• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সুইজারল্যান্ডের মতো এমন ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটতো

বাকি উল্লাহ
|  ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:০৮ | আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৩৩
জেনেভা শহর পার্লামেন্টের এক সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারের হিসাব নিরীক্ষা বিভাগের এক তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি ২০১৭ সালে শুধু টেলিফোন বিল পরিশোধে সরকারি অর্থ ব্যয় করেছেন ১৭ হাজার ফ্রাংক।

অভিযোগের মধ্যে আরও যে বিষয়টি গুরুতর হিসাবে আসছে তাহলো, তিনি একটি রেস্টুরেন্টে দামি শ্যাম্পেইন এবং ককটেলের বিল ব্যক্তিগত কার্ডের পরিবর্তে সরকারি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পরিশোধ করেছেন। আরও যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তাহলো- জেনেভা শহরের পার্লামেন্টের এই সদস্য ব্যক্তিগত ছুটিতে গিয়ে ট্যাক্সি বিল পরিশোধ করেছেন সরকারের দেয়া ক্রেটিড কার্ড থেকে।

এখানে উল্লেখ্য, সুইজের সব সরকারি কর্মকর্তারা বিশেষ করে সব কামরার পার্লামেন্ট সদস্যদের বিপরীতে সরকারি খরচের জন্য সরকারি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা হয়ে থাকে। এই কার্ড থেকেই সরকারি কর্মকাণ্ডের সব বিল সাথে সাথেই কর্মকর্তারা পরিশোধ করে দেন।

জেনেভার এই কর্মকর্তা নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে জানিয়েছেন, তিনি রেস্টুরেন্টে যে দামি শ্যাম্পেনের বিল পরিশোধ করেছেন তা আসলে ভুলবশত হয়েছে। তিনি কিছুটা ড্রাংক্ট থাকার কারণে ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বদলে সরকারি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিলটি পরিশোধ করেছেন।

টেলিফোন বিলের বিষয়ে তিনি বলছেন, ওটা স্বাভাবিক এবং সরকারি কাজেই তিনি টেলিফোনটা বেশি ব্যবহার করেছেন। সরকারি অডিট বিভাগের তদন্ত অফিসার জেনেভার ওই সংসদ সদস্যের যুক্তি মানতে নারাজ। সরকারি অতিরিক্ত খরচের টাকা রাষ্ট্রীয় তহবিলে ফেরত দেবার আদেশ দিয়েছেন সরকারি অডিট বিভাগ যা রেকনুংহোপ নামে পরিচিত।

বিষয়টি এখন গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত। স্বাভাবিক খরচের চেয়ে এটি বেশি এবং অন্যান্য সদস্যরাও এ পরিমাণ অর্থ খরচ করেননি। সুতরাং বিষয়টি অবশ্যই সমালোচনার।

এর বিপরীতে যদি বাংলাদেশের কথা বলি তাহলে কী বলতে পারি আমরা?

দেশের একজন সংসদ সদস্য বছরে শুধু থোক বরাদ্দ পান পাঁচ কোটি টাকা। কোথায় খরচ করছেন তা জানবার কোনও অডিট আমাদের দেশে বিদ্যমান নেই। এবার সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রস্ত বা ঋণখেলাপিরা আগের দিন ঋণ পরিশোধ করে সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন নিতে পারবেন। আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে না, শুধু টিন থাকলেই হবে। হলফনামায় সম্পদের বিবরণ জনগণ জানতে পারবেন না।

পাঁচ বছরে ২৫ কোটি টাকা কেবল থোক বরাদ্দ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন একজন সংসদ সদস্য। অথচ তার কত ভাগ জনগণের সেবায় খরচ করেন বা করেছেন তা কেবল খোদাতালা ছাড়া আর কারও জানার উপায় নেই। কিন্তু প্রত্যেক সংসদ সদস্যের হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর অডিট থাকা উচিত। যেহেতু তাদের জন্য সরকারি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। পাঁচ কোটি টাকার এক টাকাও যদি কেউ ব্যক্তিগত খরচে ব্যয় করে থাকেন তবে তা অপরাধ। জনগণের এই টাকা জনগণকে ফেরত দেবার নিয়ম থাকতে হবে।

এ তো শুধু থোক আর থোক বরাদ্দের কথা বললাম, একজন সংসদ সদস্য কত টাকা উপর্জন করেছেন আর কত টাকার সম্পদ তার আগে ছিল তা তো হলফ নামাতেই আছে। কোটি কোটি টাকার ব্যবধান রয়েছে এক হলফনামা থেকে অন্য হলফনামায়। বর্তমানে সব দল নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। কোনও ফ্রন্টই বলছেন না যে জনগণকে হলফনামাটা দেখান। সংসদ সদস্যসহ সকল নির্বাচনী সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসেব জনগণের জন্য উম্মুক্ত করে দিন। দেয়ার কথা ছিল দেয়াও হয়েছিল। তারপর একদমই বন্ধ হয়ে গিয়েছে সে ব্যবস্থা। কেন? কার স্বার্থে ?

