• ঢাকা রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

বিশেষ সাক্ষাৎকার

আগামী দিনের রাজত্ব হবে ডিজিটাল মিডিয়ার : মোস্তাফা জব্বার

মিথুন চৌধুরী, আরটিভি অনলাইন
|  ০৩ জুলাই ২০১৭, ০৯:৩৪ | আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৭, ১১:২৭
বাংলা বিজয় কীবোর্ডের কথা তুললে এক নামে সবাই যে নাম উচ্চারণ করে তিনি হলেন প্রযুক্তিবিদ মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বারের কথা।  ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি প্রকাশ করেন বিজয় বাংলা কীবোর্ড ও সফটওয়্যার। পরে ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের জন্যও বিজয় বাংলা কিবোর্ড ও সফটওয়্যার তিনি প্রকাশ করেন। ফলে কম্পিউটারের মাধ্যমে বাংলার ব্যবহারের যাত্রা শুরু হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের পুরোধাদের তিনি একজন অগ্রপথিক। ফেসবুকে আরটিভির এক কোটি ফ্যানের মাইলফলক অর্জনের মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে কথা হয় এ প্রযুক্তিবিদের সঙ্গে। 

আরটিভি অনলাইন : ডিজিটাল গণমাধ্যমের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বলুন

মোস্তাফা জব্বার : গণমাধ্যমের প্রচলিত ধারা দীর্ঘদিন ধরে বিকশিত হয়েছে। নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। কাগজ থেকে রেডিও। এরপর টেলিভিশন। পরে ডিজিটাল মিডিয়া। আমি একটি জিনিস বিশ্বাস করি মিডিয়া থাকবে কিন্তু এনালগ প্রকাশ মাধ্যম থাকবে না। মানুষ পত্রিকার পাতা ও টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। আপনারাই প্রমাণ করেছেন যে প্রচলিত মিডিয়ার কিভাবে ডিজিটাল মিডিয়ায় দ্রুত রূপান্তর সম্ভব। আপনারা ফেসবুক নিজেদের পেজে ১ কোটি পার করলেন। যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। ২০২১ সালের নাগাদ আমরা ডিজিটাল হয়ে যাব। বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়া খুব দ্রুত এগিয়ে গেছে। যার একটি সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। এর ভাল বা মন্দ ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, রাষ্ট্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরটিভি অনলাইন : সামাজিক মাধ্যমের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?

মোস্তাফা জব্বার : ২০২১ সালে আমরা ভাল অবস্থানে পৌঁছে যাবো। ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। যা বাড়তে থাকবে। আগামী দিনের রাজত্ব হবে ডিজিটাল মিডিয়ায়। মত প্রকাশের প্রধানতম জায়গা হবে এটি। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।

আরটিভি অনলাইন : সামাজিক মাধ্যমে ইংরেজি হরফ দিয়ে বাংলা লেখার চর্চাকে কেমনভাবে দেখেন?

মোস্তাফা জব্বার: কোনোভাবে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখা সম্ভব নয়। ইংরেজি হরফ দিয়ে পৃথিবীর কোনো ভাষা লেখা সম্ভব নয়। যন্ত্র দিয়ে শিক্ষা হরফ লেখার সিস্টেম শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। আন্তর্জাতিক ফনেটিক এসোসিয়েশনের ১৬২টি ধ্বনি দিয়ে হরফ ব্যবহার করতে হয়। বাংলার মৌলিক ৫২ তম হরফ পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানসম্মত ভাষা বাংলা। যে হরফ দিয়ে সব ধ্বনি ইচ্ছেমত ব্যবহার করা যায়। এটাই একটি ভাষার সক্ষমতা।  রোমান হরফ দিয়ে যারা নিজেদের ভাষা লেখতে গিয়েছেন তাদের ভাষা নষ্ট হয়েছে। তাই যে ভাষায় কথা বলা হয় সে ভাষায় লেখাই উত্তম। কোড দিয়ে ভাষা চর্চা করা নয়। এটা ভাষা নষ্ট করে। ফেসবুকে যারা ইংরেজি হরফ ব্যবহার করে বাংলা ভাষা প্রকাশ করেন তারা ভাষার চর্চা নষ্ট করেন।

আরটিভি অনলাইন :বিশ্বে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে কিছু বলবেন কি?

মোস্তাফা জব্বার : বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ মাতৃভাষা।  দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলা ভাষা যারা বাংলায় কথা বলেন তারা শুদ্ধভাবে যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলা লিখতে পারেন না।  শেখার চেষ্টাও করেন না। তবে বিশ্বে ৩৫ কোটি লোক বাংলায় কথা বলে।  আর ৪০ কোটি লোক বাংলা হরফ ব্যবহার করে। শুদ্ধ করে দ্রুত গতিতে ব্যবহার করতে ভাষার চর্চা করতে হবে। আমি যখন মাতৃভাষা লিখবো তখন শুদ্ধ করে লিখবো। এটাই লেখা উচিত।

আরটিভি অনলাইন : তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে আপনার আশাবাদ কতটা?

