logo
  • ঢাকা রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

দেশে ইসরায়েলি আর্মি গ্রেডের ‘উজি’ পিস্তল বিক্রি নিয়ে তোলপাড়

Fighting erupts over the sale of Israeli military-grade Uji pistols in the country
ইসরায়েলি আর্মি। ফাইল ছবি
সম্প্রতি দেশের একজন বেসামরিক ব্যক্তির কাছ থেকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ‘উজি’ পয়েন্ট টু-টু বোর পিস্তল উদ্ধারের পর থেকে নড়েচড়ে বসেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ ধরণের অত্যাধুনিক অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছানোয় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে মনে করছে পুলিশ। দেশে আমদানি হওয়া ১০৯টি অত্যাধুনিক “উজি” পিস্তলের ৫৩টি কাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, তারা কীভাবে এসব অস্ত্র কিনেছে, কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তার খোঁজ নিতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সসস্যরা। এ সংক্রান্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে শিগগিরই চিঠি দেওয়া প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। যেসব অস্ত্র বিক্রি হয়ে গেছে, সেগুলো জব্দে অনুমতি চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। এদিকে ‘ইসরায়েল উইপন ইন্ডাস্ট্রিজ (আইডব্লিউআই)’ এর ওয়েভ সাইট ঘেটে ‘উজি’ পিস্তলের সক্ষমতা জেনে রীতিমতো অবাক হতে হয়। এমন শক্তিশালী অস্ত্র কোনোভাবেই বেসামরিক নাগরিকদের ব্যবহারের সুযোগ থাকার কথা নয়।

চলতি বছরের আগস্ট মাসে মাদক ব্যবসার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের সময়ে তার কাছে পাওয়া একটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জের ধরে একটি উজি পয়েন্ট টু-টু বোর পিস্তল জব্দ করে পুলিশ। উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি মিলিটারি গ্রেডের উল্লেখ করে পুলিশ জানায়, বাংলাদেশের বেসামরিক নাগরিকদের এই অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি নেই। এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সংক্রান্তে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে দেশে তোলপাড় শুরু হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলার সাক্ষাৎকারে বলেন, পুলিশের এবং র‌্যাবের কাছে যে অস্ত্র আছে, সাধারণ মানুষের কাছে যদি তার চেয়ে অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র থাকে, তাহলে তো বোঝাই যায় যে উদ্বেগের জায়গাটা কোথায়। আইনের ফাঁক গলে অনেক ব্যবসায়ী এই অস্ত্র আমদানি করছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের কাছে বিক্রি করছে। তারা বলেছে যে তারা টু-টু বোর রাইফেল আনছে, কিন্তু এটা টু-টু বোর রাইফেল না, এটা পয়েন্ট টু-টু বোর পিস্তল। আইন অনুযায়ী টু-টু বোর অস্ত্র আমদানি বৈধ। কিন্তু অটোমেটিক বা সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র মানুষের কাছে বিক্রি করা যাবে না। এই বিক্রির বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে, “পয়েন্ট টু-টু বোর পিস্তল“ উল্লেখ না করে তারা অস্ত্রটি আমদানি করেছে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলেন, যে অস্ত্র নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি সাব মেশিনগান ক্যাটাগরির একটা অস্ত্র। যেটা সাধারণত ইসরায়েলে তৈরি করা হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, এটা যে ধরনের অস্ত্র সেটা জনগণের কাছে থাকার কথা না এবং জনগণের কাছে বিক্রি করারও কথা না। এটার যে ধরনের ক্ষমতা আছে, সেটা একজন সাধারণ ব্যক্তিরও প্রয়োজন হওয়ার কথা না। আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্ত্র সম্পর্কিত নিয়ম কানুন সঠিকভাবে বোঝাটা জরুরি। প্রয়োজন হলে এই প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

পুলিশ জানিয়েছে, এই স্পর্শকাতর বিষয়টি তারা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন এবং অনুমতি পেলে এ ধরনের যতগুলো অস্ত্র আছে সবগুলোই তারা জব্দ করবেন এবং সেগুলো কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারে জমা রাখবেন।

শক্তিশালি ‘উজি’ পিস্তল কোথা থেকে, কিভাবে এলো?
ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত মেজর ‘উজিয়েল গাল’ ১৯৪০ এর দশকে সর্বপ্রথম এই অস্ত্রের নকশা প্রণয়ন করেন। তার নামানুসারেই এই অস্ত্রের নামকরণ করা হয় ‘উজি’। ১৯৫০ সালে এর অস্ত্রটির প্রথম প্রোটোটাইপ নির্মাণ শেষ হয়। ইসারায়েল ডিফেন্স ফোর্সের স্পেশাল বাহিনী ১৯৫৪ সালে প্রথম এই অস্ত্রটি ব্যবহার করে। এর ২ বছর পর সাধারণ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এই অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়।

‘উজি’ এর ব্যবহার ও শক্তিমত্তা
‘উজি‘ হিব্রু ভাষার শব্দ। এটি একটি ওপেন বোল্ট ও ব্লোব্যাক পরিবারভুক্ত একটি সাবমেশিন গান। এর ছোট আকৃতির সংস্করণগুলো মেশিন পিস্তল নামে পরিচিত। সর্বপ্রথম নির্মিত টেলিস্কোপিং বোল্টযুক্ত আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর মধ্যে ‘উজি’ অন্যতম। এর ফলে ছোট অস্ত্রের ম্যাগাজিন পিস্তলের মতো হাতের মুঠোর ভেতর স্থাপন করার প্রচলন শুরু হয়, যা অস্ত্রের দৈর্ঘ্য কমিয়ে দেয়। জাপানের তৈরি টাইপ-২ মেশিন পিস্তলের পূর্বে এধরনের ডিজাইন আগে কখনও দেখা যায়নি। তুলনামূলকভাবে অনেক হাল্কা এবং এর প্রতি মিনিটে গুলির হার অনেক বেশি হওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ইসরায়েল উইপন ইন্ডাস্ট্রিজ (আইডব্লিউআই) এর ওয়েভ সাইট ঘেটে জানা গেছে, ‘উজি’ এটি একটি সেমি-অটো টাইপের পিস্তল। এর ম্যাগজিনে ২০ থেকে ২৫ রাউন্ড গুলি লোড করা যায়। এছাড়াও যদি তাদেরকে অর্ডার করা হয়, তারা প্রয়োজন ৩৫ রাউন্ড ক্যাপাসিটির ম্যাগজিন তৈরি করে দিতে পারবে। এই পিস্তলটির ওজন ৩.৬৬ পাউন্ড। 

সামরিক কর্মকর্তা, গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্যরা ও ট্যাংকে থাকা সেনা, এবং পদাতিক অ্যাসল্ট বাহিনীর সদস্যরাই মূলত এই অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। 

এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে উজি রপ্তানি করা হয় বলে তথ্য রয়েছে। এখন পর্যন্ত ইসরায়েল মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিজ, এফএন হার্সটেল, এবং অন্যান্য অনেক অস্ত্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠান উজি উৎপাদন করে আসছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত উজি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিক্রি হওয়া সাবমেশিন গান। বিশ্বজুড়ে নানা দেশের সামরিক ও পুলিশ বাহিনী এই অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে।

কেএফ

RTVPLUS