• ঢাকা বুধবার, ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
logo

প্রশ্নফাঁসে আরও ৮ জন শনাক্ত, জড়িত ‘হাইপ্রোফাইল’ কর্মকর্তারাও

আরটিভি নিউজ

  ১১ জুলাই ২০২৪, ১৪:২৪

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ক্যাডার, নন-ক্যাডার পরীক্ষাসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) সৈয়দ আবেদ আলী। তার সঙ্গে জড়িত প্রশ্নফাঁসের বড় একটি চক্র।মেডিকেল ও নার্সিংয়ের প্রশ্নপত্রও ফাঁস করেছিল। আবেদ আলীর সঙ্গে প্রশ্নফাঁসে জড়িত একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে ১০ কোটি টাকার চেকসহ মঙ্গলবার আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের আরও আটজন শনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় গ্রেপ্তার পিএসসির চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর ছেলে ও ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া নেতা সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম, ব্যবসায়ী সহোদর সাখাওয়াত হোসেন ও সাইম হোসেনের জামিন গতকাল নামঞ্জুর করেন আদালত।

তদন্তকারীরা বলছেন, এ পর্যন্ত পিএসসির যত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, সেগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন ভেতরের কর্মকর্তারা। সরাসরি প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত না থেকেও কীভাবে তারা প্রশ্ন সংগ্রহ করেছেন, তা ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের। গ্রেপ্তারকৃতদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, ফাঁস করা প্রশ্ন গণহারে না ছেড়ে তা বিক্রি করতে পিএসসির তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মাধ্যমে একটি চক্র গড়া হয়। এরা নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন দিতেন। প্রশ্নগুলো যেন বাইরে না যায় সে জন্য বাসা ভাড়া করে প্রার্থীদের তিন-চার দিন ধরে প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার হলে পাঠাতেন। উত্তর প্রস্তুত করতে সাহায্য নিতেন বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের শিক্ষকদেরও। তবে পুরো ঘটনার সঙ্গে পিএসসির কর্মকর্তারা জড়াতেন না। তারা শুধু প্রশ্নের সেটগুলো পিএসসি থেকে বের করতেন।

সৈয়দ আবেদ আলী জড়িত ছিলেন নগদ লেনদেন ও চাকরি প্রার্থী সংগ্রহের কাজে। পিএসসির সাবেক মেম্বার মাহফুজুর রহমান ছিলেন গাড়ি চালক আবেদ আলী গুরু। পিএসসির কোনো নিয়োগ পরীক্ষা এলেই এই চক্রের সদস্যরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিতেন। গত ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন তারা। চক্রের সদস্যরা ওই পরীক্ষার আগের রাতে তাদের চুক্তি করা শিক্ষার্থীদের বাসায় রেখে ওই প্রশ্নপত্র ও তার উত্তর দিয়ে দেন। তদন্তে এখন পর্যন্ত আরও অনেকের নাম সামনে এসেছে। হাইপ্রোফাইল কিছু নামও পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনবে বলে জানিয়েছে সিআইডি।


একই সঙ্গে সৈয়দ আবেদ আলীর হাত ধরে যারা বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন, তাদের তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ২০১০ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে আবেদ আলীর সম্পৃক্ততা পায় একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়, তিনি স্বীকারও করেছিলেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসে কারা জড়িত, অন্যান্য প্রশ্নপত্র কিভাবে ফাঁস করা হয় সেই তথ্যও তিনি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে দেন। ওই সময় এই ঘটনায় আবেদ আলীসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন বিষয়টি পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়। তখন আবেদ আলী পিএসসির চেয়ারম্যানের কাছে অঙ্গীকার করেন যে, আর কখনো প্রশ্নফাঁসের কাজটি করবেন না। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই সময়ের চেয়ারম্যান পিএসসির আবেদ আলীসহ যে কয়জন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তাদের চাকরিচ্যুত করেন।

২০১১ সালে শেরে বাংলা নগর থানায় আবেদ আলীসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় বিজি প্রেসেরও দুইজন কর্মকর্তা আসামি ছিলেন। ২০১৪ সালে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে তখন মাত্র দুই জন সাক্ষীর জবানবন্দির গ্রহণ করা হয়। বর্তমান মামলাটি বিচারাধীন।

অর্থাৎ আবেদ আলীর হাত যে অনেক বড় সেটা সবাই বুঝতে পারছেন, যেখানে মামলাও চলছে ধীর গতিতে। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর আবেদ আলী প্রশ্নফাঁসের কাজটি পুরাদমে শুরু করেন। কয়েক শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। তার সঙ্গে বড় একটি গ্রুপ জড়িত। ওই সময় ভর্তি পরীক্ষার এই প্রশ্নগুলো বিজিপ্রেসের যারা টাইপ করতো, সেখানে ছিল আবেদ আলীর লোক। তারা প্রশ্নগুলো মুখস্থ করে ফেলতো। তারা সবাই মিলে প্রশ্নফাঁস করতো। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে পাঠাতো। সেই কোচিং সেন্টারগুলোও শনাক্ত করে গোয়েন্দা সংস্থা। তবে এদের পেছনে নেপথ্যের শক্তি এতো শক্তিশালী ছিল যে, তাদের কিছুই করা যায়নি।

বিজিপ্রেসের পক্ষ থেকে ওই সময় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রশ্নফাঁস বন্ধের উপায় কি? তখন এ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয় যে, যেহেতু বিজি প্রেস খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই এখানে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ৬১ জন পুলিশ সদস্য রাখা যেতে পারে। তারা নিরাপত্তার কাজটি করবে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব আর বাস্তবায়ন হয়নি।

পিএসসির মাধ্যমে মেধাসম্পন্ন অফিসার চাকরিতে প্রবেশ করে। মেধাবিরা উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনে যাবে। কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নে কেউ ডাক্তার হলে, সে কি ধরনের ডাক্তার হবে, তা বলার উপেক্ষা রাখে না। প্রশাসনে গেলে ভালো প্রশাসক হবে না। যে শিক্ষকতায় গেছে, সে ভালো শিক্ষক হবে না। স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মূলে থাকা মাহফুজুরকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে দুই অপরাধ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় পিএসসির অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। এসব ঘটনায় আরও যেসব কর্মকর্তা জড়িত, তাঁদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রেখেছে বলেও জানতে পেরেছি।’

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত সোমবার সিআইডি ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে ছয়জনই পিএসসিতে কর্মরত। তাদের মধ্যে উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও রয়েছেন। তারা এক যুগে বিসিএসসহ অন্তত ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মন্তব্য করুন

  • বাংলাদেশ এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ফাঁস হওয়া প্রশ্নে উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের তালিকা প্রকাশে আইনি নোটিশ
প্রশ্নফাঁসে গ্রেপ্তার সোহেলের বোন শিক্ষা অফিসার, ভাবি শিক্ষক
মেয়ের বিয়ের ‌‘যৌতুক’ হিসেবে বিসিএস প্রশ্ন দেন পিএসসির সাবেক মেম্বার
সুশান্ত পালের ফেসবুক পেজ গায়েবের রহস্য কী?