logo
  • ঢাকা বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

রাখাইনরা মাতৃভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চায়

#মাতৃভাষা #রাখাইন #কলাপাড়া
ছবি সংগৃহীত

যথাযথ চর্চা, মাতৃভাষায় শিক্ষা সংকট এবং সংরক্ষণের অভাবে নানামুখী সংকটে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী রাখাইন সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা।

ক্ষয়িষ্ণু এ জাতিসত্ত্বার নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা মুখে ব্যবহার করলেও লিখতে বা পড়তে পারছে না।

যথাযথ পৃষ্টপোষকতা না পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও প্রচলন নিয়ে শঙ্কত এ জাতিগোষ্ঠী।

জানা গেছে, ভাগ্য বিতারিত হয়ে ১৭৮২ সালে মায়ানমারের আরাকান প্রদেশ থেকে বরগুনার জনমানবহীন তালতলীতে এসে বসতি স্থাপন করে নৃ-জনগোষ্ঠী রাখাইন সম্প্রদায়। পরে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে বরগুনা জেলার তালতলী এবং পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়ার উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে তোলে বসতি। রাজকীয় জীবন ধারায় অভ্যস্ত এ জাতিগোষ্ঠী হিংস্র জীবজন্তুর সঙ্গে মোকাবেলা করে পরিপূর্ণ জঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে তোলে আবাদি জমি। ধীরে ধীরে এদের পাশেই গড়ে ওঠে বাঙালি বসতি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারায়, ভাষাগত দূরত্বের কারণে দিন দিন পিছিয়ে পড়ে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা থেকে। হয়ে পড়ে অনগ্রসর জাতি। ভূমি বিরোধসহ নানা ঝামেলায় জড়িয়ে এ জাতিগোষ্ঠীর অনেকে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে বার্মায়।

বর্তমানে কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২৮টি পাড়ায় প্রায় ৩০৪টির মতো পরিবার বসবাস করে আসছে। তারমধ্যে মিশ্রিপাড়া, লক্ষ্মীপাড়া, মম্বিপাড়া, দিয়ার আমখোলা পাড়া, গোড়াআমখোলা পাড়া, থঞ্জুপাড়া, কালাচাঁনপাড়া, নয়াপাড়া, মংথেপাড়া, নাইউরীপাড়া, কেরানীপাড়া, বেতকাটাপাড়া, বৌলতলীপাড়া, নাচনাপাড়া উল্লেখ্যযোগ্য।

মিয়ানমারের উপভাষা রাখাইন ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত এ জাতিগোষ্ঠীর জন্য শুরু থেকেই মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় বিকল্প হিসেবে বাংলা ভাষাতেই লেখাপড়া করতে হচ্ছে।

ফলে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও তারা নিজেদের ভাষা পড়তে এবং লিখতে পারছে না এ সম্প্রদায়ের শিশুরা।

আমজেদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী জেমাসো বলল, আমার স্কুলে আমাদের ভাষা শিখানো হয় না। তাই আমরা প্রতিদিন বিকেলে মন্দিরে এসে ঠাকুরের কাছে আমাদের ভাষা শিখি।

প্রত্যেকটি জাতিসত্ত্বার মতো কলাপাড়ার নৃ-জনগোষ্ঠী রাখাইন সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ না থাকায় বাংলা ভাষাতেই লেখাপড়া করতে হচ্ছে এ জনগোষ্ঠীর শিশুদের। বাড়ি কিংবা আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নেই ভাষার চর্চা। দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে পাঠ্যপুস্তকের সংকট। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে মাতৃভাষায় পাঠগ্রহণ। ফলে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারলেও পড়ালেখা করতে পারবে না নতুন প্রজন্ম।

মহিপুর কো-অপ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র লুংখ্যমং বলল, আমার স্কুলে আমাদের ভাষা শিক্ষার কোনও শিক্ষক নাই। মন্দিরে এসে আমাদের ভাষা শিখছি। এখন মোটামুটি পড়তে ও লিখতে পারি।’

ক্ষয়িষ্ণু এ সম্প্রদায়ের বিদ্যালয়গামী শিশু কিশোররা চায় মায়ের ভাষা যেভাবে মুখে বলছে সেটা পড়তে ও লিখতে। ফলে শিশু শিক্ষার্থীসহ সকলের মাঝে ভাষাগত চর্চা টিকিয়ে রাখতে নিজেদের সীমিত পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির নিচে পাঠশালা খুলে রাখাইন মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা কারিতাস আইসিডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে মায়ানমার থেকে বিভিন্ন শ্রেণির বই সংগ্রহ করে স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদান করাচ্ছেন। তবে এখানে রয়েছে পৃষ্ঠপোষকতাসহ নানা সমস্যা।

মহিপুর কো-অপ্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী খেন এ লাই রাখাইন বলল, ‘মন্দিরে এসে আমাদের ভাষা শিখে এখন পড়তে ও লিখতে পেরে আনন্দ পাচ্ছি। যদি সরকার সুনজর দিতো তাহলে ভালো করে শিখতে পারতাম।

বাড়ির নিচে সীমিত পরিসরে দারিদ্রতায় নিমজ্জিত শিক্ষার্থীদের পাঠদান কষ্টকর উল্লেখ করে গোড়াআমখোলা পাড়ার তেননান রাখাইন বলেন, রাখাইন ভাষা চর্চা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে লিখিত এবং পঠিত কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অনেকেই মুখে বলতে পারলেও লিখতে ও পড়তে পারে না। এ কারণেই মায়ের ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে মায়ানমার থেকে বই সংগ্রহ করে পাঠদানের উদ্যোগ নিয়েছি। এতেও রয়েছে নানামুখী সমস্যা। রাখাইন বর্ণমালার পাঠ্য বইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে রাখাইন শিশুরা যেন নিজের ভাষাকে ধারণ ও লালন করতে পারে।

রাখাইন অধিকার আন্দোলন কর্মী মংম্যায়া বলেন, জাতিগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের অধিকার এখনও সংবিধানিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের ৪৫টি নৃ-জনগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণেও রাষ্ট্রের উদ্যোগ ছিল না। অনেক ভাষার অনেক শব্দ এ কারণে হারিয়ে গেছে। যা কখনও হয়তো উদ্ধার করা যাবে না।

এ বিষয় কলাপাড়া উপজেলার নির্বাহী অফিসার আবুল হাসনাত মোহাম্মাদ শহীদুল হক আরটিভি নিউজকে বলেন, রাখাইনদের মাতৃভাষা সংরক্ষণে জন্য শিগগিরই একটি স্বতন্ত্র স্কুল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

জেবি

RTV Drama
RTVPLUS