logo
  • ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

হাতিয়ার ভাসানচর, সাগরের বুকে জেগে উঠা জনমানবহীন ছোট শহর

হাতিয়ার ভাসানচর, সাগরের বুকে জেগে উঠা জনমানবহীন ছোট শহর
ভাসানচর
রাতের আধারে আলোর ঝলকানি, কেওড়া বাগানের মাঝে সারি সারি সুউচ্চ আশ্রয়কেন্দ্র, নান্দনিক নকশার দালান, সুবিন্যস্ত পাকা আধাপাকা সড়ক, সড়কের এক পাশে সারি সারি পিলারে আলোকসজ্জা লাইট, উচ্চ বেড়িবাঁধে সুরক্ষিত দ্বীপ, জাহাজ ভেড়াবার বিশাল জেটি, সারি সারি লাল রঙের আবাসন, চট্টগ্রাম থেকে সাগর পথে হাতিয়া আসতে যে কারো চোখে পড়বে দ্বীপটি। এটি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বসবাসের জন্য নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসান চরের চিত্র।

মেঘনা নদী থেকে দেখতে অনেকটা সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো এই দ্বীপটি। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয়ণের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে এই ভাসান চর।

দেশের অসংখ্য পর্যটক মুখিয়ে আছে দ্বীপটিকে একনজরে দেখবার জন্য। কিন্তু যাদের জন্য এ আবাসন প্রকল্প তারা কি আসছে? তবে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আশাবাদ-সিদ্ধান্তহীনতা থাকলেও কিছু রোহিঙ্গা অবশ্যই আসবে। কারণ কক্সবাজারের সেই অপরিসর ক্যাম্পগুলোর চেয়ে অনেক উন্নত পরিবেশ এখানে।

নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ভাসানচর, বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন একটি দ্বীপ যা এখনও লোকালয় হিসেবে স্বীকৃত নয়। এই চরের পার্শ্ববর্তী উপজেলা হাতিয়া ও সন্দ্বীপে শত বছরেও যে আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি, ভাসানচর তারচেয়েও বেশি পেয়েছে মাত্র দুই বছরে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কল্পনার চেয়েও সুন্দর এ ভাসান চর। সদ্য জেগে ওঠা দ্বীপ এমন দৃষ্টিনন্দন চেহারায় উদ্ভাসিত হতে পারে তা অকল্পনীয়। আর এমন হয়েছে নৌবাহিনীর সরাসরি তদারকিতে ১০ থেকে ১৫ হাজার কর্মীর দিনরাত পরিশ্রমে। বিশেষ করে ১৭৬ বছরে বাংলাদেশের উপকূলে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় পর্যালোচনা করে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বেড়িবাঁধ। দ্বীপটি এখনই ১ লাখ রোহিঙ্গা ধারণের জন্য প্রস্তুত।

নোয়াখালী সদ্য যোগদান করা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান একটি টিম নিয়ে সম্প্রতি সরেজমিনে দেখতে যায় ভাসানচর। ভাসান চরে নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য তৈরি একটি সুসজ্জিত বাংলোতে জেলা প্রশাসকের উদ্দেশ্যে নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তারা প্রোজেক্টরের মাধ্যমে ভাসানচরের বর্তমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দেন।

যাতে বলা হয়েছে দ্বীপের ১৩ হাজার একর ভূমির মধ্যে ৬ হাজার ৪২৭ একর জায়গা কখনও জোয়ারের পানিতে ডোবে না। এ স্থানটুকু থেকে নির্বাচন করা হয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্প-৩ এর ভূমি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় ২০১৮ সালের ৫ জানুয়ারি শুরু হয় প্রকল্পের কাজ।

প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। পরে সড়ক সম্প্রসারণ, বেড়িবাঁধ উঁচুকরণ এবং কাজ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় ৭৮২ কোটি টাকা বেড়ে উন্নীত হয় ৩ হাজার ৯৪ কোটি টাকায়। কাজ প্রায় ৯৯ ভাগই শেষ। এখন পেইন্টিং এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কিছু কাজ বাকি। যেটুকু হয়েছে তাতে ১ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করতে পারবে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে।