উন্নত দেশ বানাতে হলে প্রথমত দেশের নির্বাচিত সদস্যদের চরিত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করতে হবে। তারা সবাই ভালোমানুষ জানি। তবে তারা নিজেরা কেন নিজেদেরকে অডিটের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছেন না? উন্নত সব দেশে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীদেরকে অডিটেরের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেকে জনগণের কাছে প্রকাশ করে, নিজেকে তুলে ধরে সে কেমন? তার সম্পদের পরিমাণ কত? আমরা কেন তা করছি না?

এ কাজটি করা হলে আর জনগণের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে প্রতিনিধি হলে দেখবেন দেশের অধিকাংশ মানুষই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে আসতেন না বা আসবেন না। তখন কাজটি হবে কঠিন, কেবলই সেবামূলক এবং নিজেকে উৎসর্গ করার। কঠিন এই সেবামূলক কাজটি করতে সংসদ সদস্য হতে তারা আর উৎসাহিত হতেন না, চেলচালাইয়া এমপি হতে আসতেন না। এখানে কেবলই থাকতেন ত্যাগী জনগণের সেবায় ব্রত নেয়া বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর লোকেরা।

আজ জনগণের প্রতিনিধি হওয়াটা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ব্যবসা। বিনিয়োগের জায়গা। কত টাকা বিনিয়োগ করে কত টাকার রাজনীতি উদ্ধার করা যাবে সে ব্যবসা। তাই সব পেশার মানুষ এই বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

মাননীয় রাষ্ট্রপতি সে কথাটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে বলে এসেছিলেন। রাষ্ট্রপতি নিজেও আমাদের মতো কেবল অভিযোগই দিয়ে গেছেন কিন্ত উত্তরণের পথটিতে তিনি নিজেও অন্ধকারেই রয়েছেন। সংসদ সদস্যদের কেবল অডিটের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন, দেখবেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় খাত আর ব্যক্তিগত খাতকে আলাদা করে ফেলুন। রাষ্ট্রীয় সকল খরচের হিসাব দেবার জন্য সকলকে বাধ্য করুন।

দেখবেন কেউ আর দেশের এমপি হতে, ব্যবসা করতে আসবেন না। কারণ তখন আর এখানে বিনিয়োগ করে কোনও লাভ হবে না। বিনা পারিশ্রমিকের এ কাজটি করতে তখন আর রাজনীতি ব্যবসায়ীরা আর আগ্রহ দেখাবেন না। রাজনীতির মাঠে তখন থাকবেন কেবল আদর্শের লোকজন।

সুইজের একজন এমপি কত টাকা টেলিফোন করেছেন সেজন্য এ অবস্থা! দেখুন তো আমাদের সাংসদেরা কত শত কোটি সরকারের টাকা ব্যয় করছেন অবলীলায়। একজন সংসদ সদস্যের বিদেশে বাজার করা দেখলে অবাক বনে যেতে হয় আমাদের। একজন আমলার বিদেশে বাজার করা দেখলে আমাদের অবাক বনে যেতে হয় আমাদের। দুদককে একটি কলার মতো ঝুলিয়ে জনগণকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ওই দুদক আসছে, আছে তোমরা সতর্ক হও।

কেন? স্বচ্ছতা আনতে তো এই ডিজিটাল যুগে কোনও কষ্ট হবার কথা নয়।

ডিজিটাল হলফনামাটা জনগণের কাছে প্রকাশ করুন এবং তা সংসদ নির্বাচনের সেই ৯০ দিন আগেই প্রকাশ করবার বাধ্যবাধকতার নিয়ম চালু করুন। জনগণ দেখুক জনগণের টাকাটা সংসদ সদস্য কোথায় খরচ করছেন?

আরও পড়ুন :

সি/

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়