logo
  • ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬

এতো মরদেহ দেখে বুঝে উঠতে পারিনি কী করব: তামিম

স্পোর্টস ডেস্ক, আরটিভি অনলাইন
|  ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৯:১৯ | আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৯:৪৮
ধর্ম-বর্ণ যেখানে এক করার ক্ষমতা রাখে তারাই এক এক জন সাকিব, মাশরাফি, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহসহ গোটা বাংলাদেশ ক্রিকেট। তাদের যদি কিছু হয়ে যায় তবে এই শোক কাটিয়ে উঠতে কতদিন সময় লাগবে ভাবা যায়? যায় না। এটি ভাবনারও অনেক ঊর্ধ্বে। কেউ এমনটা ভাবতেও চায় না।

১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে আল নূর মসজিদে যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে তার অংশ হতে পারতো বাংলাদেশ দলও। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পরম করুণায় বেঁচে যাওয়া জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা কি কখনও ভুলতে পারবেন সেই দিনের কথা?

তামিমরা দেশে ফিরেছেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হয়তো সময় লাগবে ক’টা দিন। তবে তামিম সেই দিনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ‘ক্রিকইনফো’ প্রতিবেদক মোহাম্মদ ইসামের কাছে। সেদিনের বর্ণনা তুলে ধরা হলো আরটিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য।

‘বাসে উঠার আগে কী হয়েছিল আগে সেটা একটু জানাই। তাহলেই বুঝতে পারবেন, মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের ব্যবধান কীভাবে আমাদের জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল।

জুমার নামাজে সাধারণত মুশফিক ও রিয়াদ ভাই মসজিদে হাজির হতে চান খুতবা শোনার জন্য। তাই আগে ভাগে নামাজে যেতে চেয়েছিলাম আমরা। দুপুর দেড়টায় (স্থানীয় সময়) মাঠ থেকে আমাদের বাস ছাড়ার কথা ছিল, কিন্তু রিয়াদ ভাই ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে যান। সেখানে কিছুটা সময় বেশি লাগে উনার। 

এই সময়ে ড্রেসিং রুমে আমরা সবাই ফুটবল খেলায় ব্যস্ত ছিলাম। সেই খেলায় তাইজুল হারতে চাইছিল না। কিন্তু বাকি সবাই তাকে খেলায় হারানোর জন্য উঠে পড়ে লাগে। তাইজুল ও মুশফিক ওয়ান টু ওয়ান খেলছিল। আমরা সবাই সেটা দেখছিলাম। সেখানেই আমাদের কিছুটা সময় দেরি হয়। এই সামান্য দেরিটাই যে আমাদের জীবনও বাঁচিয়ে দিল তা এখন ভাবছি!

ড্রেসিংরুমে ফুটবল খেলা শেষ করে কিছুক্ষণ পর আমরা বাসে উঠে বসি। নামাজ শেষে আমরা একই বাসে টিম হোটেলে ফিরে যাব। তাই আমাদের সঙ্গে সৌম্য সরকার ও টিম অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাসন চন্দ্রশেখরও বাসে উঠে। যেহেতু ম্যাচের আগের দিনের এই অনুশীলনটা ছিল ঐচ্ছিক অনুশীলন সেশন। তাই যাদের অনুশীলন ছিল না তারা হোটেলে থাকবে, আর যাদের অনুশীলন ছিল তারা মাঠে আসবে। এটাই ছিল পরিকল্পনা।

আমি সবসময় টিম বাসে বামদিকের ছয় নম্বর সিটে বসি। আমাদের বাস মসজিদের কাছাকাছি যেতেই বাসের সবাই বাইরে ডানদিকে তাকিয়ে কি জানি দেখছিল। তাদের সঙ্গে উৎসুক আমিও তাকালাম। দেখলাম একজন লোক মসজিদের কাছে মাটিতে পড়ে আছে। প্রথমে ভাবলাম, মাতাল বা অজ্ঞান হয়ে হয়তো মাটিতে পড়ে আছে কেউ।

বাস আরেকটু সামনের দিকে এগুলো। একটু সামনেই মসজিদ। কিন্তু তখনো সবাই মনোযোগী মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার দিকেই। তখনই আমি দেখলাম সামনে আরেকজন লোক উপুড় হয়ে পড়ে আছে রক্তাক্ত শরীরে! তখনই সবার মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শুরু।

মসজিদ চত্বরের যাবার পরই একটি গাড়ী সামনে এসে আমাদের বাস থামলো। দেখলাম আমাদের বাসচালক জানালার কাঁচ নামিয়ে গাড়ির পাশে থাকা এক নারীর সঙ্গে কথা বলছে। সেই নারী চরম আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় কাঁপছিল! চোখেমুখে তার ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। কথা বলছিল সে কান্নার ভঙ্গিতে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে! শুনতে পেলাম সেই নারী বলছে- “সামনে কিছু হয়েছে, যেও না, যেও না!”

