• ঢাকা শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫

যাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত

হাফেজ মাওলানা মো. নাসির উদ্দিন
|  ০৫ জুন ২০১৮, ১৭:৩৬
দৈহিক ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামাজ, ঠিক তেমনিভাবে আর্থিক ইবাদতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাকাত। সীমাহীন গুরুত্বের কারণে এই দুইটি ইবাদতের  কথা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে পাশাপাশি বর্ণনা করেছেন।ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম।

আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে ৮২ স্থানে নামাজের সাথে সাথে যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দৈহিক ইবাদত হিসেবে নামাজ যেমন খুবই জরুরি, তেমনি আর্থিক ইবাদত হিসেবে যাকাতও খুবই জরুরি। এছাড়া নামাজ এবং যাকাত একটি অপরটির সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ও ওতপ্রোতভাবে জরিত।

যাকাতের আবিধানিক অর্থ পরিশুদ্ধ হওয়া,বৃদ্ধি পাওয়া। যাকাতের পারিভাষায়, কোন দরিদ্র মুসলমানকে শরীয়ত কর্তৃক মালের নির্ধারিত অংশের মালিক বানিয়ে দেয়া। এ শর্তে যে উক্ত দরিদ্র মুসলমান রাসুল (সা.) এর বংশধর বা তাদের আজাদকৃত গোলাম হতে পারবে না এবং উক্ত মাল থেকে যাকাতদাতার মালিকানা পূর্ণরূপে মুক্ত  হতে হবে ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করতে হবে। যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ-

১. নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়া। অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা,কিংবা সমপরিমাণ মূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার মালের মালিক হওয়া।

২. মুসলমান হওয়া। কাফেরের উপর যাকাত ফরজ নয়।

৩. বালেগ হওয়া। নাবালেগের উপর যাকাত ফরজ নয়।

৪. জ্ঞানী ও বিবেক সম্পন্ন হওয়া। সর্বদা যে পাগল থাকে তার নেসাব পরিমাণ মাল থাকলেও তার উপর যাকাত ফরজ নয়।

৫. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া। দাস-দাসীর উপর যাকাত ফরজ নয়।

৬. মালের উপর পূর্ণ মালিকানা থাকা। অসম্পূর্ণ মালিকানার উপর যাকাত ফরজ হয় না।

৭. নেসাব পরিমাণ মাল নিত্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অতিরিক্ত হওয়া।

৮. নেসাব পরিমাণ মালের উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া।

৯. মাল বর্ধনশীল হওয়া। যাকাতের ফজিলত, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যা কিছু (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দান করবেন। আর তিনিই উত্তম রিজিকদাতা। (সুরা সাবা,আয়াত:৩৯)

হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন নবী কারিম (সা.) বলেছেন, দান আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে এবং অপমৃত্যু রোধ করে।

অন্য এক হাদিসে আছে, সদকায় সম্পদ হ্রাস পায় না এবং ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ শুধু বান্দার সম্মানই বাড়িয়ে দেন আর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় অবলম্বনকারীকে আল্লাহ উপরে উঠিয়ে দেন’। (মুসলিম শরীফ,২৫৮৮)

যে যাকাত প্রদান করে না। কিয়ামতের দিন সে জাহান্নামে যাবে’। (তাবারানী)

অন্য এক হাদিসে আছে, আল্লাহ তাআলা যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন সে যদি ঐ সম্পদের যাকাত আদায় না করে, তাহলে তার সম্পদকে কিয়ামতের দিন টাকপড়া বিষধর সাপের রূপ দান করা হবে। যার চোখের উপর দুটি কালো দাগ থাকবে যা কিয়ামতের দিন তার গলায় বেড়ির মত পেঁচিয়ে দেয়া হবে। অতপর সে সাপটি তার চোয়ালে দংশন করে বলতে থাকবে আমিই তোমার সম্পদ,আমিই তোমার কুক্ষিগত মাল’। (বুখারী শরীফ,১/১৮৮)

অপর একটি হাদিসে আছে, এক মহিলা নবী কারিম (সা.) এর নিকট আসেন, তার সাথে তারই এক কন্যা ছিল যার হাতে স্বর্ণের দুটি মোটা বালা ছিল। নবীজী (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি এ বালা দুটির যাকাত আদায় কর? তিনি বললেন, না। তখন নবী কারিম (সা.) বললেন, তুমি কি খুশী হবে যে আল্লাহ তাআলা এ দুটির যাকাত না দেয়ার কারণে কিয়ামতের দিন তোমাকে আগুনের তৈরি দুটি বালা পরিয়ে দেবেন?

তখন ঐ মহিলার কন্যা বালাগুলো খুলে নবী কারিম (সা.) এর সামনে পেশ করে বললেন, এ দুটি বালা আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য দান করে দিলাম। (আবু দাউদ শরীফ,১৫৬০;তিরমিজি শরীফ,৬৩৭) যাকাতের খাত ৮ টি-

 ১. ফকির। ঐ গরিব ব্যক্তি যার নিকট এক বেলা বা দুই বেলার বেশি খাবারের ব্যবস্থা নেই।

২. মিসকিন। যার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। যেমন কোন ব্যক্তির আয় আছে ‘বিশ হাজার’ টাকা কিন্তু তার নিজের বা পরিবারের কারও অসুস্থার পেছনে ব্যয় আছে ‘চল্লিশ হাজার’ টাকা। তাকে দেয়া।

৩. যাকাত আদায় ও বিতরণের কর্মচারীদের।

৪. নওমুসলিম অর্থাৎ যারা অন্য ধর্ম ছাড়ার কারণে পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে বঞ্চিত হয়েছে, তাদেরকে দেয়া।

৫. দাসমুক্তির জন্য। (বর্তমানে যদি কোন লোক এমন পাওয়া যায় যে, যে র্নিদোষভাবে জেলে আছে তাকে)

৬. ঋণ মুক্তির জন্য। জীবনের মৌলিক বা প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরনের জন্য সংগত কারণে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঋণ মুক্তির জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।

৭. ফী সাবিলিল্লাহ বা জিহাদ। অর্থাৎ ইসলামকে বোল-বালা বা বিজয়ী করার লক্ষে যারা কাফির বা বিধর্মীদের সাথে জিহাদে রত সে সকল মুজাহিদদের প্রয়োজনে যাকাত দেয়া যাবে।

৮. মুসাফির। মুসাফির অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বিশেষ কারণে অভাব গ্রস্ত হলে ঐ ব্যক্তির বাড়িতে যতই ধন-সম্পদ থাকুক না কেন তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে।

এমকে

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়