• ঢাকা রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫

মরে যাচ্ছে মানিকগঞ্জের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো

জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ
|  ২২ মার্চ ২০১৮, ১৩:০৬ | আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৮, ১৩:১৩
মানিকগঞ্জের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো মরে যাচ্ছে। পানি না থাকায় দিনে দিনে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতী, গাজীখালী, ক্ষীরাই, কান্তাবতী, মন্দা, ভুবনেশ্বর ও মনলোকহানী। ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান ও উপাত্ত অনুযায়ী, মানিকগঞ্জে মোট ১১টি নদী আছে। নদীগুলো হলো পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতী, গাজীখালী, ক্ষীরাই, কান্তাবতী, মন্দা, ভুবনেশ্বর ও মনলোকহানী।

যমুনা নদীটি মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার পশ্চিম পারের সীমান্ত ঘেঁষে শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীর সঙ্গে মিলে গেছে। এরপর থেকে পদ্মা নাম ধারণ করে প্রবাহিত হয়েছে দক্ষিণে। পদ্মা নদীর শাখা ইছামতী নদী হরিরামপুর উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আবার পদ্মা নদীতে মিলিত হয়েছে।

--------------------------------------------------------
আরও পড়ুন: রূপসা নদীতে ক্লিংকারবাহী জাহাজডুবি
--------------------------------------------------------

দৌলতপুরের কাছে যমুনা নদী থেকে কালীগঙ্গা নদীর উৎপত্তি। এরপর নদীটি ঘিওর উপজেলার জাবরা গ্রাম হয়ে তরা ব্রিজের নিচ দিয়ে মানিকগঞ্জ সদরের বেউথা ঘাট হয়ে সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়েছে।

ধলেশ্বরী নদী ঘিওর উপজেলার জাবরা থেকে শুরু করে সাটুরিয়ার তিল্লী, বরাইদ হয়ে জাগীরের ভেতর দিয়ে সিঙ্গাইরের শেষ মাথা পর্যন্ত মিশেছে। ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও ইছামতি নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪১ কিলোমিটার।

নদীপারের প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, তারা ধলেশ্বরী, পুরাতন ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও ইছামতি নদীতে নিয়মিতভাবে স্টীমার, বড় বড় লঞ্চ ও কোনো কোনো সময় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে দেখেছেন।

ধলেশ্বরী তীরবর্তী কাজলকোড়ী, তিল্লী, জায়গীর, মেঘশিমুল, উকিয়ারা, মানিকগঞ্জ, বেতিলা, বায়ড়া, সিঙ্গাইর, জয়মন্টপ, পালপাড়া এলাকায় স্টিমার ঘাট ছিল। তিল্লী বায়ড়া এবং মানিকগঞ্জ ছিল ব্যস্ত বন্দরনগরী।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ ও স্টিমার নিয়মিতভাবে মানিকগঞ্জে যাতায়াত করত। সিঙ্গাইর, বায়রা, জয়মন্টপ ও তিল্লী এলাকায় নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল হাট ও বালিরটেক।

বেতিলা গ্রামের কৃষক লালচাঁন মিয়া আরটিভি অনলাইনকে বলেন, গেলো ত্রিশ বছরে প্রাকৃতিক কারণে নদীর বাঁক পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ধলেশ্বরী নদী এখন মৃতপ্রায়। 

বর্তমান নদীটির উৎসমুখ তিল্লী থেকে শুরু করে গড়পাড়া, ফুকুরহাটি, জাগীর, কৃষ্ণপুর, বেতিলা-মিতরা, আটিগ্রাম, বায়রা, তালিবপুর, সিংগাইর এবং ধল্লা ইউনিয়নের হাজার হাজার একর কৃষি জমির প্রয়োজনীয় পানির একমাত্র প্রাকৃতিক উৎস এই ধলেশ্বরী নদী।