আমাদের বাস ড্রাইভার সেই নারীকে বলল, বাসের এরা সবাই মসজিদে যাবে। তখন সঙ্গে সঙ্গে সেই নারী চিৎকারের ভঙ্গিতে জানালো, “না, না, না, মসজিদে যেও না!! ওখানেই তো ভয়াবহ কিছু হয়েছে।”

এইটুকু বলেই সেই নারী কাঁদতে শুরু করলো! বাসের মধ্যে আমরা সবাই সেটা দেখলাম। ড্রাইভারের সঙ্গে তার কী কথা হচ্ছিল, সেটাও শুনলাম। তখনই আমাদের টেনশন আরও বেড়ে গেল। মসজিদ থেকে আমরা তখন মাত্র ২০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে। এক অর্থে এতই কাছে যে, বাস থেকে নেমে মসজিদে একদম প্রবেশের মুখেই তখন আমরা!

------------------------------------
আরো পড়ুন : নিউজিল্যান্ডে হতাহতদের জন্য সোমবার বিসিবিতে দোয়া
------------------------------------

এসময় আমরা আরও ভয়াবহ দৃশ্য দেখলাম; মসজিদের চারপাশে অনেক রক্তে ভেসে যাওয়া অনেক মানুষ পড়ে আছে। হঠাৎ করে চারদিকে এতো মরদেহ দেখে আমরা ঠিক বুঝে উঠতেই পারছিলাম না, কী করব? কোথায় যাব? মাথায় নামাজের টুপি পরা আমাদের কয়েকজন ভয়ে আতঙ্কে মাথা থেকে টুপি খুলে ফেলে! পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, এখানে ভয়াবহ কিছু হয়েছে। যারা পাঞ্জাবি পরেছিল তারা সেই পাঞ্জাবির ওপর জ্যাকেট পরতে শুরু করে। যাতে পাঞ্জাবি দেখা না যায়! এছাড়া আর কী করতাম আমরা?

চারধারের এই পরিস্থিতিতে আমরা সবাই বাসের মধ্যে ফ্লোরে মাথা নিচু করে শুয়ে পড়ি। প্রায় সাত-আট মিনিট পর্যন্ত এমন চরম আতঙ্কের মধ্যেই কাটলো। বুঝতেই পারছিলাম, ভয়াবহ কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা এখানে ঘটেছে। কিন্তু সেটা ঠিক কী এবং কোন অবস্থায় আছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই আমাদের ছিল না।

সেই সময়টাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে আতঙ্কের মুহূর্ত। কেউ ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলাম না! বাস চালককে আমরা বললাম, এখান থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও। কিছু একটা করো! কিন্তু বাসচালক কোনো নড়াচাড়াই করেনি। সবাই আতঙ্কে বাস চালকের দিকে চিৎকার করে তাকে বাস সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য বলে। আমি নিজেও চিৎকার করলাম। এভাবেই কাটলো আরও ছয় থেকে সাত মিনিট। তখনো আশেপাশে একজন পুলিশও নেই!

ভয়াবহ এই অবস্থার মধ্যে টেনশন, উদ্বেগে আমাদের সবার রক্ত শুকিয়ে যাবার জোগাড়! তখনই দেখলাম, কয়েকজন পুলিশ এসেছে। সাধারণ কোনো পুলিশ নয়, বিশেষায়িত পুলিশ। 

তারা এসেই মসজিদে ঢুকে পড়ে, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। আমরা পাথরের মূর্তির মতো হয়ে গেলাম যেন। নড়তে চড়তেই ভুলে যাই সবাই। কারও মুখে কোনও কথা নেই। দেখলাম আমার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মসজিদ থেকে তখন রক্তভেজা শরীর নিয়ে আরও লোকজন বেরিয়ে আসছে।

এমন পরিস্থিতিতে আমরা নিজেদের আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না। বেশ কয়েকজন চিৎকার শুরু করলো। একজন চিৎকার করে বললো, “চলো বাস থেকে বেরিয়ে যাই!”