মোস্তাফা জব্বার : আমরা তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষায় অনেকদূর এগিয়ে গেছি। অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে জয়ী আমরা হবোই। ১৯৬৯ সালে দেশে প্রথম বাংলা টাইপ রাইটার মেশিন আসে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথম অপটিমা মুনির টাইপ রাইটার মেশিন দেশে নিয়ে আসেন। ভাষার ১৬টি টুলস বানাতে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।  আশা করা যায়, এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান অতি দ্রুত হয়ে যাবে।  আগামী ১০ বছর পর আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ এগিয়ে যাবো।

আরটিভি অনলাইন : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

মোস্তাফা জব্বার : এখন ক্লাস সিক্স থেকে কিভাবে কম্পিউটারে বাংলা লেখা যায় তা শেখানো হয়। তবে তা যান্ত্রিকভাবে শেখানোর চর্চা করা হচ্ছে না। এটা করা উচিত। প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে শেখার মাধ্যম হিসাবে। যাতে শিক্ষার্থীরা নিত্যদিন শিখছে। তবে দ্রুতগতির সাশ্রয় ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ালে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়বে।  

আরটিভি অনলাইন : ইন্টারনেট অপব্যবহার ডিজিটাল বাংলাদেশের বাধা হবে না তো?

মোস্তাফা জব্বার : অপরাধী তার সীমানা ছাড়িয়ে যে কোনোস্থানে যাবে। তা ইন্টারনেটে হোক বা যে কোনো স্থানে হোক। তবে রাষ্ট্রকে অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর হতে হবে। সেজন্য পুরোনো আইনগুলো আপডেট করা জরুরি। আগে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ছিল। কিন্তু আইন কড়া হওয়ায় এ অপরাধ বেশ কমেছে। তেমন অপব্যবহার নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভাল ও মন্দের শিক্ষা বাড়াতে হবে। ইন্টারনেট হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্ঞান ভাণ্ডার। যা থেকে সব কিছু শেখা যায়। তাই অপরাধের ভয়ে এ থেকে পিছিয়ে গেলে চলবে না।

আরটিভি অনলাইন : ইংরেজি ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা প্রমিত বাংলায় পিছিয়ে থাকছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কি করা উচিত?

মোস্তাফা জব্বার : শিক্ষার মাধ্যম যেকোনোভাবে হতে পারে। তাই বলে মাতৃভাষার প্রয়োগ বাদ দিয়ে নয়। ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসায় বাংলা ব্যবহার খুবই কম। এমনকি অনেকে বাংলা লিখতেও পারেন না। কিন্তু তাদের প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ বিষয়টি দেখার সময় এখনই। তা না হলে বাংলাচর্চায় তারা দৌড়ে পিছিয়ে পড়বেন।

আরটিভি অনলাইন : গণমাধ্যম কিভাবে প্রযুক্তিতে শিল্পের প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন? 

মোস্তাফা জব্বার : সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি, মেধার পরিমাণ বাড়ানো হলে দেশের গণমাধ্যমগুলো নিজস্বতা পাবে। দেশ-বিদেশের রোল মডেল হবে। বহি:বিশ্বের শিল্প গ্রহণ না করে নিজেদের শিল্প বিশ্বব্যাপী প্রসার পাবে। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় ট্রেনিং ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা কম থাকার পরও ছেলে মেয়েরা খুব ভাল কাজ করছে। পরের প্রজন্ম যারা আসবে তারা আরো ভাল করবে। তবে মিডিয়াকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সুযোগ সুবিধা বাড়ানো হলে আমরা অন্যান্য দেশকে ছাড়িয়ে যাবো। 

আরটিভি অনলাইন : বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলা হচ্ছে বারবার। দেশের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কি করা যেতে পারে?

মোস্তাফা জব্বার : সাইবার নিরাপত্তা এখনো অজানা বাংলাদেশের কাছে। এ বিষয়ে আইনের মাধ্যমে মনিটরিং বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

আরটিভি অনলাইন : আরটিভি পরিবারের নতুন সংযোজন আরটিভি অনলাইন। ডিজিটাল মিডিয়া হিসেবে আরটিভি অনলাইনকে কিভাবে দেখছেন?

মোস্তাফা জব্বার : আরটিভি অনলাইনের জন্ম এক বছরও হয়নি। তারপরও ভাল করছে। পাঠকদের চাহিদা ও গণমুখী সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আরটিভি অনলাইন শীর্ষে স্থান করে নেবে। আরটিভি ও আরটিভি অনলাইনের সফলতা কামনা করছি। 

এসজে/এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়