারা জীবন মানুষের জন্যই নীরবে নিভৃতে কাজ করে গেছেন। স্বীকৃতিও চাননি কখনো। এই মানুষগুলোর কারণই এখনও আমাদের সমাজে ভালো মানুষ আছে। 
ওমরা যাওয়ার আগে আছিয়া বলেন, এই জীবনে বহু মানুষকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছি। গ্রামের অনেক মানুষের মৃত্যুর পর গোসল করিয়েছি। এখন শুধু শেষ ইচ্ছা প্রিয় নবীর রওজা মোবারক জিয়ারত ও ওমরা করা।
 
কাওরাইদ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার (বেলদিয়া) মো. নুরুল ইসলাম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, উনি খুব ভালো মানুষ। বহুদিন ধরে আমাদের চোখের সামনেই মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে কুরআন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। কাওরাইদ, কালিরবাড়ি, সাদুকপাড়া, বাটপাড়া, বেলদিয়া ও পশ্চিমপাড়াসহ আশপাশের গ্রামে ঘুরে ঘুরে কাজ করেন। বিনিময়ে কোন টাকা পয়সাও নেন না। আমাদের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে উনাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। সবার কাছে তার একটাই চাওয়া ছিল, তিনি মক্কায় যাবে।
 
আছিয়া বেগমের নাতী আলতাফ হোসেন বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে কখনো দাদিকে বাড়িতে বসে থাকতে দেখি নাই। বাড়ির উঠানে এলাকার কিছু ছাত্র পড়ায়ে বেড়িয়ে পড়তো। দাদির সারাজীবনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। প্রতিদিনই দাদির সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছে, উনি খুব ভালো আছে। আর সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
 
এসএস
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়