ধলেশ্বরী নদীর উৎসমুখ তিল্লীর অংশে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমসহ প্রায় সারা বছরই ধলেশ্বরী নদীতে পানি থাকে না। ফলে স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। যা কৃষি-প্রাণবৈচিত্র্যকে হুমকির সম্মুখীন করে দিয়েছে।

কৃষক তিন ফসলি চাষের পরিবর্তে ভুট্টা, তামাক ও সবজি চাষাবাদ করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে চাষাবাদে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়ে গেছে। মাটির উর্বরতা শক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে। বৈচিত্র্যময় তৃণ শস্য আবাদ না হওয়ায় এলাকায় গো-খাদ্য ও জ্বালানি উৎসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

বায়রা গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী কৃষক ইব্রাহিম মিয়া আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আগে ধলেশ্বরী নদীতে কত রকমের মাছ ছিল। এখন নদীতে পানি নাই। মাছও নাই। চাষের মাছ খেতে হয়। গরু-ছাগল ঝাঁপানো যায় না। ঘাস ধোয়ার পানি নাই। নোংরা পানিতে গোসল করে গায়ে চুলকানি হয়। নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় এবার বন্যা হয়েছে। তাই নদী খনন করা খুবই দরকার।

৬৫ বছর বয়সী বীরেন্দ্র রাজবংশী আরটিভি অনলাইনকে বলেন, আমার ঠাকুরদা, বাবা এবং আমার পেশা ছিল মাছ ধরা। সব মাছই ধলেশ্বরীতে পাওয়া যেত। এমনকি বর্ষার সময় ইলিশও পাওয়া যেত এই নদীতে। গত দশ বছর আগেও এখানে মাছ পাওয়া গেছে। কিন্তু এখন নদীই নাই। মাছ পাব কোথায়?

জাগীর গ্রামের প্রবীণ লুৎফর রহমান আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ধলেশ্বরী নদীর মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মেঘশিমুল এলাকার পানি দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত হয়ে গেছে। ফলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠছে। এ পানি ব্যবহারে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণি নানা ধরনের চর্ম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ধলেশ্বরী নদী অববাহিকা এলাকার মানুষ কৃষিকাজ থেকে শুরু করে গৃহস্থালীসহ দৈনন্দিন সকল কাজে ধলেশ্বরী নদীর পানি ব্যবহার করতো। এই নদীর পানি মেটাতো তাদের তৃষ্ণা আর দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের পানির চাহিদা। ধলেশ্বরী, কান্তাবতী, মনলোকহানী, ক্ষীরাই, মন্দা ভুবনেশ্বর নামে যে কয়টি শাখা রয়েছে এখন আর তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

স্থানীয়রা জানান, পার্শ্ববর্তী জাগীর এলাকার বিসিক শিল্পনগরীতে কীটনাশক প্রস্তুতকারী কারখানা বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইন্ডাট্রিজ লিমিটেডের বর্জ্য নদীতে ফেলায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট সেন্টার-এর সভাপতি দীপক কুমার ঘোষ আরটিভি অনলাইনকে বলেন, মানিকগঞ্জের অর্ধশতাধিক হাটবাজারের সহজ যাতায়াত ছিল নৌ-পথেই। কিন্তু নদীগুলো শুকিয়ে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এসব হাঁট-বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সড়কপথে অধিক খরচের জন্য বিক্রেতরা সে পথে পণ্য পরিবহন করছে না। এ নদীটি শুকিয়ে যাওয়ায় হাট-বাজারে নৌপথে মালামাল পরিবহনের অসুবিধার সৃষ্টি হচ্ছে। নদী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক আজহারুল ইসলাম আরজু আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ধলেশ্বরী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে তিল্লীমুখ খননের জন্য সরকারকে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. নাজমুছ সাদাত সেলিম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের নানা ধরনের পরিকল্পনা আছে। 

আরও পড়ুন:

জেবি/এসএস

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়