• ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫

সিলেটের হাকালুকি হাওর বর্ষায় যেনো ‘মিনি কক্সবাজার’

রাজ্জাক রুনু, সিলেট
|  ২২ জুন ২০১৮, ২২:৪৮ | আপডেট : ২২ জুন ২০১৮, ২২:৫৭
এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ হাওর সিলেটের হাকালুকি এক সময় বর্ষাকালে শুধু মাছ ধরা আর ছোট নৌকায় নাইওর যাওয়া আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। সময়ের পরিবর্তনে সেই হাওর এখন সিলেটের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখন বর্ষাকালে এই হাওরের বুকে নৌকাভ্রমণ করছেন। এ সকল ভ্রমণকারীদের অনেকেরই মন্তব্য- বর্ষায় হাকালুকির অথৈ জল দেখে মনে হয় এ যেনো ‘মিনি কক্সবাজার’।

হাকালুকি হাওরের মোট আয়তন ১৮ হাজার ১১৫ হেক্টর। এটি সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫টি উপজেলায় বিস্তৃত। হাওরটির ৪০ ভাগ বড়লেখা, ৩০ ভাগ কুলাউড়া, ১৫ ভাগ ফেঞ্চুগঞ্জ, ১০ ভাগ গোলাপগঞ্জ এবং ৫ভাগ বিয়ানীবাজার উপজেলাধীন।

হাকালুকি হাওর নিয়ে অনেক রূপকথা রয়েছে। অতীতে বর্ষা মৌসুমে এই হাওরে নৌকা ডুবে অনেক মানুষের সলিলসমাধি ঘটেছে। তখন ইঞ্জিন নৌকার প্রচলন ছিলো না। মানুষ হাত দিয়ে দাড় টেনে নৌকায় চলাচল করতেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে কিংবা নৌকার তলা ফুটো হয়ে হয়তো নৌকাটি তলিয়ে যেতো। তখন কুলকিনারা না থাকায় সলিলসমাধি হতো মানুষের। পরে এ নিয়ে নানান রূপকথা ছড়িয়ে পড়তো মানুষের মুখে মুখে। বলা হতো কোনও এক দ্বৈত দানব নৌকা ডুবিয়ে প্রাণগুলো কেড়ে নিয়েছে। তবে এখন আর আগের মতো প্রাণহানি ঘটে না। বিশেষ করে ইঞ্জিন নৌকা এবং মোবাইল ফোনের  প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর খবর খুব কমই শোনা যায় না। বিপদে পড়লে মোবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে অন্যদের সহায়তায় বিপদ কাটিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছে মানুষ।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন : নড়াইলে ক্যামিক্যালমিশ্রিত ৩০ মণ আম ধ্বংস, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
--------------------------------------------------------

হাকালুকি হাওরকে বিনোদনপ্রেমীদের নজরে নিয়ে আসেন মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী কয়েস এবং এলাকার উদ্যোমী যুবক মুজিবুর রব চৌধুরী। কয়েকবছর আগে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টে হাকালুকি হাওর পরিদর্শনে গিয়ে সংসদ সদস্য সামাদ চৌধুরী কীভাবে হাওরটিকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত করা যায় এ নিয়ে স্থানীয় যুবকদের নিয়ে শলাপরামর্শ করেন। একপর্যায়ে তিনি মুজিবুর রব চৌধুরীসহ এলাকার যুবকদের চট্টগ্রাম থেকে ভ্রমণ উপযোগী প্রমোদতরী কিনে আনার অনুরোধ জানান। তার এই অনুরোধে সাড়া দিয়েই মুজিবুর রব চৌধুরী ও তার পার্টনাররা আকর্ষণীয় কয়েকটি প্রমোদতরী নিয়ে আসেন। পরে সংসদ সদস্য সামাদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে সেগুলোর উদ্বোধন করেন। মূলত এভাবেই শুরু হয় হাকালুকি হাওড়ের বিনোদন কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা।

এরপর একে একে যুক্ত হয় স্পিডবোট, জেটস্কি, স্কেডিং বোট। বদলে যেতে থাকে হাকালুকির চালচিত্র। পর্যটকদের উল্লাসে বর্ষার নীরব হাওরটি অনেকটা সরব হয়ে ওঠে।

হাকালুকির অথৈ জলে নৌযানে ভ্রমণে নিরাপত্তার প্রশ্নটি এসে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি জাহাজ বোটে আসনের থেকে বেশি লাইফ জ্যাকেট আছে। সাথে আছে সাপোর্ট বোট। মুজিবুর রব চৌধুরী জানান, দোতলা প্রমোদতরী ও অন্যান্য বোট চলাচলের সময় উদ্ধারকারী হিসাবে সাপোর্ট বোট নিয়ে তিনি নিজেই আশপাশে থাকেন। তাছাড়া ওয়াটারপ্রুফ প্রমোদতরীটি উদ্ধারযন্ত্র সংযোজিত। এটি এমনভাবে তৈরি করা যে ‘ডেক প্রুফ’ ডিজাইনের কারণে উলটে বা ডুবে যাবে না। এ উদ্ধার যন্ত্র চালাতে নিয়োজিত আছেন প্রশিক্ষিত ৬ জন উদ্ধারকারী।

এসকল প্রমোদতরীতে এলাকার অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিনের আয় দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার বেশ ভালোই চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া পর্যটকদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে বেশ কিছু দোকানপাট। এসব দোকানে পসরা সাজিয়ে আয় রোজগার করে নিচ্ছেন এলাকার স্বল্প আয়ের মানুষ। স্থানীয় সংসদ সদস্য তীর সংরক্ষন করে ভ্রমনকারিরা যাতে বসতে পারেন সে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

হাকালুকির বিনোদন নিয়ে তাদের ভাবনার কথা জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী আরটিভি অনলাইনকে জানান, এই হাওরকে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আরও জনপ্রিয় এবং নিরাপদ করে তোলার বিষয়টি আমাদের ভাবনায় রয়েছে। বর্ষায় এই হাওরের মাঝখানে এমন কোনও স্পট করা যায় কিনা যেখানে পর্যটকরা কিছু সময় অবস্থান করে আসতে পারেন। এছাড়া পর্যটকদের সুবিধার্থে আবাসিক হোটেল ও ব্যাংকের শাখা স্থাপনসহ অন্যান্য বিষয়গুলো ভাবনায় আছে।

যেভাবে হাকালুকি যাবেন

এই হাওরে ভ্রমণের জন্য সবচাইতে সুবিধাজনক স্থান হিসেবে ফেঞ্চুগঞ্জের ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টকেই বেছে নিচ্ছেন বিনোদনপ্রেমীরা। দেশের যে কোনও স্থান থেকে ট্রেনে এবং সড়ক পথে আসা যায় স্পটটিতে। ট্রেনে এলে মাইঝগাঁ রেলস্টেশনে নেমে তারপর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে যেতে হবে। আর সড়কপথে এলেও মাইঝগাঁ দিয়েই ঘিলাছড়া জিরো পয়েন্টে যেতে সুবিধা। সিলেট শহর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্ব। জিরো পয়েন্ট পর্যন্তই পাকা সড়ক। রান্না বান্না নিজেরাও করা যায় আবার আগে থেকে অর্ডার দিয়েও করানো যায়। একা কিংবা পরিবার নিয়ে অথবা কয়েক পরিবার মিলে এসেও উপভোগ করতে পারেন নির্মল পরিবেশের হাকালুকি হাওরের আকর্ষণীয় এই বিনোদন স্পটটি।

আরও পড়ুন : 

পি

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়