DMCA.com Protection Status
  • ঢাকা সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬

‘বিদেশ গেলে ময়লা পকেটে রাখি, নিজ দেশে যেখানে সেখানে ফেলি’

এস এম সাজ্জাদ হোসেন, আরটিভি অনলাইন
|  ০২ এপ্রিল ২০১৯, ১৫:৩৪ | আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০১
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। ইসলামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় প্রত্যেক ধর্মেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। 

নিজেকে সুন্দর রাখার প্রথম এবং প্রধান উপায় হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। তবে শুধু নিজেকে পরিষ্কার রাখলেই হবে না পরিষ্কার রাখতে হবে সমাজ ও দেশকে।

পৃথিবীতে এমন কিছু দেশ আছে যেখানে গেলে মনেই হবে না যে ময়লা বলতে কিছু আছে। তারা নিজেদের পাশাপাশি নিজের দেশকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। 

কিন্তু আমাদের দেশে ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। যার যেভাবে ইচ্ছা যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলছে। দোকান থেকে খাবার কিনে সেটি খেয়ে তার প্যাকেট রাস্তায়ই ফেলা হচ্ছে। রাস্তার পাশে বিভিন্ন খাবারের দোকান থেকে খাবার খেয়ে তার উচ্ছিষ্ট অংশ রাস্তায় ফেলা হচ্ছে। 

বিদেশ ফেরত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে যারা ঘুরতে বিদেশে যায় তাদের অনেককে দেখি ময়লা ফেলার জায়গা না পেয়ে পকেটেও রাখে। অথচ নিজের দেশে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছে। একশ বার থুতু ফেলছে, কলার খোসা, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট বা পলিথিন যেখানে সেখানে ছুড়ে ফেলছে। এসব কেমন কথা। আসলে শক্ত আইন নেই বলেই এই ধরণের কাজ করা হচ্ছে।

ঢাকায় একটু বৃষ্টি হলেই দেখা যায় যে রাস্তায় বা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার পরিমাণটা কেমন। রাস্তায় ফেলা ওইসব ময়লার কারণে সুয়ারেজ লাইন বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী জানান, অনেকে বলে আমরা নাকি কাজ করি না। আসলে আমরা কাজ করি, রাস্তায় ময়লা পরিষ্কার করে কূল পাই না। সবাই রাস্তায় ময়লা ফেলে। এই ময়লার জন্যই অনেক জায়গায় পানি জমে থাকে।      

তিনি আরও জানান, মেইন রোড বা গলির ভেতর রাস্তার পাশে যেসব দোকান আছে মানুষ ওখান থেকে এইটা-সেইটা খায় এবং ময়লা রাস্তায় ফেলে। দোকানদারদেরও দেখি ময়লা রাস্তায় ফেলতে।

ইতালির ভেনিসে বেশকয়েক বছর ধরে ব্যবসা করছেন বাংলাদেশের নজরুল ইসলাম। নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় আরটিভি অনলাইনের। তিনি বলেন, ইতালিতে বিভিন্ন শহরে ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে ফেলা হয় না। এটি একদিকে যেমন আইনত দণ্ডনীয়, অপরদিকে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা অধিবাসীদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এখানে বসবাসরত প্রবাসীরাও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

তিনি জানান, ময়লা ফেলার জন্য রাস্তার পাশে তিন রঙের তিনটি ডাস্টবিন রয়েছে। একটি গৃহস্থালি ময়লা, একটিতে প্লাস্টিক ও কাচ জাতীয় ময়লা ও অপরটিতে কাপড় জাতীয় ময়লা ফেলা হয়। সবাই নিজ দায়িত্বে নির্দিষ্টস্থানে ময়লা রেখে যায়। কেউ রাস্তায় কোনও ময়লা ফেলে না।

তিনি আরও জানান, পথচারীরা কেউ ময়লা ডাস্টবিন ছাড়া অন্য কোথাও ফেললে তার জরিমানা করা হয়। এছাড়াও কাউকে রাস্তায় ময়লা ফেলতে দেখলে অন্যরা তাকে ওই ময়লা  ডাস্টবিনে ফেলতে বাধ্য করে। 

