logo
  • ঢাকা শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রথম বাংলাদেশি আম্পায়ার হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেন যিনি

সায়লাব হোসেন টুটুল Sailab Hossain Tutul
সায়লাব হোসেন টুটুল

১৯৯৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চেহারা। ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ সামনে চলে আসে লাল-সবুজদের সামনে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সংস্থা (আইসিসি) সঙ্গে তৎকালীন বোর্ড কর্তারা কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে থাকে। লক্ষ্য ছিল টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জন। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে আরেকটি সুখবর সামনে আসে তা হচ্ছে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে আম্পায়ার বেছে নেয় আইসিসি।

১৯৯৯ সালের মে মাসে বসার কথা ছিল বিশ্ব আসর। জানুয়ারিতে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আম্পায়ারদের নাম ঘোষণা করে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা। যেখানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন সায়লাব হোসেন টুটুল। ঠিক ২২ বছর আগে ২৩ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয়েছিল তার নাম।

‘সাতানব্বই সালে এশিয়া কাপে মোহাম্মদ আজগার থার্ড আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একটি রানআউটের সিদ্ধান্ত দিয়ে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। এরমধ্য দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সুযোগ হয়েছিল আমার। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে যাওয়ার।’ বলছিলেন টুটুল।

বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনও ম্যাচে না নামলেও ডেভিড শেফার্ড, ডেরেল হেয়ার, স্টিভ বাকনারদের মতো কিংবদন্তি আম্পায়ারদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করার সুযোগ হয়েছিল তার। আম্পায়ারিং ছাড়াও সাংগঠনিকভাবে বেশ দক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার অ্যান্ড ও স্কোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

‘তখন পর্যন্ত ১৬/১৭ বছর আম্পায়ারিং করার অভিজ্ঞতা ছিল। নিরাব্বই বিশ্বকাপে আমাকে বাছাই করাটা ছিল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। বেশ গর্ববোধ করেছিলাম। আসলে এমন অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমার পর অনেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মাহবুবুর রহমান, আখতার উদ্দিন শাহিন, নাদির শাহ, এনামুল হক মনি অনেকেই দেশের নাম উঁচু করেছেন।’

প্রথমবারের মতো আইসিসির বড় আসরে সুযোগ পাওয়া এই আম্পায়ারের বেড়ে ওঠা নবাবপুর নবেন্দ্র বসাক লেনের একটি ক্রীড়া পরিবারে। তার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত ফুটবলার ও বিশিষ্ট ক্রীড়া-সংগঠক নুর হোসেন। বাবার মতো টুটুলও ছিলেন ফুটবলার। ১৯৮০ সালে ঢাকায় এসেছিলেন ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জ। সেটাই ছিল প্রথম ফুটবলের সর্বোচ্চ কর্তার বাংলাদেশ সফর। পাইওনিয়ার ফুটবল লিগে উদ্বোধন করেছিলেন হ্যাভেলাঞ্জ। বাড্ডা জাগরণী ক্লাবের বিপক্ষে টুটুলের নেতৃত্বাধীন দল নবাবপুর এসসি মাঠে নেমেছিল সেদিন।

ফুটবল ছেড়ে কীভাবে ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেন?

‘আমার বাবা কলকাতা মোহামেডানের হয়ে খেলেছেন। ফিফা রেফারি, বাফুফের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্লাবের কোচও ছিলেন। ছোট বয়সে খেলার সঙ্গে আমিও যুক্ত হই। আমাদের বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। এলাকার দল নবাবপুর এসসিতে খেলেছি। পাইওনিয়ার লিগ হ্যাভেলাঞ্জ উদ্বোধন করেছিলেন। প্রথম ম্যাচে বাড্ডা জাগরণীর হয়ে আমার প্রতিপক্ষ ছিলেন ঢাকা মোহামেডানের বর্তমান দলনেতা আবু হাসান চৌধুরী প্রিন্স। পরবর্তীতে ভিক্টোরিয়া, ফরাশগঞ্জ ও ঢাকা স্পোর্টিংয়ের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা হয় আমার। টাউন ক্লাব নামে আমাদের পরিবারের একটি দল ছিল। এই দলে ইউসুফ বাবু, বেলাল ভাই, আজহার, শর্দুল, রামচন্দ্র গোয়ালা এমন অনেক ক্রিকেটার খেলেছেন। ওই ক্লাবে বল বয় হিসেবে শুরু করেছিলাম। দ্বিতীয় বিভাগ পর্যন্ত খেলেছি। পরিচালনা করেছি। ১৯৮৫ সালে টাউন ক্লাব রূপালি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়।’

২০০১ সালে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে বাংলাদেশ আসে জিম্বাবুয়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি টেস্টে অংশ নেয় দুই দল। ২৩ নভেম্বর বন্দর নগরীতে প্রথম ওয়ানডে বসেছিল। যেখানে অভিষেক হয়েছিল মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার। একই ম্যাচে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান টুটুল। তিন ম্যাচের সিরিজের শেষ দুই ম্যাচ বসেছিল ঢাকায়। দ্বিতীয় ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেছিলেন টিভি আম্পায়ার হিসেবে। তৃতীয় ম্যাচে মাঠে নেমে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরের বছরের শুরুতেই বাংলাদেশ সফর করে পাকিস্তান। তিন ম্যাচ সিরিজের একটি ম্যাচে মূল আম্পায়ার আরেক ম্যাচে থার্ড আম্পায়ার তথা টিভি আম্পায়ার ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ না হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে তার অবদান অনেক বেশি।

আম্পায়ারিং জগতে আসার ঘটনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মরহুম আতাউল হক মল্লিক ছিলেন আমার গুরু। তখনতো এতো পেশাদারিত্ব ছিল না। একবার টাউন ক্লাবের মূল একাদশে আমার জায়গা হয়নি। আউটার স্টেডিয়ামে আরেকটি ম্যাচ চলছিল। উপস্থিত হতে পারেননি আম্পায়ার। আতাউল হক মল্লিক আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু। তার কাছ থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শিখেছি। আমরা প্রয়োজন বোধকরি আম্পায়ারদের জন্য ভালো কিছু করতে হবে। কারণ তাদেরকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ১৯৮৭ সালে আমরা তৈরি করি বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার অ্যাসোসিয়েশন। আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলাম। তিনি ছিলেন আহ্বায়ক। এখন আমি এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি।’

কয়েকদিন আগেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা নিয়েছেন। পায়ের সমস্যা থাকায় দাঁড়াতে কষ্ট হয় তার। দুই বেলা থেরাপি নিতে হচ্ছে তাকে।

সায়লাব হোসেন টুটুল বলেন, ‘এখন বাংলাদেশের আম্পায়াররা অনেক পেশাদার। নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে। তবে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের সুবিধা তুলনামূলক কম। আশা করি সামনের দিনে অনেক ভালো আম্পায়ার বের হবে। আমি এখন অসুস্থ। সবাইকে বলবেন আমার জন্য দোয়া করতে। যাতে দ্রুত সু্স্থ হতে পারি।’

ওয়াই

RTV Drama
RTVPLUS