• ঢাকা বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫

বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা সম্মানের, দয়া বা ভিক্ষার নয়’

সিয়াম সারোয়ার জামিল, আরটিভি অনলাইন
|  ১০ মে ২০১৮, ২০:২৯ | আপডেট : ১০ মে ২০১৮, ২৩:১২
(সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে এই আন্দোলনের বিরোধীতা করে আসছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ সমমনা কয়েকটি সংগঠন। এর মধ্যে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নামক সংগঠনটি অন্যতম। এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন রাশেদুজ্জামান শাহীন। তিনি আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনগুলোর সংকট নিয়েও আরটিভি অনলাইনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার সিয়াম সারোয়ার জামিল।)

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কীভাবে দেখছেন?

কোটা সংস্কার আন্দোলন একেবারেই অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। যাতে সব জায়গার মানুষের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সুষম বন্টন হয়। ধাপে ধাপে সেটা বিভিন্ন সময়ে সংস্কার হয়েছে। এই কোটা ব্যবস্থার ফলে পিছিয়ে পড়া নারী, প্রতিবন্ধীরা উঠে আসতে পারছে। অনুন্নত এলাকা থেকে, দরিদ্র পরিবার থেকে মানুষগুলো সরকারি কাজে নিজেকে সম্প্রদান করতে পারছে। যদি কোটা ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায় তবে রাষ্ট্রীয় কাজে সব শ্রেণির মানুষের উঠে আসা বন্ধ হয়ে যাবে। এটা রাষ্ট্রের জন্য হুমকীস্বরূপ। যারা আন্দোলন করছেন, তারা না বুঝেই আন্দোলন করছেন। কারণ, সবাইকে কোটা দেয়া হলেও মেধার পরীক্ষা আগে নিয়েই কোটার মাধ্যমে সব শ্রেণি থেকে সরকারি চাকরিতে লোক নেয়া হচ্ছে। বিভ্রান্তিটা তৈরি করেছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি।  

আপনারা বলছেন, এই আন্দোলনে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জড়িত। এটা কেন মনে হয়েছে?

পৃথিবীর সব দেশেই বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন হয়। এখানেও হচ্ছে। সেটা দোষের কিছু না। কিন্তু কোটা সংস্কারের নাম করে আন্দোলনকারীরা কার্যত কোটা বাতিলের দাবিতেই আন্দোলন করেছে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সময়েই বিভ্রান্তিকর ও স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। তারা উপাচার্য স্যারের বাসা জ্বালিয়ে দিয়েছে, লুট করেছে। তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া স্ট্যাটাসগুলোও সাম্প্রদায়িকতাকে ইঙ্গিত করে। তাদের ব্যানারে, প্ল্যাকার্ডে, বক্তৃতায় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অপমান করা হয়েছে। ফেসবুকে বাজেভাবে ট্রল করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের সূর্য সন্তান। পৃথিবীর কোনো দেশে এভাবে অপমান করা হয় না। যে রাজাকার শব্দটা সবচেয়ে ঘৃনীত, সেই শব্দটাই তারা বুকে লিখেছে। ২০১৩ সালে আমরা যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিয়েছিলাম, তুই রাজাকার তুই রাজাকার। অথচ সেই সুরে এই আন্দোলনকারীরা বুকে লিখেছে মুই রাজাকার, মুই রাজাকার। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমানজনক। এসব আলামতে স্পষ্ট হয় স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : খালেদার আত্মীয়ই তার নামে দুর্নীতির মামলা করেছে: মতিয়া
--------------------------------------------------------

প্রধানমন্ত্রী কোটা প্রথা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। এটাকে আপনারা কীভাবে দেখছেন?

প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু তিনি এই সিদ্ধান্ত মন থেকে নেননি। অভিমান করেই নিয়েছেন। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত অভিযান থেকে নেয়া উচিত হবে। এটা আমাদের মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। তাই আমরা কোটা বহালের দাবিতে আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছি।

কোটা বহাল ছাড়া আর কি কি দাবি করছেন আপনারা?

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করাসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্তরসূরিদের সকল চাকরিতে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রেখে তা বাস্তবায়নে কমিশন গঠন করতে হবে। প্রিলিমিনারি থেকে কোটা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

কোটা বাতিলের প্রতিবাদে বেশ কিছু কর্মসূচি দিয়ে আসছেন। কিন্তু এতগুলো সংগঠনে বিভক্ত হয়ে কেন? 

