Mir cement
logo
  • ঢাকা বুধবার, ১৬ জুন ২০২১, ২ আষাঢ় ১৪২৮

সিরাজগঞ্জে ব'জ্রপাতে ২৪ দিনে প্রা'ণ হারালেন ২১ জন

সিরাজগঞ্জে বজ্রপাতে ২৪ দিনে প্রাণ হারালেন ২১ জন
ফাইল ছবি

গত ২৪ দিনে বজ্রপাতে সিরাজগঞ্জে নিহত হয়েছেন নারী, স্কুলছাত্র ও কৃষকসহ অন্তত ২১ জন। এর মধ্যে শাহজাদপুরে ৮ জন, উল্লাপাড়ায় ৫ জন, তাড়াশে ২ জন, কামারখন্দে ১ জন, রায়গঞ্জে ১ জন, বেলকুচিতে ১ জন, কাজীপুরে ২ জন ও চৌহালীতে ১ জন মারা যায়।

হঠাৎ করে বজ্রপাত বৃদ্ধি পাওয়াই আতংকিত হয়ে পড়েছেন এসকল এলাকার খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকেরা। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে নিহতদের মধ্যে অনেকের পরিবারের সদস্যরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বজ্রপাতে আহতরাও দুঃসহয় ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে জীবনযাপন করছেন।

নিহত ২১ জনের মধ্যে ৬ জনকে তাৎক্ষনিক অনুদান প্রদান করা হলেও কোন সরকারি সহায়তা পাননি বাকি পরিবারগুলো। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার জানিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও আবেদন পাওয়া গেলে অনুদান প্রদান করা হবে বজ্রপাতে নিহতদের বাকি পরিবারগুলোকেও।

নিহতদের পরিবার, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়-সূত্র জানায়, কৃষি-প্রধান সিরাজগঞ্জের বিলাঞ্চলে ধান কাটার ভরা মৌসুম মে থেকে জুন মাস। এই সময়ে বিশেষ করে জেলার বিলাঞ্চলে ধান কেটে ধানের জমিতেই অস্থায়ী চাতাল তৈরি করে ধান মাড়াই, ধান সিদ্ধ করা থেকে শুকানো ও খড় শুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসার উপযোগী করে তোলে কৃষকেরা। অনেক কৃষি পরিবার ও কৃষকেরা এ সময়ে বসবাসও করে চাতালে টিনের চালায় নির্মিত অস্থায়ী ঘড়ে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী একই সময় অর্থাৎ মে থেকে জুন মাসে বজ্রপাত হওয়ার প্রবণতাও বেশি থাকে। চলতি বছর সিরাজগঞ্জের বিলাঞ্চলের গাছ-পালা বা ঘরবাড়ি বিহীন ফাকা মাঠে এই সময়েই অধিক পরিমাণে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। বজ্রপাতে বেশিরভাগই মারা যাচ্ছেন ফসলি জমির মাঠে কাজ করতে যাওয়া কৃষকেরাই।

চলতি বছরে বজ্রপাতে প্রথম প্রাণহানির ঘটনাটি ঘটে সিরাজগঞ্জের তাড়াশে সোমবার (১৭ মে) বিকেলে বজ্রপাতে উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের নাড়া তেঘুরি গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের স্ত্রী হালিমা খাতুন (৫৫) নিহত হয়।

একই দিন (সোমবার) সন্ধ্যায় জেলার কাজিপুরে দুর্গম চরাঞ্চল চরগিরিশে বজ্রপাতে রুবেল রানা (২৮) নামের এক কৃষক ও রায়গঞ্জের ধামাইনগড়ের সিংপাড়া গ্রামে মাঠে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে নিরঞ্জন সিং (২১) নামে হোমিও মেডিকেল কলেজের এক আদিবাসী ছাত্রের মৃত্যু হয়। তিনি ওই গ্রামের অধীর সিংয়ের ছেলে।

গত ২৪ মে (সোমবার) একই দিনে জেলার শাহজাদপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের দুগালি, কায়েমপুর ইউনিয়নের চিথুলিয়া ও উল্লাপাড়া উপজেলার কৃষ্ণপুরে বজ্রপাতে এক স্কুলছাত্রী, নারীসহ ৪ জন নিহত হয়।

নিহতরা হলেন, শাহজাদপুর উপজেলার গালা ইউনিয়নের দুগলি গ্রামের আজম ব্যাপারীর ছেলে নাজমুল (১৫), কায়েমপুর ইউনিয়নের চিথুলিয়া গ্রামের আজগর আলীর ছেলে হাসেম আলী (২৫) ও সোলাইমান মোল্লার স্ত্রী ছাকেরা বেগম (৫৬) এবং উল্লাপাড়া উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের মো. মোশারফ হোসেনের মেয়ে, স্কুলছাত্রী মোহনা খাতুন (১৭)।