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বললো, “বাইরে বের হলে যদি অস্ত্রধারীরা আমাদের গুলি করতে শুরু করে, তখন কী হবে?” পাশ থেকে আরেকজন বললো, “বাসের মধ্যে এভাবে আটক হয়ে বসে থাকলেও তো আমরা বড় বিপদে পড়ব!”

আমিও ভাবলাম, বাস থেকে নেমে গেলে হয়তো আমাদের বাঁচার একটা সম্ভাবনা আছে। বরং বাসের মধ্যে থাকলেই হয়তোবা সহজ টার্গেট হয়ে পড়ব। কিন্তু যাব কীভাবে? বাসের সামনের এবং মাঝের দু’টো দরজাই যে বন্ধ!

ঠিক তখনই বাসের চালক ঠিক কেন জানি না, আরও দশ মিটারের মতো সামনে বাড়লো। আমি ঠিক জানি না, কেন সে এটা করলো? আমরা তখন তার ওপর ভয়ানক ক্ষেপে গেলাম। তেড়েও গেলাম। সবাই তখন দিশেহারা! বাসের মাঝখানের দরজায় আমরা কয়েকজন লাথি মারতে শুরু করলাম। বাস চালক তখন দরজাটা খুলে দিল। আমি তখন ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসাম ভাইকে ফোন করলাম। ইসাম ভাই প্রথমে মনে করলো, আমি তার সঙ্গে কৌতুক করছি! পরে যখন বললাম, ভাই আমরা এখন মজা করার মতো অবস্থায় নেই। আপনি কি আমাদের অবস্থা বুঝতে পারছেন না? তখনই দেখলাম আরেক সাংবাদিক মাজহারউদ্দিন আমাকে ফোন করছে। আমার তখন মাথাও ঠিক মতো কাজ করছে না। কী করবো কোনো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।

অবশেষে আট মিনিট পরে আমরা বাস থেকে নেমে পড়লাম। সবাই বলল, পার্কের ভেতর দিয়ে দৌঁড়ে চলে যাই। কয়েকজন বলল, খোলা পার্কের মধ্যে আমরা আরও সহজ টার্গেট হয়ে পড়ব। যদি বন্দুকধারী গুলি করতে শুরু করে, তবে খোলা জায়গায় সবাই মারা যাব। হাতে ধরে ব্যাগ নিয়ে দৌড়াতে শুরু করলে পুলিশ আবার কী ভেবে বসে, সেই চিন্তায়ও মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড় আমাদের। 

ঠিক তখনই দেখলাম, আমাদের তিনজন সাংবাদিক এদিকে এগিয়ে আসছেন। আমি আসলে তখন বুঝতে পারিনি, তবে এখন বুঝতে পারছি, আপনাদের তখন ডেকে বিপদেই ফেলে দিয়েছিলাম।

পৃথিবীতে খুব কম লোক আছে এমন বিপদের দিনে পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার তো মনে হয়, খুব কাছের কোনো মানুষজনও এমন বিপদের সময় ছুটে আসতো না। যেমনটা আপনারা (সাংবাদিকরা) এসেছেন। একসঙ্গে এত পরিচিত সাংবাদিকদের দেখে আমি সত্যিকার অর্থে স্বস্তি পেলাম। 

তখন আমরা সবাই একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম। খানিকবাদে মসজিদ থেকে দূরুত্ব একটু বাড়তেই কয়েকজন দৌঁড়াতে শুরু করল, যাতে দ্রুত মাঠে যাওয়া যায়।

আমরা সেদিন মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে নিজ চোখে দেখেছিলাম! পুরো শরীর শীতল হয়ে গিয়েছিল। সেই ভয়াবহ সময় কখনো ভোলার নয়। আমরা সেখান থেকে ফিরে আসার পর প্রতি ঘণ্টায় সেই দুঃস্মৃতি আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে! হয়তো এখন আমরা হাসছি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা পুরোই ভেঙে পড়েছি। উফ! যে নৃশংসতা দেখেছি! এই দুঃসময় কাটতে আমাদের লম্বা সময় লাগবে।’

আরো পড়ুন: 

এমআর/ওয়াই

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়