logo
  • ঢাকা রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েই চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

খেলার নাম ‘পেসাপালো’

অরণ্য গফুর
|  ২৭ মে ২০১৯, ১৫:১০ | আপডেট : ২৭ মে ২০১৯, ১৬:৩৫
পেসাপালোর এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।
দেশে দেশে কত- না নগর রাজধানী-
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ। - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

bestelectronics
বৈচিত্র্যে ভরপুরে আমাদের এ পৃথিবী। আরও বৈচিত্র্যময় মানুষ ও তার কর্মকাণ্ড। জীবন-জীবিকার তাকিদে নানা কাজের আর পেশার উদ্ভব ঘটিয়েছে সৃষ্টির সেরা এ জীব। তেমনি মন-মননের তাকিদে তৈরি করেছে নানা রকম সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্ম। শত রকমের খেলাধূলার আবিষ্কার মানুষের বৈচিত্র্য ও সৃষ্টিশীল মননের বহিঃপ্রকাশ। 

কিন্তু সব খেলা সব অঞ্চলে বা দেশে সমান জনপ্রিয় হয় না। এটা বাস্তব সম্মতও নয়। একমাত্র ফুটবল ছাড়া দলগত ক্যাটাগরিতে বিশ্বব্যাপী চূড়ান্ত গ্রহণীয় কোনো ক্রীড়া নেই। ক্রিকেট, হকি, রাগবিসহ আরও কিছু খেলাও বহুল পরিচিত ও সুনামধন্য। উপমহাদেশ ও আমাদের বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট। ফুটবলকে সরিয়ে এ জায়গা করে নেবার কারণ অবশ্য সাফল্য। সফলতাই আধুনিক বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হওয়ায়, শত বছরের ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দেবার ঘটনাও তাই প্রত্যক্ষ করেছে এ অঞ্চলের জনপদ। 

আর অন্য খেলাগুলো চললেও, তার খোঁজ রাখার মানুষ নিতান্তই কম। ওই যে সফলতা নেই। কিন্তু সফলতা থাকলেও কিছু খেলা থেকে যায় পাদ-প্রদীপের নীচে। যদি গণমাধ্যমে সেটাকে নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না হয়। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ব্যবস্থায় গণমাধ্যমে কোনো খবর না আসা মানে যেন- সেটা হয়ই নি। আর হলেও তার কোনো গুরুত্ব নাই!

এমনই একটা খেলার নাম ‘পেসাপালো’। এই মুলুকে অপরিচিত ও একদমই নতুন একটি ক্রীড়া এটি। মজার বিষয় হচ্ছে, কয়েকদিন আগে এই খেলায় এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সেটিও পুরুষ এবং নারী উভয় বিভাগেই! 

লাল-সবুজের এ সফলতা বর্ণনার আগে খেলাটির বিষয়ে একটু জেনে নেয়া যাক। বেসবলের আদলে ব্যাট ও বলের খেলা হলো পেসাপালো। ফিনল্যান্ডের জাতীয় এ খেলাটি ১৯২০ সালে আবিষ্কার করেন লৌরি ‘তাহকো’ পিকালা। এশিয়া মহাদেশে নতুন হলেও, ইউরোপে এটি বহুল প্রচলিত। বিশেষত ফিনল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও নর্ডিক অঞ্চলে নিয়মিত খেলা হয় পেসাপালো। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা, কানাডা ও উত্তর আমেরিকায় এটির যথেষ্ট প্রচলন রয়েছে। এশিয়াতে জাপান ও চীন অনেক আগে থেকেই আয়ত্ব করেছে এ খেলা। ১৯৫২ সালের অলিম্পিকে ডেমেস্ট্রেশন খেলার স্বীকৃতি পায় পেসাপালো। তিন বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয় পেসাপালো বিশ্বকাপ। 

এক এক দলের চার ইনিংস করে মোট আট ইনিংসে খেলা হয় পেসাপালো। অফেন্সে (ব্যাটিং) ১২ ও ডিফেন্সে (ফিল্ডিং) ৯ জন করে খেলোয়াড় থাকে একটি দলে। বেশি রান করা দল জয়ী হিসেবে বিবেচিত হয়। বেসবলের সঙ্গে পেসাপালোর প্রধান পার্থক্য হলো উলম্ব পিচিং (বোলিং)। পিচার ব্যাটারের সামনে থেকে পিচিং প্লেটের ওপর টার্গেট করে নীচ হতে উপরের দিকে উলম্ব করে বল নিক্ষেপ করে। ব্যাট দিয়ে বল মেরে দৌড়ে তিনটি বেস ঘুরে রানার (ব্যাটার) নিরাপদে ‘হোম বেসে’ পৌঁছাতে পারলে একটি রান ধরা হয়।

মাত্র এক বছরেরও কম সময়ে এই খেলাকে রপ্ত করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের এপ্রিলের ১৯-২০ তারিখে প্রথমবারের মতো জাতীয় লিগও করেছে বাংলাদেশ পেসাপালো অ্যাসোসিয়েশন। বড় পরিসরে সুযোগ হঠাৎ করেই এসেছিলো। এশিয়া কাপ আয়োজনের প্রস্তাব। সেই সুযোগ লুফে নিয়ে নতুন এই খেলায় নিজেদের নাম শক্ত করে খোদাই করে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

১৮ ও ১৯ মে সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজের সমারোহে বসে এশিয়ান পেসাপালো চ্যাম্পিয়নশিপ। সিনিয়র পুরুষ ও নারী, জুনিয়র বালক ও বালিকা এবং যুব পুরুষ- এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে হয় প্রতিযোগিতা। সেখানে ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চারটি ক্যাটাগরিতেই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। শুধু যুব পুরুষে নেপালকে হারিয়ে শিরোপা জেতে ভারত।

ভারত ৬ বছর ও নেপাল ৪ বছর ধরে খেলে আসছে পেসাপালো। অথচ তাদের হারিয়ে শিরোপা জয় করলেও, তেমন কোনো স্বীকৃতি মেলেনি খেলোয়াড়দের। ভারত জাতীয় দল হারলেও, মাত্র একটা ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তাদের গণমাধ্যম ফলাও করে সংবাদ প্রচার করেছে। কিন্তু এদেশের গণমাধ্যমের চোখ এড়িয়ে গেছে সংবাদটি! 

এতে হতাশ হলেও বসে নেই পেসাপালো খেলোয়াড়রা। আসছে নভেম্বরে ভারতের পুনেতে বসবে পেসাপালো বিশ্বকাপের দশম আসর। এরই মধ্যে বিশ্ব আসরের জন্য কোয়ালিফাই করেছে বাংলাদেশ। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে লড়তে, নিজেদের তৈরি করছে তুলনামূলক তরুণ বয়সের খেলোয়াড়রা। 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য নিয়ে আসা ক্রীড়া আমাদের হাতে গোনা। সেটাও মূলত আঞ্চলিক আসরেই সীমাবদ্ধ। নতুন করে পথচলা পেসাপালোকে তাই একটু সুযোগ দেয়াই যায়। এতে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে ফিরিয়ে রেখে, পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপনে উদ্বুদ্ধ করা যাবে তরুণ সমাজের একটা অংশকে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি ও দেশের সুনাম ছড়িয়ে দেবে এসব তরুণরা। তাই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ পেসাপালা দল। 

এজি/ওয়াই

bestelectronics bestelectronics
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়