তিনি জানান, আমাদের দেশের মানুষ এসে এখানে আইনরে প্রতি সম্মান দেখান। কিন্তু নিজের দেশে কেন তারা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে সেটি বোধগম্য নয়। এজন্য সবাইকে আইনের প্রয়োগ হতে হবে কঠোর।

তেহরানে কর্মরত সোহেল আহম্মেদ নামে বাংলাদেশি এক সাংবাদিক বলেন, এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বড় শহর ইরানের রাজধানী তেহরান। তেহরানের অধিকাংশ অংশই ছোট ছোট পাহাড়ের ওপর। 
৭৩০ বর্গ কিলোমিটারের এই শহরে এক সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। যার জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। ইরান শীত ও গরম প্রধান দেশ। তবে বৃষ্টিপাত একেবারেই হয় না তা কিন্তু নয়। কখনও তেহরান শহরে বৃষ্টির পানি জমেছে এমন নজির এখনও দৃষ্টিপাত হয়নি। এছাড়া শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও এতোটা উন্নত যে দুর্গন্ধযুক্ত পানি কখনও নগরবাসীকে দেখতে হয় না।

তিনি বলেন, ঘরের ময়লা আবর্জনা তেহরানবাসীর রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হয়। রাত ১২টার পর সিটি করপোরেশনের গাড়ি সেসব স্থান থেকে ময়লা ভোরের আগেই অপসারণ করে। যদি কোনও নাগরিক ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে না রাখে তাহলে তাকে গুনতে হয় বড় জরিমানা। আবার সিটি করপোরেশনও যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে তাহলে জেল ও চাকরিচ্যুত হতে হয়।

তিনি আরও বলেন, তেহরানে প্রতিটি রাস্তা বা গলির পাশে কয়েক বাড়ি পর পর ময়লা ফেলার জন্য জন্য প্লাস্টিকের বড় ডাস্টবিন রয়েছে। সবাই এসব ডাস্টবিনে ময়লা ফেলেন। 
উন্নত প্রায় সব দেশে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে ময়লা ফেললেও বাংলাদেশে যেখানে-সেখানে মানুষ ময়লা ফেলে কেন? আসলে অভাবটা কিসের শিক্ষার নাকি সচেতনতার। এসব নিয়ে কড়াকড়ি আইন কেন হয় না। এমনটাই প্রশ্ন গুটি কয়েক সচেতন নাগরিকের।       

এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন আরটিভি অনলাইনকে বলেন, গলি থেকে রাজপথ রাজধানীর সর্বত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে থাকে মানুষ। নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখা তো নিজের দায়িত্ব। দোকানিরও তো উচিত ময়লা রাখার ঝুড়ি রাখা। প্রতিদিন রাতে প্রতি অলিগলি ঝাড়ু দেয়া হয়। সন্ধ্যা না গড়াতে ফের রাস্তা ময়লা হয়। গলি থেকে রাজপথ রাজধানীর সর্বত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে থাকে মানুষ। 
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশনের পক্ষে তো একা এসব সমাধান করা সম্ভব নয়। সবার সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া একটি পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা যায় না। 

ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক আরটিভি অনলাইনকে বলেন, কেউ কষ্ট করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলে না। এটা অসচেতনতার বিষয়। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০০টি করে ৫৭টি ওয়ার্ডে মোট ৫ হাজার ৭০০টি ছোট আকারের ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। যাতে ময়লা মিনি ডাস্টবিনে ফেললে সড়কগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। কিন্তু বেশির ভাগ ডাস্টবিন চুরি হয়ে গেল। বাসা-বাড়ির ময়লা এনে ডাস্টবিনে ফেলে ছোট বিনগুলো নষ্ট করা হলো। নগরবাসীদের সহযোগিতা ছাড়া সিটি করপোরেশনের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়।

এসএস/এমকে 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়