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কোন্দল মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের মাঝেও ছড়িয়েছে।  এটা সত্যিই আমাদের জন্য দু:খজনক। একক কোনো সংগঠনের ব্যানারে সবাইকে এক করাটাও মুশকিল। তবে আমরা বিভিন্ন সময়ে সমন্বয় করে যুগপৎভাবেও কর্মসূচি পালন করি। দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান প্রায় ৮-১০ লাখ। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উচিত ছিল, এদের সংগঠিত করা। কিন্তু সেটা হয়নি। খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান প্রতিষ্ঠা পায়। আমাদের পঞ্চাশ হাজার সদস্য আছে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাতের আঁধারে গঠনতন্ত্র পরিপন্থী একটি কমিটি এসে যায়। এরপরে গঠনতন্ত্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম ফেলে দিয়ে তৎকালীন সরকারপন্থীরা নতুন সংগঠন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড গঠন করে। পরে আরো কিছু সংগঠন হয়। দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের নিয়ে ৮-৯ টি সংগঠন আছে, প্রজন্ম নিয়ে আছে ২৭ টি সংগঠন। একেকটার নাম খুবই অদ্ভুত। কোনো কোনোটি সাম্প্রদায়িক নামও ধারণ করেছে। পাশাপাশি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছে। সরকার চাইলেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বের করে দিতে পারতো। কিন্তু কোনো সরকারই সেটা সঠিকভাবে করেনি। দলের লোকজনকে জায়গা দিতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করেছে। এতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লোকজনের মধ্যে হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতে না পারুক, এভাবে অপমান করার তো দরকার নাই।  

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?

মুক্তিযোদ্ধা পরিবার নিয়ে সবাই রাজনীতি করতে চায়। সেই রাজনীতির বলি হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নতুন প্রজন্ম। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারা তাদের কাজে আন্তরিক না। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা হচ্ছে বিভক্ত। অন্যদিক স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ।

আপনি বললেন ৮-১০ লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আছে। কিন্তু আপনাদের আন্দোলনে সেই পরিমাণ সক্রিয়তা দেখা যায়নি। এটা কেন?

আমরা ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে আসছি। বেশ কয়েকটি সংগঠন কাজ করছে। যারা কোটা আন্দোলন করছে, তারা বেশিরভাগই শিক্ষার্থী। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কেউ গ্রামে থাকে, কেউ চাকরি করে, কেউ ব্যবসা করে, কেউ পড়াশোনা করে। সবাই তো আর শিক্ষার্থী না। ফলে সবাই বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থক থাকলেও আন্দোলন সেইভাবে গড়ে তোলা যাচ্ছে না।

এই মুহূর্তে কোটা আন্দোলন নিয়ে সমাধানের পথ কী?

মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু সিংহভাগই দরিদ্র পরিবার থেকে আসছেন। অপরদিকে যারা স্বাধীনতাবিরোধী-রাজাকার তারা কিন্তু অপেক্ষাকৃত ধনী। তাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের তুলনা হবে না। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদের জন্য যদি ন্যুনতম এই কোটা না রাখা হয়, সেটা এক ধরনের অপমানই করা হবে এমন নয়, ওই পরিবারগুলোকে রাস্তায় ফেলে দেয়া হবে। আদর্শহীন মেধা দেশের জন্য ক্ষতিকর। জাতিসংঘে কোটা আছে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে কোটা আছে, আইএমএফে কোটা আছে। বিশ্বের সবজায়গাতেই কোটা ব্যবস্থা আছে। কারণ হচ্ছে, সব শ্রেণির মানুষকে একই কাঠামোর মধ্যে স্থান দেয়া। একটা সুষম বন্টন সৃষ্টি করা। সবকিছু বিবেচনা নিলে কোটা যৌক্তিক। স্বল্পউন্নত দেশের সুষম উন্নয়নের স্বার্থেই কিন্তু এই কোটা ব্যবস্থা জারি রাখা দরকার। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাচ্ছি, কোটা ব্যবস্থা বাতিলের এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন। দেশের স্বার্থেই তাকে এই বিবেচনাটা করতে হবে।

আরও পড়ুন :

এসজে

 

 

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়