• ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

পান্তা ভাতের বাসন তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী
|  ১২ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:৪৯ | আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৮, ১৪:০৮
বাংলা নববর্ষের উৎসবকে ঘিরে পটুয়াখালীর মৃৎশিল্পীরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। জেলার বাউফল, গলাচিপা, কলাপাড়াসহ প্রতিটি উপজেলার মৃৎশিল্পীরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন।

তারা বৈশাখের পান্তা-ইলিশের জন্য তৈরি করছেন হাড়ি-পাতিল, থালা-বাসন। সেইসঙ্গে কাপ-পিরিছ, ফুলের টব, মোমদানি, ঘোড়া, পুতুলসহ নানা ধরনের কারুকার্যের মাটির পণ্য তৈরি করছেন মৃৎশিল্পীরা।

বৈশাখকে ঘিরে আড়ংসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব পণ্য সরবরাহ করার জন্য ফাল্গুনের শুরু থেকে অনবরত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা না থাকার কারণে এ শিল্পের প্রসার ঘটছে না। অথচ মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও কারিগররা সরকারি সহায়তা পেলে মৃৎশিল্পের এসব কারুকার্য পণ্য বিশ্বের বাজারে দেশের মান আরও উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধি করে তুলতে পারত।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ করেছে জুট মিল শ্রমিকরা
--------------------------------------------------------

আবহমান বাংলার লোকশিল্পের মধ্যে প্রাচীণতম ঐতিহ্য হচ্ছে মৃৎশিল্প। সত্তর দশক পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সমাদৃত ছিল মৃৎশিল্পে। ওই সময়ে ধনী-গরিব সবার বাড়িতেই ছিল মাটির তৈরি হাড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, ডিনার সেট, মোমদানি, অ্যাশট্রে, ঝাড় বাতিসহ মৃৎশিল্পের পণ্য সামগ্রী। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন বিলুপ্ত হতে চলছে মৃৎশিল্প। এরপরেও আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মৃৎশিল্পীরা তাদের পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলছেন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে। কারুকার্য ও রুচির পরিবর্তন ঘটিয়ে নান্দনিক ও শৈল্পিক চিন্তা-চেতনায় নতুন নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি করে মৃৎশিল্পকে দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে মৃৎশিল্পের এসব পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। কানাডা, আমেরিকা, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

গেলো ৭ এপ্রিল সরেজমিনে জেলার বাউফলের পালপাড়া ঘুরে দেখা যায়, বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এ মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এ পেশার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো আধুনিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ডিজাইনের ক্যাটালগ ব্যবহার করছেন পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে। তারা চিরাচরিত হাড়ি-পাতিল তৈরি না করে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হরেক রকমের ডিজাইন করা দৃষ্টিনন্দন  হাড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, কাপ-পিরিচ, ফুলের টব, মোমদানি, ঘোড়া, পুতুলসহ নানা ধরনের কারুকার্যের মাটির পণ্য তৈরি করছেন।

এ পালপাড়ার মৃৎশিল্পকে আধুনিকায়ন করতে প্রথমেই এগিয়ে আসেন মৃৎশিল্পী বিশ্বেস্বর পাল ও তার ভাতিজা বীরেন পাল।

এ দুই চাচা-ভাতিজা অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে পটুয়াখালীর বাউফলের এ মৃৎশিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। গ্রামের ওই মানুষগুলোর হাতে গড়া মাটির পণ্য বিক্রি হচ্ছে ডলারে। তাদের ওই কাজ দেখার জন্য প্রতিদিনই বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ ভিড় করছেন পালপাড়ায়। পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের কর্মযজ্ঞ দেখতে যান পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক)মো. হেমায়েত উদ্দিনসহ জেলা প্রশাসনের কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তারা মৃৎশিল্পের নান্দনিক পণ্যগুলো দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এ শিল্পের প্রসার ঘটানোর জন্য সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।

মৃৎশিল্পীরা জানান, তাদের পণ্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলায় প্রদর্শন করা হতো এবং বিক্রিও হতো ভালো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও অরাজকতা কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানের বৈশাখী মেলা সন্ধ্যার আগেই শেষ হয়ে যায়। এ কারণে এখন আর মেলাও জমে না এবং বিক্রিও তেমন হয় না। এ কারণে তারা আর অর্ডার ব্যতীত বেশি মাল তৈরি করছেন না।

মৃৎশিল্পী রিনা দেবনাথ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, বৈশাখী উৎসবে পান্তা-ইলিশের আয়োজনের জন্য মৃৎশিল্পের পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেছে। এজন্য সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নির্ধারিত কাজ শেষে অতিরিক্ত কাজ করতে হয় রাত পর্যন্ত। ঢাকার বড় বড় প্রতিষ্ঠানের অর্ডারের কারণে ফাল্গুনের শুরু থেকে কাজ শুরু করতে হয়েছে এবং এখনও তা চলছে।

বাউফলের পালপাড়ার মৃৎশিল্প ব্যবসায়ী বিশ্বেস্বর পাল আরটিভি অনলাইনকে বলেন, বৈশাখী মেলা ছোট হয়ে যাওয়ায় ব্যবসার অনেক ক্ষতি হয়েছে। বিকেল পাঁচটার মধ্যে মেলা শেষ হয়ে যাওয়ায় আমাদের পণ্যের বিক্রি কম হচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বৈশাখকে ঘিরে অনেক পণ্য উৎপাদন হয় এবং বিক্রিও হয় ভালো। এসময় ঢাকার আড়ংসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্ডার থাকে বৈশাখীর মাল দেয়ার জন্য। তিনি আরও বলেন, শর্ত সাপেক্ষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে লোন নিতে হয় যা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে আমরা বড় কোনো লোন না পাওয়ায় ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারছি না।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. হেমায়েত উদ্দিন জানান, এখানকার মৃৎশিল্প বাইরে রপ্তানি করতে পারলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল হবে। এখানকার মৃৎশিল্পীদের সব ধরনের সহায়তা করার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন :

জেবি/জেএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়