জেলা প্রশাসকের উদ্দেশ্যে নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, খেলার মাঠ, তিনটি মসজিদ, একটি পরিপূর্ণ থানা কমপ্লেক্স ও তিনটি খাদ্যগুদাম ছাড়াও দ্বীপের মাঝামাঝি জায়গায় তৈরি করা হয়েছে সুউচ্চ একটি লাইট হাউস, যার মাধ্যমে ওই চ্যানেলে চলাচলকারী জাহাজগুলো সাগরে চলাচলে সঠিক নির্দেশনা পাবে।

ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ণের জন্য তৈরি হয়েছে ১২০টি ক্লাস্টার। প্রতিটি ক্লাস্টারে ১২টি হাউস, একটি সাইক্লোন শেল্টার, একটি পুকুর ও খেলার মাঠ নিয়ে একটি গুচ্ছগ্রাম। এভাবে ১২০টি গুচ্ছগ্রামে নির্মিত হয়েছে ১ হাজার ৪৪০টি আবাসন ঘর। একটি আবাসন ঘরে ১৬টি কক্ষ, প্রতি কক্ষে ৪ জনের একটি পরিবার বসবাস করলে মোট ৯২ হাজার ১৬০ জন বসবাস করতে পারবে। এছাড়া প্রতি ক্লাস্টারে ১টি করে মোট ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে যার মধ্যে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটিতে ৪ সদস্য বিশিষ্ট ২৩টি পরিবার বসবাস করলে মোট ১০০টিতে ৯ হাজার ২০০ জন বসবাস করতে পারবে। অন্য ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাস হলে বসবাসকারীরা দ্রুতই আশ্রয় নিতে পারবে শেল্টারে। রয়েছে দুটি ২০ শয্যার হাসপাতাল, ৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক। বসবাসকারীদের জন্য আছে রান্নাঘর, নারী-পুরুষের জন্য পৃথক পৃথক শৌচাগার ও পানীয় জলের সুবিধা। অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দুটি ফায়ার জিপসহ একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। ব্যারাক হাউসসমূহে অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম সংযোজন করা হয়েছে।

প্রতি ক্লাস্টারে নির্মিত পুকুরের পানিও অগ্নিনির্বাপণ কাজে ব্যবহার করা যাবে। প্রতিটি শেডেই রয়েছে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা। এছাড়া নৌবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতি থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সুদৃঢ়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা এলে যাতে থাকতে পারেন সে জন্য নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বাংলো।

বর্তমানে ভাসান চরে রয়েছে ৩০৬ জন রোহিঙ্গা। অবৈধভাবে সাগর পথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেয়ার সময় তারা ধরা পড়ে। টেকনাফের আশ্রয় শিবিরের পরিবর্তে তাদের রাখা হয়েছে ভাসান চরে। এরমধ্যে ৯৭ জন পুরুষ, ১৭৬ জন নারী এবং ৩৩ জন শিশু রয়েছে। তবে পুরো পরিবার রয়েছে এমন নয়। তাদের স্বজনদের মধ্যে কেউ বা রয়েছে টেকনাফের কুতুপালং ক্যাম্পে আবার কেউ বা রয়েছে বিদেশে। এখানে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের কৃষি, গবাদি পশু পালন, হস্ত শিল্প ও পারিবারিক কাজে আগ্রহী করতে সাময়িক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

ভাসানচরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা ভাসানচরের আবাসনগুলো যত দ্রুত সম্ভব ব্যবহার করা প্রয়োজন। তাছাড়া দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাজারও কোটি টাকার প্রকল্প বিনষ্ট হতে পারে। রোহিঙ্গারা সেখানে যেতে রাজি না হলে দেশের গৃহহীনদের হলেও বসবাসের সুযোগ দেয়া যেতে পারে।

জিএম/এফএ/এসএস

RTVPLUS