গত ৩০ মে (রোববার) শাহজাদপুর উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের ব্রজবালা লেদুরপাড়া গ্রামে বজ্রপাতে প্রাণ হারান দুই কৃষক। নিহতরা হলেন, ওই গ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে সোহেল রানা (৪২) ও আলম মিয়ার ছেলে জাহিদুল ইসলাম (২৫)।

গত মঙ্গলবার (১ জুন) সকালে জেলার কামারখন্দ উপজেলায় বজ্রপাতে ইসলাম মণ্ডল (৩০) নামের এক গো-খাদ্য ব্যবসায়ী নিহত হন। তিনি ওই উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের বড়ধুল গ্রামের ইয়াহিয়া মণ্ডলের ছেলে।

এরপর বৃহস্পতিবার (৩ জুন) উল্লাপাড়া উপজেলার বাঙ্গালা ও বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নে ২ ভ্যান-চালকের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। নিহতরা হলেন, উপজেলার বাঙ্গালা ইউনিয়নের পাড়মোড়দহ গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে সেলিম রেজা (৩০) ও বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের হাওড়া গ্রামের লাল চাঁন মিয়ার ছেলে আব্দুল আলিম (৩৭)।

রোববার (৬ জুন) বজ্রপাতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও বেলকুচি উপজেলায় এক নারীসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রপাতে নিহতেরা হলেন, জেলার শাহজাদপুর উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের চর আঙ্গারু গ্রামের আমানত হোসেনের ছেলে জুয়েল রানা (২৪), নরিনা ইউনিয়নের বাতিয়া গ্রামের ভোলা পণ্ডিতের ছেলে আলহাজ পণ্ডিত (৫০), উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানার আঙ্গারু গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে রফিকুল ইসলাম (৪৫), উধুনিয়া ইউনিয়নের আগদিঘল গ্রামের শাহেদ আলীর ছেলে ফরিদুল ইসলাম (১৫) ও বেলকুচি উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চর শমেসপুর গ্রামের ইউসুফ আলীর স্ত্রী লাইলী খাতুন (৬২)।

সোমবার (৭ জুন) বজ্রপাতে জেলার তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের রোকনপুর গ্রামে আব্দুল আজিজ (৩৩) নামে একজন নিহত হয়।

মঙ্গলবার (৮ জুন) জেলার চৌহালী উপজেলার এনায়েতপুর থানার খুকনিতে জহর উদ্দিন (৫২) নামে একজন বজ্রপাতে প্রাণ হারান। এছাড়া এই সময়ে কাজিপুরে আরও এক নারী ও শাহজাদপুরে এক কৃষক নিহত হয়। যাদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।

নিহত হাসেম আলীর নববধূ স্ত্রী রোজিনা খাতুন আরটিভি নিউজকে বলেন, ছয় মাস হয়নি আমাদের বিয়ে হয়েছিল। বজ্রপাতে স্বামী হারিয়ে আমি আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন হারিয়েছি। আমি বা আমার পরিবার কোন সরকারি সহায়তা পাইনি।

বজ্রপাতে আহত হাসমত আলী বজ্রপাতের দুঃসহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে জানান, আল্লাহ প্রাণ ভিক্ষা দিয়েছেন। এখন মেঘ দেখলেই ঘড় থেকে বের হতে ভয় পাই। আমি দিনমজুর কৃষক। জমিতে কাজ না করলে খাবো কী? পরিবার নিয়ে চলবো কিভাবে।

বজ্রপাতে পিতা হারানো রুবেল হোসেন জানান, আমি স্কুলে পড়ি। বাবা কৃষক ছিলো। আমরা তিন ভাই-বোন ও মা আছে। আমাদেরও এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ বাবাই ছিলো একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সরকার বা কেউই আমাদের কোন সহায়তা করেনি।

স্থানীয় সমাজকর্মী শাহজাদপুরের কায়েমপুর ইউনিয়নের রুবেল হোসেন আরটিভি নিউজকে জানান, কৃষি-প্রধান বিলাঞ্চলের আমাদের ইউনিয়নেই ৬ জন মারা গেছে বজ্রপাতে। এরমধ্যে ৪ জনই কৃষক। সরকারিভাবে বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় বিষয়ে প্রচারণা ও বজ্রপাত নিরোধক তালবৃক্ষ, দণ্ড স্থাপন করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডি আর ও) আব্দুর রহিম আরটিভি নিউজকে জানান, বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। কারণ আমাদের প্রচুর পরিমাণ বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন ও তাল বৃক্ষ রোপণ করা নেই। আমরা চেষ্টা করছি মানুষকে পোষ্টার, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করতে।

তিনি আরও জানান, বজ্রপাতে প্রাণ হারানো ২১ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে। বাকি পরিবারগুলোর তথ্য পেলে তাদেরকেও অনুদান প্রদান করা হবে।

জিএম

RTV Drama
RTVPLUS